যুক্তরাষ্ট্রে জনমত প্রভাবিত করতে ৫৪৫ মিলিয়ন শেকেল (প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় করে এক বিশাল ডিজিটাল প্রচারণা শুরু করেছে ইসরায়েল।
এ প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্ল্যাটফর্ম—যেমন ChatGPT—কে কাজে লাগানো হচ্ছে, যাতে অনলাইনে ইসরায়েলপন্থী বর্ণনা ছড়িয়ে তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে বাড়তে থাকা সমালোচনার জবাব দেওয়া যায়।
মার্কিন বিচার বিভাগে দাখিল করা Foreign Agents Registration Act (FARA) নথি অনুযায়ী, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘Clock Tower’ নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক প্রতিষ্ঠানকে এই প্রচারণায় যুক্ত করেছে। সরকার-নিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞাপন ব্যুরোর মাধ্যমে পরিচালিত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ‘Havas Media Network’।
তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চায়, উৎপাদিত কনটেন্টের অন্তত ৮০ শতাংশই জেনারেশন জেড বা তরুণ প্রজন্মের উপযোগী হোক—বিশেষ করে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ও পডকাস্টে।
চুক্তিতে নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে অন্তত ৫ কোটি দর্শকের কাছে এসব বার্তা পৌঁছানো হবে, যা সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ প্রচারণার তুলনায় অত্যন্ত উচ্চমাত্রার।
এ প্রচারণা শুরু হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের মধ্যে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। সাম্প্রতিক Gallup জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশ ইসরায়েলের গাজা অভিযানকে সমর্থন করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত আরেক জরিপে ৪৭ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, ইসরায়েল “গণহত্যা” চালাচ্ছে।
AI প্রভাবিত করার পরিকল্পনা
প্রচারণার সবচেয়ে বিতর্কিত ও প্রযুক্তিগতভাবে নতুন দিক হলো—Clock Tower-এর উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংস্থাটি এমন ওয়েবসাইট ও কনটেন্ট তৈরি করবে যা “GPT আলাপচারিতায় কাঙ্ক্ষিত ফ্রেমিং তৈরি করবে”—অর্থাৎ ChatGPT, X-এর Grok এবং Google-এর Gemini-এর মতো AI মডেলগুলো কীভাবে ইসরায়েল-সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেয়, তা প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কৌশলকে বলা হচ্ছে “Generative Engine Optimization (GEO)”, যা সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনের (SEO) অনুরূপ, তবে লক্ষ্য এবার AI সিস্টেম। ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা Nostick-এর প্রধান গাদি এভরন বলেন, “SEO যেমন সার্চ রেজাল্টে কোন ওয়েবসাইট প্রভাব ফেলে তা নির্ধারণ করে, GEO তেমনি AI উত্তরের উৎসগুলোকে প্রভাবিত করে।”
ট্রাম্পের সাবেক প্রচারকেন্দ্রিক সংযোগ
এই প্রচারণার নেতৃত্বে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক প্রচার ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেল, যিনি Clock Tower-এর প্রধান। পারস্কেল বর্তমানে Salem Media Group-এর প্রধান কৌশল কর্মকর্তা, যা একটি রক্ষণশীল খ্রিষ্টান সম্প্রচার নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য অংশীদার এখন ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও পুত্রবধূ লারা ট্রাম্প।
FARA নথি অনুযায়ী, Clock Tower-কে “যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় প্রচারণা চালানোর” দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি পক্ষের যোগাযোগ ব্যক্তি হিসেবে রয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৌশলগত যোগাযোগপ্রধান এরান শিওভিটজ, যিনি Project 545-এর নেতৃত্বে আছেন—যেখানে সরকার ৫৪৫ মিলিয়ন শেকেল বরাদ্দ দিয়েছে জনকূটনীতি প্রকল্পের জন্য।
প্রভাবশালীদের মাধ্যমে প্রচারণা
Clock Tower ছাড়াও ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় একসঙ্গে নতুন উদ্যোগ Project Esther শুরু করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালীদের মাধ্যমে প্রো-ইসরায়েল কনটেন্ট প্রচার করবে। প্রকল্পটি নীরবে চালু হলেও এর বাজেট ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা দেখায় এটি ইসরায়েলের এক নতুন ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্র।
নথিতে বলা হয়েছে, Bridges Partners LLC নামে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়্যারে নিবন্ধিত এক সংস্থা (প্রতিষ্ঠাতা: ইসরায়েলি কৌশলবিদ উরি স্টেইনবার্গ ও ইয়ায়ির লেভি) এ প্রচারণায় যুক্ত হয়েছে। তাদের জন্য ৯ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থ প্রদানের চুক্তি রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৫–৬ জন প্রভাবশালীকে নিয়োগ দেওয়া হবে, যারা প্রতি মাসে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদিতে ২৫–৩০টি পোস্ট করবেন। পরবর্তী পর্যায়ে ইসরায়েলি কনটেন্ট নির্মাতা ও মার্কিন এজেন্সিগুলোকেও যুক্ত করা হবে। প্রভাবশালীদের পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়েছে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত।
নেতানিয়াহুর মন্তব্য
গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে ইসরায়েলি কনসুলেটে প্রো-ইসরায়েল প্রভাবশালীদের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, “আমাদের লড়াই করতে হবে। কাদের দিয়ে? প্রভাবশালীদের দিয়ে। আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।”
তিনি অনলাইন ক্ষেত্রকে “ইসরায়েলের অষ্টম যুদ্ধক্ষেত্র” বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, “জাগ্রত সংস্কৃতি (woke culture) আজকের নাৎসিবাদের মতো,” তাই টিকটকে বিনিয়োগ ও এলন মাস্কের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানান।
আরব গণমাধ্যম নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত প্রভাবিত করার ইসরায়েলি প্রচেষ্টা হিসেবে সমালোচনা করেছে। কেউ কেউ বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রভাবশালীদের অভিযুক্ত করেছেন বন্দি ইসরায়েলি পরিবারের প্রতি সংবেদনশীল না থাকার অভিযোগে। তবে অংশগ্রহণকারী ইনফ্লুয়েন্সার শাই সাবো বলেছেন, “আমরা ইহুদি প্রচারণা জোরদার করতে এসেছি, পরিবারের আন্দোলনকে দুর্বল করতে নয়। এখন ঐক্য দরকার, বিভাজন নয়।”
মাহফুজ/