কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনার ফল না আসার জন্য পাকিস্তান ও আফগানিস্তান একে অন্যকে দায়ী করেছে। তবে সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষের পরও তারা জানিয়েছে, পূর্বে সম্মত যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল থাকবে। এর ফলে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা দু’পক্ষের আলোচনা কার্যত ভেস্তে গেল।
গতকাল শুক্রবার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার ঘোষণার কিছু পরই তালেবান জানিয়েছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন।
দুই দিনব্যাপী এই আলোচনা “সৎ উদ্দেশ্যে” হয়েছে বলে দাবি করেছেন আফগান সরকারের মুখপাত্র জবিহুল্লাহ মুজাহিদ। আজ শনিবার সকালে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আলোচনায় তালেবান সরকার আশা করেছিল ইসলামাবাদ বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব দেবে, যাতে মৌলিক সমাধানে পৌঁছানো যায়। কিন্তু পাকিস্তানি পক্ষ নিজেদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সব দায়ভার আফগান সরকারের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে, অথচ আফগানিস্তানের নিরাপত্তা বা নিজেদের দায়িত্বের বিষয়ে কোনো সদিচ্ছা দেখায়নি।”
মুজাহিদ আরও বলেন, পাকিস্তান “দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অসহযোগিতামূলক আচরণ” করেছে, যার ফলে আলোচনার “কোনো ফলাফল আসেনি”।
পরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তালেবান পক্ষ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেনি, এবং সেটি অব্যাহত থাকবে।
পাকিস্তান সরকার তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ইসলামাবাদ গতকাল শুক্রবারই নিশ্চিত করেছে যে আলোচনা অচলাবস্থায় পড়েছে এবং তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি, যদিও কাতারের মধ্যস্থতায় করা যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ততক্ষণ পর্যন্ত বহাল থাকবে– যতক্ষণ আফগান মাটি থেকে কোনো আক্রমণ হবেনা। আফগানিস্তান থেকে আক্রমণ হলে পাকিস্তান পাল্টা জবাব দিবে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, ইসলামাবাদ “আফগান জনগণ বা প্রতিবেশী দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপে তালেবান সরকারকে সমর্থন করবে না।”
পাকিস্তানের অভিযোগ, তালেবান সরকার ২০২১ সালের দোহা শান্তি চুক্তির আওতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে—বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ক্ষেত্রে।
ইসলামাবাদের দাবি, আফগান কর্তৃপক্ষ পাকিস্তানি তালেবান (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি)-এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে, যারা পাকিস্তানে বহু প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে পাকিস্তান আফগানিস্তানের ভেতরে একাধিক প্রাণঘাতী বিমান হামলা চালিয়েছে। গত মাসে কাবুলে হওয়া কয়েকটি বিস্ফোরণের জন্য তালেবান সরকার পাকিস্তানকেই দায়ী করেছিল।
তবে তালেবান সরকার টিটিপি-কে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তারা পারস্পরিক নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মুজাহিদ বলেন, “আমরা কাউকে আফগান ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দেব না, আবার কোনো দেশকেও আমাদের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা বা নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ করার মতো পদক্ষেপ নিতে আমাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেব না।”
তিনি আরও বলেন, “পাকিস্তানের জনগণ আমাদের বন্ধু ও ভাই; কিন্তু যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগানিস্তান দৃঢ়ভাবে প্রতিরক্ষা করবে।”
ইসলামাবাদ কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, তবে জানিয়েছে, পাকিস্তানের জনগণ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় “সমস্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” গ্রহণ করা হবে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, অক্টোবরের শুরু থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে আফগান সীমান্ত এলাকায় ৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ৪৪৭ জন আহত হয়েছেন। কাবুলে বিস্ফোরণে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তালেবান হামলায় তাদের ২৩ জন সেনা নিহত ও ২৯ জন আহত হয়েছে, যদিও বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে তারা কিছু জানায়নি। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/