নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর ভারত সরকার ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলা ভাষায় দেওয়া এক টুইট বার্তায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি বাংলাদেশের জন্য একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিশ্রুতিতে ভারতের সমর্থন ব্যক্ত করেন। ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানকে দেওয়া এই অভিনন্দন বার্তায় মোদি দুই দেশের বহুমুখী সম্পর্ক জোরদারে একত্রে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তবে এই উষ্ণ বার্তার নেপথ্যে রয়েছে গত কয়েক মাসের চরম উত্তেজনা ও অবিশ্বাসের এক দীর্ঘ ইতিহাস।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ‘জেন জি’র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কের ফাটল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর ভারতের মাটিতে তার অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী ক্ষোভ ঘনীভূত হয়। সাধারণ বাংলাদেশিদের অভিযোগ, দিল্লি দীর্ঘ সময় ধরে একজন স্বৈরাচারী শাসকের পেছনে বিনিয়োগ করেছে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের চেয়ে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থকে বড় করে দেখেছে। এই তিক্ততার ফলে বর্তমানে ভিসা পরিষেবা প্রায় বন্ধ, আন্তসীমান্ত বাস ও ট্রেন যোগাযোগ স্থগিত এবং বিমান চলাচলের সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও অবিশ্বাসের দেয়াল
দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে বিএনপি মোটেও অপরিচিত কোনো দল নয়। তবে অতীত ইতিহাস খুব একটা সুখকর ছিল না। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। শুরুতে ভারতের তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র অভিনন্দন জানালেও দ্রুতই আস্থার সংকট দেখা দেয়। ভারতের মূল উদ্বেগের জায়গা ছিল দুটি: উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করতে দেওয়া এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন। বিশেষ করে ২০০৪ সালের ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনাটি ছিল দুই দেশের সম্পর্কের মূলে চরম আঘাত। এ ছাড়া টাটা গ্রুপের ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব ভেস্তে যাওয়াও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে স্থবিরতা এনেছিল।
হাসিনা-পরবর্তী ভারতের কৌশল ও বর্তমান পরিস্থিতি
গত ১৫ বছর ভারত সর্বাত্মক কৌশলগত বিনিয়োগ করেছে। বিনিময়ে শেখ হাসিনা ভারতকে নিরাপত্তা সহযোগিতা, যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে অভূতপূর্ব সহায়তা দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে শেখ হাসিনা দিল্লিতে নির্বাসিত এবং তার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ভারত তাকে ফেরত দিতে অস্বীকার করায় ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির আলোচনা শুরু করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এবং তারেক রহমান কূটনৈতিক পরিপক্বতা দেখাচ্ছেন। তারেক রহমান তার সাম্প্রতিক জনসভায় স্পষ্ট করেছেন যে, তার নীতি হবে ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ’। এটি দিল্লির জন্য একাধারে স্বস্তির এবং সতর্কতার বার্তা।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তান সব সময়ই একটি সংবেদনশীল ইস্যু। হাসিনার পতনের পর থেকেই ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়া এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর দিল্লির জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষক স্মৃতি পট্টনায়কের মতে, একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যে কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে, কিন্তু এই সম্পৃক্ততা যেন ভারতের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি তৈরি না করে। হাসিনার আমলে যে সম্পর্ক একপক্ষীয় ছিল, এখন তা যেন বিপরীত দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে না যায়, সেদিকেই নজর দিল্লির।
নতুন সূচনার পথে বাধা ও সম্ভাবনা
সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর অতিরঞ্জিত বক্তব্য। ভারতের অনেক নেতা ও টিভি স্টুডিও থেকে বাংলাদেশকে একটি ‘অনুগত ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখার যে প্রবণতা রয়েছে, তা বাংলাদেশের মানুষের মনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল মনে করেন, নতুন এই বাস্তবতা নির্ভর করবে ঢাকা কীভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব সামলায় এবং দিল্লি কীভাবে তাদের আগ্রাসী প্রচারণার লাগাম টানে তার ওপর। অতি সম্প্রতি আইপিএলে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের সুযোগ না দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বন্ধন
এত তিক্ততার মাঝেও দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এখনো টিকে আছে। বার্ষিক সামরিক মহড়া, নৌ-টহল এবং ৫০০ মিলিয়ন ডলারের লাইন অব ক্রেডিট বা প্রতিরক্ষা ঋণের মতো বিষয়গুলো বিএনপির নতুন সরকার পুরোপুরি বাতিল করবে বলে মনে হয় না। এ ছাড়া ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত এবং বিশাল বাণিজ্য দুই দেশকে প্রাকৃতিকভাবেই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, আর ভারত এশিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার।
উদ্যোগ ভারতকেই নিতে হবে
বিশ্লেষকরা একমত যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই দূরত্ব দীর্ঘ মেয়াদে কারও জন্যই কল্যাণকর নয়। অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকেই প্রথম উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপি গত ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে অনেক শিক্ষা নিয়েছে এবং তারা এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী। ভারতের উচিত অহেতুক সতর্কতা ও সন্দেহ সরিয়ে রেখে বাংলাদেশের জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানানো। এই ‘রিসেট’ বা নতুন শুরু নির্ভর করবে দিল্লির সাহসিকতা এবং ঢাকার নতুন নেতৃত্বের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ওপর। সূত্র: বিবিসি