‘আমার মেয়র, তোমার মেয়র, মামদানি মামদানি’- এই স্লোগানে মনে হতে পারে এটি বাংলাদেশের নির্বাচনি প্রচারণার কোনো স্লোগান। কিন্তু তা নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাঙালিদের দেওয়া স্লোগান।
রবিবার (২ নভেম্বর) নিউইয়র্কের হিলসাইড অ্যাভিনিউতে মেয়র পদপ্রার্থী জোহরান মামদানির প্রচার সভায় বাঙালি সমর্থকরা এসব স্লোগান দেন।
রবিবার মামদানির অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে এ স্লোগান দেখা যায়। হিলসাইড অ্যাভিনিউতে ওই প্রচার সভায় উচ্ছ্বসিত জনতার ভিড় দেখা গেছে। যার মধ্যে বহু বাংলাদেশি ও ভারতীয়সহ দক্ষিণ এশীয়রা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মামদানি বলেন, ‘‘আমি এখানে একটু থামতে চাই। আমি এই ভিড়ের সবাইকে জিজ্ঞাসা করতে চাই যে আপনারা যারা এই শহরে বসবাস করেছেন, আপনাদের মধ্যে কতজনকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে ডাকা হয়েছে, কতজনকে কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিন নিজের নামটিকে বিকৃত করে বলতে শুনতে হয়েছে?’’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনাকে আপনার পরিচয়ের কারণে, আপনি কোথা থেকে এসেছেন তার কারণে, বা আপনি কী বিশ্বাস করেন তার কারণে যদি কখনো আপনাদেরকে ছোটো করা হয়ে থাকে, তাহলে আমিও আঘাতপ্রাপ্ত হই। ঠিক এই কারণেই ওই কথাগুলো আমাকে আঘাত করে। কারণ এগুলো আমাদের সবার সম্পর্কে।’
এই মেয়র পদপ্রার্থী আরও বলেন, মঙ্গলবার (আগামীকাল) আমরা কেবল একজন অসম্মানিত সাবেক গভর্নরকে বিদায় জানাচ্ছি না। আমরা সেই অসম্মানের রাজনীতিকেও বিদায় জানাচ্ছি। ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করা অন্য একটি ভিডিওতে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী, বিশেষ করে বাংলাদেশিরা তাদের নিজস্ব ভাষায়, ‘মামদানি, মামদানি, জোহরান মামদানি’-এর মতো ছন্দে বারবার স্লোগান দিতে দেখা যায়।
একটি অপ্রত্যাশিত ও তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর নিউইয়র্কবাসীরা আগামীকাল মঙ্গলবার তাদের নতুন মেয়রকে বেছে নেবেন।
ওবামার মুখে মামদানির প্রশংসা, পরামর্শদাতা হওয়ার প্রস্তাব
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শনিবার মামদানিকে ফোন করেন। তিনি মামদানির প্রচারণার প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে তার জন্য একজন পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। প্রায় ৩০ মিনিটের এই ব্যক্তিগত ফোন কলটি এমন দুজন ব্যক্তির মাধ্যমে জানা গেছে যারা হয় এতে অংশ নিয়েছিলেন অথবা কথোপকথনের পরপরই যাদেরকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। ব্যক্তিগত আলোচনার বিষয়বস্তু জানাতে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
নির্বাচনের ঠিক আগে সাবেক প্রেসিডেন্টের এই উদ্যোগটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ ডেমোক্র্যাট দলের প্রতিষ্ঠিত নেতাদের মধ্যে মামদানিকে নিয়ে বিভেদ রয়েছে এবং ওবামা এখনো এই দলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মামদানি যেভাবে প্রচার চালিয়েছেন তার প্রশংসা করেন ওবামা। তিনি নিজের অতীতের রাজনৈতিক ভুলগুলো হালকাভাবে উল্লেখ করেন এবং এত বড় মনোযোগের কেন্দ্রে থেকেও মামদানি খুব কম ভুল করেছেন বলেও মন্তব্য করেন। সূত্রগুলো জানায়, ওবামা মামদানিকে বলেন, ‘আপনার প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করা ছিল বেশ চিত্তাকর্ষক।’
পদ ছাড়ার পর থেকে মেয়র ও অন্যান্য ছোট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ না করার সাধারণ নীতি বজায় রেখে ওবামা আনুষ্ঠানিকভাবে মামদানিকে সমর্থন জানাননি। তবে, ডেমোক্র্যাট পার্টির অন্য নেতারা যখন এই ৩৪ বছর বয়সী গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী মামদানি থেকে সুস্পষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছেন, তখন এই ফোন কলটি ওবামার সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
ওবামা প্রস্তাব দিয়েছেন যে মামদানি নির্বাচনে জিতলে তিনি তার জন্য একজন ‘সাউন্ডিং বোর্ড’ (পরামর্শদাতা) হিসেবে কাজ করবেন। তারা ওয়াশিংটনে কোনো এক সময় ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাতের প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করেন, যদিও কোনো বৈঠকের তারিখ নির্ধারিত হয়নি।
সূত্র মতে, মামদানি সাবেক প্রেসিডেন্টকে ফোন করার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং তাকে বলেন যে ইসলাম-বিদ্বেষ নিয়ে তার নিজের সাম্প্রতিক বক্তৃতার অনুপ্রেরণা তিনি ওবামার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দেওয়া জাতিগত সম্পর্ক বিষয়ক বক্তৃতা থেকে পেয়েছেন।
মামদানির মুখপাত্র ডোরা পেটেক এক বিবৃতিতে বলেছেন, জোহরান মামদানি প্রেসিডেন্ট ওবামার সমর্থনের কথা এবং আমাদের শহরে এক নতুন ধরনের রাজনীতি নিয়ে আসার গুরুত্ব সম্পর্কে তাদের কথোপকথনের জন্য কৃতজ্ঞ।
ডেমোক্র্যাট দলের নেতাদের দ্বিধা
অন্যান্য জাতীয় ডেমোক্র্যাট নেতারা মামদানিকে সমর্থন করতে দ্বিধা দেখিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট নেতা, নিউইয়র্কের সিনেটর চক শুমার এখনো বলেননি যে তিনি মামদানিকে ভোট দেবেন কি না। শুমার এ সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’ হাউসের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট, নিউইয়র্কের প্রতিনিধি হাকিম জেফ্রিজ, মাসখানেক অবস্থান এড়িয়ে চলার পর প্রাথমিক ভোট শুরু হওয়ার ঠিক আগে মাত্র সমর্থন জানান।
রিপাবলিকানরা মামদানিকে ডেমোক্র্যাট পার্টির অন্যতম মুখ করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। হাউস রিপাবলিকানদের প্রচার শাখা এই সপ্তাহে একটি মেমো জারি করে বলেছে যে তারা তাকে দেশব্যাপী ডেমোক্র্যাট পার্টির সমার্থক করে তুলবে।
মেমোতে বলা হয়েছে, এটি নিউইয়র্কের একটি নির্বাচন নিয়ে নয়, এটি একটি দলের সমাজতন্ত্র এবং কট্টর বামপন্থার কাছে মাথা নত করার জাতীয় গল্প।
কুইন্সের অ্যাসেম্বলিম্যান মামদানি জুনে প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে সহজে পরাজিত করে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠিত মহলে চমক সৃষ্টি করেন। কুওমো এখন রিপাবলিকান মনোনীত প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ার পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ওবামা প্রথমবার মামদানিকে ফোন করেছিলেন জুন মাসের শেষের দিকে, তার প্রাইমারি জয়ের অল্প পরেই। মামদানির উপদেষ্টা প্যাট্রিক গ্যাসপার্ড, যিনি ওবামার ২০০৮ সালের প্রচারণায় এবং তার হোয়াইট হাউসে রাজনৈতিক পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছিলেন, বলেন যে সাবেক প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সেই প্রথম ফোন কলটি ছিল ‘অযাচিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত’। সূত্র: দি নিউইয়র্ক টাইমস