তিব্বতের মালভূমি জুড়ে দ্রুত সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে চীন। নতুন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশটি অতি উচ্চতায় অন্তত ১৬টি নতুন বা আধুনিকায়ন করা বিমানঘাঁটি ও হেলিপোর্ট নির্মাণ করছে, যেগুলো ভারতের সঙ্গে বিতর্কিত সীমান্তে সামরিক শক্তি প্রদর্শন ক্ষমতা বাড়াতে চীনের বড় উদ্যোগ।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের পর্যালোচিত ১০০ এর বেশি স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, এসব সামরিক উন্নয়ন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে। অনেক ঘাঁটি ১৪ হাজার ফুটেরও ওপরে অবস্থিত।
উঁচুভূমিতে সামরিক কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক
স্যাটেলাইট পর্যালোচনায় দেখা যায়, নতুন করে পাকা করা লম্বা রানওয়ে তৈরি করা হয়েছে, যার কিছু ১৪ হাজার ৮৫০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশাপাশি ৭০টিরও বেশি শক্তপোক্ত বিমান রাখার ঘাঁটি নির্মাণ চলছে।
এগুলোতে চীন স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান এবং ড্রোন মোতায়েন করতে পারবে যা আগের তুলনায় অনেক কাছাকাছি লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) এলাকায়।
আরও দেখা গেছে, অরুণাচল প্রদেশের কাছে লুনজের মতো ঘাঁটিতে ডজন-ডজন নতুন বিমানশেল্টার ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। কোথাও কোথাও পাহাড় সমতল করে রানওয়ে ও ঘাঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে, অতি উচ্চতা ও কঠিন আবহাওয়ার মধ্যেই শত শত শ্রমিক কাজ করছেন।
ড্রোন অভিযান আরও বিস্তৃত
চীন তার এসব ঘাঁটিতে কৌশলে বড় পরিসরে ড্রোন যুক্ত করছে। তিব্বতের কয়েকটি ঘাঁটিতে এখন উন্নতমানের সামরিক ড্রোন পরিচালনা করা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
• GJ-11 শার্প সোর্ড স্টেলথ কমব্যাট ড্রোন
• WZ-7 সোয়ারিং ড্রাগন উচ্চ-উচ্চতায় নজরদারি ড্রোন
• CH-4 ও CH-5 দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও হামলা চালানোর ড্রোন
এই ড্রোনগুলো ভারতের অবস্থানের ওপর ধারাবাহিক গোয়েন্দা নজরদারি পরিচালনা, দ্রুত নির্ভুল হামলার সক্ষমতা এবং পাইলট ঝুঁকি ছাড়াই সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালানোর সুযোগ বাড়াচ্ছে।
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক ঘাঁটিকে “দ্বৈত–ব্যবহারযোগ্য” বললেও, শিগাটসের মতো ঘাঁটিতে স্টেলথ ড্রোন মোতায়েনকে সামরিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে।
চরম উচ্চতায় বিমান চালানো অত্যন্ত কঠিন। কম বাতাসে ইঞ্জিনের শক্তি কমে যায়, ফলে বেশি লম্বা রানওয়ে দরকার হয়। পাইলটদের উচ্চতাজনিত অসুস্থতা, অক্সিজেনের অভাব ও বিভ্রান্তির ঝুঁকি থাকে।
ঘাঁটির কর্মীদেরও হিমশীতল আবহাওয়া, তীব্র বাতাস ও প্রবল অতিবেগুনি রশ্মির সঙ্গে লড়তে হয়।
এসব চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, চীন বিশেষায়িত পর্বত–বিমান ইউনিট গড়ে তুলছে। পিপলস লিবারেশন (পিএল) বিমানবাহিনী “প্ল্যাটো ঈগল” নামে পরিচিত পাইলট ও প্রযুক্তিবিদ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে—অতিরিক্ত অক্সিজেন সিস্টেম, বিশেষ ঠান্ডা-পোশাক ও উচ্চতা উপযোগী শারীরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।
২০২০ সালের গালওয়ান ঘটনার পর কৌশলগত পরিবর্তন
২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার ভারতের সংঘর্ষের পর চীনের অবকাঠামো উন্নয়ন দ্রুত বেড়ে যায়। ওই সংঘর্ষ দেখিয়ে দেয় কঠিন পাহাড়ি এলাকায় কেবল স্থলবাহিনীর ওপর নির্ভরতা বড় দুর্বলতা।
এরপর চীন স্পষ্ট কৌশল নেয়: উচ্চ ভূমিকে বাধা নয়, বরং দ্রুত সেনা পরিবহন ও স্থায়ী আকাশ–আধিপত্যের প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে।
অতি উচ্চতায় নির্মিত এসব নতুন বিমানঘাঁটির নেটওয়ার্ক চীনকে সক্ষম করছে—
• মাত্র কয়েক ঘণ্টায় সীমান্তে সেনা, সাঁজোয়া যান ও সরঞ্জাম পাঠাতে
• লাদাখ, অরুণাচল ও সিকিমজুড়ে প্রায় অবিরাম ড্রোন নজরদারি চালাতে
• বিমানকে শক্তপোক্ত শেল্টারে আগে থেকেই রাখার মাধ্যমে হামলা বা নাশকতা মোকাবিলা করতে
• সীমান্ত সংকট হলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া বা উত্তেজনা বাড়াতে
ভারতের জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা যে অতি উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বিমান পরিচালনা সবসময় ভারতের প্রাকৃতিক সুবিধা বলে বিবেচিত হতো, চীন তা দ্রুত বদলে দিচ্ছে। নতুন রানওয়ে, শক্ত কংক্রিট শেল্টার এবং স্টেলথ ইউএভি উচ্চভূমিতে চীনের সক্ষমতাকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
ভারত পর্যবেক্ষণ করছে
ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাকারীরা চীনের এসব নতুন ঘাঁটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, বিশেষ করে যেগুলো লাইন অব কন্ট্রোল থেকে মাত্র ৪০–৬০ কিলোমিটার দূরে।
ভারতও নিজস্ব অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করছে, ন্যোমা ও লেহ ঘাঁটির রানওয়ে উন্নয়ন, বিমান–প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার এবং নজরদারি ক্ষমতা বাড়িয়ে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই বিশাল ও দ্রুত সামরিক নির্মাণ ভবিষ্যতে হিমালয় অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারে, কারণ এটি সীমান্ত এলাকায় চীনের স্থায়ী, রিয়েল-টাইম উপস্থিতি নিশ্চিত করছে।
হিমালয়ে সামরিকীকরণের নতুন যুগ
তিব্বতি মালভূমিকে ঘন বিমানঘাঁটির নেটওয়ার্কে রূপান্তর করার এই উদ্যোগ গত কয়েক দশকের মধ্যে চীনের অন্যতম বড় সামরিক নির্মাণ প্রকল্প। এসব ঘাঁটি পুরোপুরি কার্যকর হলে হিমালয় সীমান্ত এখন এমন এক অঞ্চলে রূপ নেবে যেখানে ড্রোন, শক্তপোক্ত শেল্টার ও লম্বা রানওয়েই কৌশলগত সুবিধা নির্ধারণ করবে। অথচ হিমালয় একসময় পাহাড়ি পথ ও দুর্গম ভূখণ্ড দ্বারা নির্ধারিত ছিল।
মাহফুজ/