গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখল করার ‘উচ্চাভিলাষী কল্পনা’ থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের পর ট্রাম্প আবারও আর্কটিক অঞ্চলের এই ভূখণ্ডটি দখলের হুমকি দেওয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে গ্রিনল্যান্ড।
কঠোর ভাষায় দেওয়া এক বিবৃতিতে নিলসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের বক্তব্য “পুরোপুরি ও সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য”। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আর নয়, যথেষ্ট হয়েছে।”
রবিবার ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডকে “খুবই দরকার”। এতে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই দ্বীপে হামলা চালাতে পারে।
গ্রিনল্যান্ড একসময় ডেনমার্কের উপনিবেশ ছিল এবং এখনো ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ, যদিও এটি অনেকটাই স্বায়ত্তশাসিত। তবে পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি এখনও কোপেনহেগেনের নিয়ন্ত্রণে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিলসেন লেখেন, “বন্ধুদের মধ্যে হুমকি, চাপ কিংবা দখলের কথা বলা যায় না। যারা বারবার দায়িত্বশীলতা, স্থিতিশীলতা ও আনুগত্য দেখিয়েছে, তাদের সঙ্গে এভাবে কথা বলা ঠিক নয়। যথেষ্ট হয়েছে। আর কোনো চাপ নয়। আর কোনো ইঙ্গিতপূর্ণ কথা নয়। দখলের কল্পনাও নয়।”
তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ড সংলাপে আগ্রহী, তবে তা হতে হবে সঠিক কূটনৈতিক পথে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায়—“সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলোমেলো ও অসম্মানজনক পোস্টের মাধ্যমে নয়।”
নিলসেন আরও বলেন, “গ্রিনল্যান্ড আমাদের ঘর, আমাদের ভূখণ্ড। আর সেটাই থাকবে।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গ্রিনল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়েছে। সোমবার ইইউ জানায়, তারা আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির পক্ষে অবস্থান থেকে সরে আসবে না, বিশেষ করে যখন ২৭ সদস্যের কোনো দেশের বিষয় জড়িত থাকে।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক মুখপাত্র আনিটা হিপার বলেন, “জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সীমান্তের অখণ্ডতা, এই নীতিগুলো আমরা রক্ষা করব।”
এর আগে রবিবার ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেত্তে ফ্রেদেরিকসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলা “একেবারেই অর্থহীন”। তিনি বলেন, ডেনমার্ক রাজ্যের তিনটি দেশের কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রের দখল করার অধিকার নেই।
তবে চলতি বছরে সাধারণ নির্বাচনের মুখে থাকা ফ্রেদেরিকসেনের ওপর চাপ বাড়ছে। গ্রিনল্যান্ডে হামলা হলে ডেনমার্ক কী করবে, সে বিষয়ে কূটনীতির বাইরে গিয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা দেওয়ার জন্য।
ডেনিশ পার্লামেন্টের গ্রিনল্যান্ড প্রতিনিধি আজা কেমনিৎস বলেন, তিনি মনে করেন না যে এখনই হামলা হবে, তবে গ্রিনল্যান্ডবাসীর “সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত”।
তিনি বলেন, “ভালোটা আশা করতে হবে, কিন্তু খারাপের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।”
তার মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য গ্রিনল্যান্ড নিয়ে দেওয়া হুমকিগুলোর মধ্যে “সবচেয়ে গুরুতর” এবং এটি একটি “নতুন বিশ্বব্যবস্থার” ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, “আগে আমরা ভাবতাম, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমেই সবকিছু সম্ভব। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে কথা বলছে, তা সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতা।”
কেমনিৎস আরও বলেন, “গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি আমাদের হাতে। আমি বুঝি ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডে আগ্রহী হতে পারেন, কিন্তু গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে আগ্রহী নয়।”
গত বছর গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দিয়ে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন। এরপর কয়েক মাস বিষয়টি নিয়ে তিনি তুলনামূলক চুপ ছিলেন। কিন্তু ভেনেজুয়েলায় বোমাবর্ষণ করে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরার পর এবং সপ্তাহান্তের মন্তব্যে আবারও আশঙ্কা জেগেছে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের প্রশ্নে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবেন কি না, এ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি ২০ দিন পরে বিষয়টি দেখবেন। এরপর ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়েও বিদ্রূপ করেন।
ট্রাম্প বলেন, “এই মুহূর্তে গ্রিনল্যান্ডজুড়ে চীনা ও রুশ জাহাজ ভরা। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। ডেনমার্ক এই দায়িত্ব সামলাতে পারবে না।”
গত মাসে ডেনিশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র তার অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে মিত্রদের ওপর চাপ দিচ্ছে এবং সামরিক শক্তির হুমকিও দিচ্ছে। আর্কটিক অঞ্চলে বরফ গলতে থাকায় খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, এই প্রেক্ষাপটেই উত্তেজনা বাড়ছে।
ডেনমার্কের নর্ডিক প্রতিবেশী সুইডেন, নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড সবাই ডেনমার্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেন, “ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধু ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডেরই। সুইডেন আমাদের প্রতিবেশী দেশের পাশে পুরোপুরি আছে।” সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
মাহফুজ/