ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, সিরিয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতা সম্ভব, তবে তিনি আশা করছেন সিরীয় কর্তৃপক্ষ দামাস্কাস থেকে জাবাল আল-শেখ পর্যন্ত একটি নিরস্ত্রীকৃত বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করবে — যে অঞ্চলটি বর্তমানে ইসরায়েল দখল করে রেখেছে।
নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য আসে মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর), এর আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি চান সিরিয়া ও ইসরায়েল দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ সম্পর্ক গড়ে তুলুক।
ইসরায়েল ও সিরিয়ার মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে কয়েক মাস ধরে আলোচনা চলছে, তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি।
সিরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না, আর গত বছর জুড়ে ইসরায়েল সিরীয় ভূমিতে তার অবৈধ দখল আরও বাড়িয়েছে।
ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে এবং পরে বেআইনিভাবে তা ইসরায়েলের অংশ ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপকে স্বীকৃতি দেয়, কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই তা প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর ইসরায়েল ১৯৭৪ সালের এক চুক্তি ভঙ্গ করে আরও সিরীয় ভূখণ্ড দখল করে। এর মধ্যে রয়েছে পুরো জাবাল আল-শেখ — একটি পর্বত, যেখান থেকে উত্তর ইসরায়েল ও দক্ষিণ সিরিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল দেখা যায়।
গত বছরজুড়ে সিরিয়া যুদ্ধ চায় না বলে দামাস্কাসের নতুন সরকার বারবার জানালেও ইসরায়েল দেশটিতে বহুবার হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ, গত শুক্রবার দামাস্কাসের দক্ষিণ-পশ্চিমে বেইত জিন্ন শহরে ইসরায়েলি হামলায় ১৩ জন নিহত হয়।
মঙ্গলবার আহত সৈন্যদের দেখতে গিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, “আমরা সিরিয়ার কাছে যা আশা করি তা হলো দামাস্কাস থেকে বাফার এলাকার দিকে, হেরমোন পাহাড় ও তার চারপাশসহ একটি নিরস্ত্রীকৃত বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করা,” যেখানে তিনি জাবাল আল-শেখের ইসরায়েলি নাম ‘মাউন্ট হেরমোন’ ব্যবহার করেন।
তিনি আরও বলেন, “আমরা এই এলাকাগুলো দখলে রেখেছি ইসরায়েলের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, এবং সেটাই আমাদের দায়িত্ব।”
নেতানিয়াহু যুক্ত করেন, “সৎ ইচ্ছা এবং এসব নীতির প্রতি বোঝাপড়া থাকলে সিরীয়দের সঙ্গে এক চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব, তবে যেকোনো পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের নীতিতে অটল থাকব।”
নেতানিয়াহুর দাবির তীব্র সমালোচনা
ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎস-এর কলামিস্ট গিদেওন লেভি নেতানিয়াহুর দাবিগুলোকে “বেহায়াপনা” বলে কড়া সমালোচনা করেন।
তিনি সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইসরায়েল যদি নিরাপত্তা জোন চায়, তা নিজেদের ভূখণ্ডেই করতে হবে। নেতানিয়াহু সিরিয়ার কাছ থেকে আরও ভূখণ্ড চাইছেন।”
লেভি আরও বলেন, “এটা শুধু ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটা যুদ্ধের পরিস্থিতি বজায় রাখার বিষয় — গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় যেভাবে করে আসছে। তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তার কাছে যুদ্ধবিরতি বলে কিছু নেই।”
ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা
ট্রাম্প প্রশাসন দুই দেশের মধ্যে একটি অনাক্রমণ চুক্তি (non-aggression pact) করিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিরিয়ার নতুন নেতা প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার প্রতি সমর্থনও জানিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, আল-শারার নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সরকার সিরিয়াকে বহু বছরের গৃহযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পর পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করার অঙ্গীকার করেছে, এবং এতে “অগ্রগতি হচ্ছে।”
ট্রাম্প লেখেন, “যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় কঠোর পরিশ্রম ও দৃঢ়তার মাধ্যমে অর্জিত ফলাফলে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। আমরা সবকিছু করছি যাতে সিরিয়ার সরকার তাদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী — একটি সত্যিকারের সমৃদ্ধ দেশ গড়তে — কাজ চালিয়ে যেতে পারে।”
ট্রাম্প আরও বলেন, “সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা যেন ভালো ফল নিশ্চিত করতে পারেন এবং সিরিয়া ও ইসরায়েল দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে — আমরা সে আশা করছি।”
ট্রাম্পের বিবৃতির কিছুক্ষণ পর নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানায়, দুই নেতা ফোনে কথা বলেছেন।
মঙ্গলবার মার্কিন বিশেষ দূত টম ব্যারাক দামাস্কাসে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শায়বানির সঙ্গে সিরিয়া-ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে বৈঠক করেন। গত সোমবার তিনি প্রেসিডেন্ট আল-শারার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
স্থবির হয়ে পড়া আলোচনা
ইসরায়েল ও সিরিয়া কয়েক মাস ধরে সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করলেও ইসরায়েলি গণমাধ্যম সম্প্রতি জানিয়েছে— আলোচনা মূলত অচলাবস্থায় আছে। প্রধান কারণ নেতানিয়াহুর অনমনীয় অবস্থান— গত এক বছরে দখল করা সিরীয় ভূখণ্ড থেকে সরে আসতে তিনি রাজি নন।
এছাড়াও, খবর অনুযায়ী, ইসরায়েল দাবি করেছে সিরিয়ার ওপর দিয়ে ইরানে যাওয়ার একটি আকাশপথ বজায় রাখতে হবে — ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে ইসরায়েলি বিমান হামলার জন্য। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/