সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান চার দেশের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, চার দেশের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশগ্রহণ পক্ষপাতদুষ্ট এবং এই প্রস্তাব মূলত সুদানের সেনাবাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বরাবরই সুদানের আধা সামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) অস্ত্র ও অর্থসহায়তা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। চলতি বছরের মার্চে সুদানের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার উদ্যোগকে আরব আমিরাত “কুৎসিত প্রচারণা” বলে আখ্যা দেয়।
গতকাল রবিবার রাতে নিজ দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বক্তব্যে আল-বুরহান বলেন, মিসর, সৌদি আরব, ইউএই ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত কোয়াডের (চার দেশ) সাম্প্রতিক প্রস্তাব “সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব কার্যত বিলুপ্ত করে দেবে এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকেও ভেঙে দেওয়ার কথা বলছে’’, অথচ “বিদ্রোহী মিলিশিয়াকে (আরএসএফ) তাদের অবস্থানে অটুট রাখছে।”
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যাচ্ছে
আল-বুরহানের এ অবস্থান সুদান সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) মধ্যে দফায় দফায় চলা
গৃহযুদ্ধ থামার সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। এই সংঘাতে ইতোমধ্যেই বহু হাজার মানুষ নিহত, অন্তত কোটি চৌদ্দ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত এবং দেশজুড়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আঞ্চলিক উপদেষ্টা মাশাদ বুলোসের ভূমিকাও সমালোচনা করেন। বুলোস সেনাবাহিনীকে মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করা ও রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছিলেন। আল-বুরহানের মতে, বুলোস ভবিষ্যতে শান্তি প্রক্রিয়ার অন্তরায় হতে পারেন।
তবে তিনি ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রশংসা করেন, ওয়াশিংটন সফরে তারা সুদানের যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
একই সঙ্গে আল-বুরহান দাবি করেন, কোয়াডের প্রতি আস্থা রাখা কঠিন, কারণ “বিশ্ব দেখেছে আরব আমিরাত কীভাবে সুদানি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়েছে।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এভাবে মধ্যস্থতা চলতে থাকলে আমরা এটিকে পক্ষপাতদুষ্ট মনে করব।
মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়
অন্যদিকে আরএসএফ জানিয়েছে, তারা প্রস্তাবিত মানবিক যুদ্ধবিরতিতে (ট্রুস) সম্মত, কারণ এতে যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া “ধ্বংসাত্মক মানবিক পরিস্থিতি” মোকাবিলা করার সুযোগ রয়েছে।
এই পরিকল্পনায় তিন মাসের যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুলতে পারে এবং ২০২১
সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর নতুন বেসামরিক সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি করবে।
তবে সেইসময় আরএসএফ পশ্চিম দারফুর অঞ্চলে দাপট ধরে রেখেছে। গত মাসে তারা এল-ফাশের শহর থেকে সেনাদের
হটিয়ে পুরো অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, আরএসএফ লাশ পোড়াচ্ছে ও গণকবর দিচ্ছে—যা গণহত্যার প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এলাকা থেকে পালানো হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা ব্যাপক ধর্ষণসহ ভয়াবহ নির্যাতনের কথা জানিয়েছেন।
মধ্য সুদানের কর্ডোফান অঞ্চলেও সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মাঝে অনিয়মিত লড়াই চলছে। গত শনিবার আরএসএফ আবারও পশ্চিম কর্ডোফানের কৌশলগত শহর বাবনুসা খুব শিগগির দখলের ঘোষণা দিয়েছে।
দুই বছরের যুদ্ধের সর্বনাশা চিত্র
২০২৩ সালের এপ্রিলে সেনাবাহিনী ও আরএসএফের ক্ষমতার লড়াই প্রকাশ্য যুদ্ধে রূপ নেওয়ার পর সুদান পুরোপুরি বিশৃঙ্খলায় ডুবে যায়। রাজধানী খার্তুমসহ বহু এলাকায় এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
জাতিসংঘ বলছে, এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে—যদিও মানবিক সংগঠনগুলোর মতে প্রকৃত সংখ্যা এর বহু গুণ বেশি।
এ যুদ্ধ বিশ্বে সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট তৈরি করেছে—কোটির ওপর মানুষ গৃহহীন, বহু অঞ্চল দুর্ভিক্ষসদৃশ অবস্থায় এবং সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/