আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর স্বাগত জানিয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতারা। ফলে বর্তমানে দেশ দুটির মধ্যকার সংঘাত অনেককে অবাক করারই কথা।
ইসলামাবাদের বিশ্বাস ছিল তালেবান সরকার পাকিস্তানের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন থাকবে এবং তাদের নিরাপত্তা পরিপন্থি হয় এমন যেকোনো কিছুতে এগিয়ে আসবে। কারণ পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনী দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তালেবানকে সমর্থন দিয়ে এসেছে।
২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান দ্বিমুখী পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করেছে। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সায় দিয়েছে। আরেক দিকে তালেবানদের পাশেও থেকেছে। কিন্তু এখন আর সে সম্পর্ক নেই। চলতি সপ্তাহে কাবুলে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। প্রশ্ন হচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক কী আবার আগের স্থানে ফিরবে?
যা নিয়ে সমস্যা
পাকিস্তানের অনেক কিছুই এস্টাবলিশমেন্টের ওপর নির্ভর করে। দেশটির সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এ এস্টাবলিশমেন্ট। আফগানিস্তান সংক্রান্ত নীতি মূলত তারাই নিয়ে থাকে। ঐতিহাসিকভাবেই পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসনেও হস্তক্ষেপ করার রেকর্ড রয়েছে এই এস্টাবলিশমেন্টের।
২০২১ সাল থেকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী নজিরবিহীনভাবে আক্রমণের মুখে পড়েছে। তা এখনও অব্যাহত আছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে এরকম হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই হাজার চারশ জনেরও বেশি মানুষ। এর আগের বছর ২০২৪ সালে একই ধরনের হামলায় পাকিস্তানে মারা যান প্রায় আড়াই হাজার মানুষ।
এ হামলাগুলোর দায় দেশটির প্রশাসন বরাবরই পাকিস্তান তালেবানকে দিয়ে আসছে, যারা টিটিপি নামে বেশি পরিচিত। ওই দলটির নেতারা আফগানিস্তানে বসবাস করে। আর টিটিপির সদস্যরাও বেশির ভাগই সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর বাসিন্দা।
পাকিস্তানের আশা ছিল, বন্ধুভাবাপন্ন তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর টিটিপি নেতারা আফগানিস্তান ছেড়ে চলে আসবে। টিটিপির কিছু নেতাও ঘরেও ফিরেছেন। তবে সে কারণে সহিংসতা থামেনি। টিটিপির দাবি, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে আগে যে আধা স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা ছিল, সেটি আবার ফিরিয়ে দিতে হবে এবং সেখানে তাদের কাছে স্বীকৃত ইসলামিক নীতি প্রয়োগ করতে হবে।
এদিকে, পাকিস্তানের জন্য দিনের পর দিন এ হামলা নেওয়া অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বিষয়টি হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি।
আফগানিস্তানের তালেবান নেতারা এ বিষয়ে তাদের সহায়তা করছেন না। তারা বলছেন, টিটিপি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। ২০২২ সালে তারা পাকিস্তান ও টিটিপির মধ্যে আলোচনার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল। সেবার সাময়িক যুদ্ধবিরতি হওয়া স্বত্ত্বেও আলোচনা ব্যর্থ হয়।
তালেবান সরকার আবার নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত। তারা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। ক্ষমতা নেওয়ার চার বছরের মধ্যে শুধু রাশিয়াই তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত, চীন ও ইরান তালেবানকে আফগানিস্তানের শাসক হিসেবে মেনে নিয়েছে এবং সেখানে নিজ নিজ কূটনৈতিক প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তান বর্তমানে যে অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে কোনোভাবেই তাদেরকে সবদিক থেকে সক্ষম বলা সম্ভব নয়। অর্থনীতি থেকে শুরু করে তাদের নানাবিধ বিষয় বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
দুই দেশ কী আবার আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে
দুই দেশ সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। কিন্তু কোনো দেশই পিছিয়ে আসতে চাইছে না। কারণ তাদের শঙ্কা, এটি করলে অপর পক্ষ তাকে দুর্বল বলে মনে করতে পারে।
পাকিস্তান আরও হামলার হুমকি দিয়ে আসছে। পাশাপাশি আফগানিস্তানের প্রশাসনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে বলছে। বর্তমানে সামরিক সক্ষমতা থেকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের তুলনায় অনেক এগিয়ে। আফগানিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে আধুনিক কিছুই নেই বলা চলে। পাশাপাশি পাকিস্তানের কাছে আরও একটি হাতিয়ার রয়েছে। আর তা হলো– আফগান শরণার্থী। ১৯৮০ এর দশক থেকে নিজেদের ভূখণ্ডে অনেক আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে পাকিস্তান। সংঘাত আরও বড় হলে তাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে দেশটি।
অন্যদিকে তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তির প্রবল তোড়ের মুখে টিকে থাকার কারণে পাকিস্তানকে ততটা গুরুত্ব না-ও দিতে পারে। তালেবান মুখপাত্র সম্প্রতি পাকিস্তানের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেছেন, পাক সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সমর্থিত যোদ্ধারা আশ্রিত রয়েছে। তারা হামলা চালাচ্ছে আফগানিস্তানের ওপর।
আবার পাকিস্তানের ভয় রয়েছে যে তালেবানের পক্ষ থেকে ধর্মীয় ফতোয়া জারি করা হতে পারে তাদের বিরুদ্ধে। তবে যা-ই বলা হোক না কেন, পাকিস্তানের ওপর আফগানিস্তান অনেক দিক থেকে নির্ভরশীল। আফগানিস্তান স্থলবেষ্টিত দেশ। বাণিজ্যের জন্য তাদের পাকিস্তানের সীমান্ত ব্যবহার করতে হয়। সংঘাতের কারণে সেসব বন্ধ থাকায় চাপ বাড়ছে তাদের ওপর।
দুই পক্ষই এটুকু নিশ্চিত যে সংঘাত কোনো কারণে বড় হলে তাদের দুই পক্ষকেই ব্যাপক মূল্য দিতে হবে। ঐতিহাসিক ও ভূতাত্ত্বিকভাবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এখন এটির ভিত্তিতে তারা যদি কিছু করতে পারে, তাহলে হয়তো আপাতত ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যাবে। তবে সম্পর্ক আগের জায়গায় ফিরতে সময় লাগবে আরও।
সূত্র: আল-জাজিরা