যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো মিত্রদের জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষরে চাপ দেওয়া হবে। ওয়াশিংটনের বার্তা—কিয়েভ এখন চুক্তি না মানলে ভবিষ্যতে আরও কঠিন শর্ত মেনে নিতে হবে।
শুক্রবার রাতে কিয়েভে ন্যাটো রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে এই তথ্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সচিব ড্যান ড্রিসকল। জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক এবং হোয়াইট হাউসের ফোনকলের পর তিনি বলেন, “কোনো চুক্তিই নিখুঁত নয়, কিন্তু যত দ্রুত সম্ভব এটি সম্পন্ন করতে হবে।”
বৈঠকে উপস্থিত এক সূত্র জানায়, সভার পরিবেশ ছিল অত্যন্ত গম্ভীর। কয়েকজন ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত চুক্তির বিষয়বস্তু এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অভিযোগ ছিল—রাশিয়ার সঙ্গে এতো বড় আলোচনা হলেও মিত্রদের যথাযথভাবে জানানো হয়নি।
এক কূটনীতিক বলেন, “মিটিংটা দুঃস্বপ্নের মতো ছিল। আবারও সেই একই যুক্তি—‘তোমাদের কোনো কার্ড নেই’, ঠিক যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফেব্রুয়ারিতে এক বৈঠকে বলেছিলেন।”
সূত্রগুলো জানায়, প্রস্তাবিত চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে যা কিয়েভের পক্ষে মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব—রাশিয়ার দখলে থাকা অঞ্চল ছাড়াও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু এলাকা ছেড়ে দিতে হবে। এমনকি যুদ্ধাপরাধগুলোতেও সাধারণ ক্ষমার প্রস্তাব রয়েছে।
শুক্রবার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, এটি “আমাদের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন সময়।” ইউক্রেন এখন এমন এক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে বেছে নিতে হবে—“মর্যাদা হারানো, নাকি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হারানোর ঝুঁকি নেওয়া।”
রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে ড্রিসকলকে জিজ্ঞেস করা হয়, প্রস্তাবিত চুক্তি কি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ২৮ দফা পরিকল্পনারই প্রতিফলন? ড্রিসকল তা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, কিছু শুধু আনুষ্ঠানিক। আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেই কেন্দ্র করে এগোচ্ছি।”
আরও পড়ুন: ২৮ দফা শান্তি প্রস্তাব মেনে নিতে জেলেনস্কিকে চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প, কী আছে এতে?
এই পরিকল্পনা প্রকাশের ফলে ইউরোপীয় মিত্ররা হতচকিত হয়ে পড়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের অনেক কিছুই জানায়নি। ইউরোপের উদ্বেগ—রাশিয়া খসড়া চুক্তিতে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করেছে, আর তা এখন ইউক্রেনকে ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।
ড্রিসকল এই সমালোচনা নাকচ করে বলেন, এতে আলোচনা সহজ হয়। “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনই শান্তি চান। রান্নাঘরে যত বেশি রাঁধুনি, কাজে তত সমস্যা,” তিনি মন্তব্য করেন।
কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জুলি ডেভিসও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, চুক্তির শর্ত ইউক্রেনের জন্য কঠোর হলেও বিকল্প আরও খারাপ। “এখন থেকে চুক্তি আর ভালো হবে না, বরং আরও খারাপ হবে,” তিনি সতর্ক করেন।
ট্রাম্প চান, থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের আগে (আগামী বৃহস্পতিবার) মধ্যেই জেলেনস্কি চুক্তিতে সই করুন। ডেভিস বলেছেন, ট্রাম্প “অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সময়সূচি” নিয়ে এগোচ্ছেন এবং গত কয়েক দিনে কিয়েভে “অসাধারণ দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা” দেখা গেছে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, পূর্বাঞ্চলের এমন অঞ্চল ছেড়ে দিতে চাপ আসছে যা রাশিয়া গত ১১ বছরেও দখল নিতে পারেনি। তাদের মতে, এই চুক্তি “ইউক্রেনের জন্যই লাভজনক” এবং শেষে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি একসঙ্গে বসে “শান্তিচুক্তি”তে সই করবেন।
জানা গেছে, পরিকল্পনাটি প্রস্তুত করেছেন ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং রুশ উপদেষ্টা কিরিল দিমিত্রিয়েভ—যাদের মধ্যকার সম্পর্কই এখন ওয়াশিংটন ও মস্কোর প্রধান গোপন যোগাযোগ চ্যানেল। শিগগিরই ড্রিসকল রাশিয়া সফরে গিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবেন।
শুক্রবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই পরিকল্পনার কপি পেয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি চূড়ান্ত শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।” তারমানে এই ২৮ দফা প্রস্তাব নিয়ে শান্তিচুক্তিতে যেতে প্রাথমিকভাবে সম্মত রাশিয়া। সূত্র: দি গার্ডিয়ান
মাহফুজ/