যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে চলার প্রেক্ষাপটে ইরানও যুদ্ধের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটি তার পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আরও সুরক্ষিত করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র পুনর্গঠন করেছে।
জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে সাড়ে তিন ঘণ্টার পরোক্ষ বৈঠক হলেও তা থেকে স্পষ্ট কোনো সমাধান আসেনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, দুই পক্ষ কিছু ‘নির্দেশনামূলক নীতিতে’ একমত হয়েছে। তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্ধারিত সীমারেখা মানতে রাজি হয়নি ইরান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসকে জানানো হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে বিমান ও নৌ-সম্পদ জড়ো করার পর যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী সপ্তাহান্তের মধ্যেই হামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে।
গত জুনে ইসরায়েলের আকস্মিক হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমান্ডাররা ক্ষতিগ্রস্ত হন। ১২ দিনের সংঘাতে ইরান ইসরায়েলের শহরগুলো লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খোররামাবাদের ইমাম আলি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর কিছু ইতোমধ্যে পুনর্নির্মাণ বা মেরামত করা হয়েছে। তাবরিজ বিমানঘাঁটি ও হামাদান বিমানঘাঁটিতেও রানওয়ে ও আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কার করা হয়েছে। শাহরুদে কঠিন জ্বালানিভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র দ্রুত পুনর্গঠন করা হয়েছে, যা দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত মোতায়েনের সক্ষমতা বাড়ায়।
ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নাতানজের কাছে পিকঅ্যাক্স পর্বতের ভেতরে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় নতুন কংক্রিট ঢেলে প্রবেশপথ আরও সুরক্ষিত করা হয়েছে। পারচিন সামরিক কমপ্লেক্সের ‘তালেঘান ২’ স্থাপনায় কংক্রিট কাঠামো তৈরি করে তার ওপর মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। ইসফাহানের কাছে সপ্তম তির শিল্প কমপ্লেক্সেও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনা চললেও দুই পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে।
মিডলবারি কলেজের গ্লোবাল সিকিউরিটির বিশিষ্ট গবেষক জেফ্রি লুইস সিএনএনকে বলেন, ‘আমার মনে হয় ইরান তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করছে। সম্ভবত ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’-এর সময় ইসরায়েল যে দাবি করেছিল তার চেয়েও দ্রুত।’ তিনি জুন মাসে ইসরায়েলের হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করছিলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ এবং অন্যান্য কিছু তথ্য থেকে বোঝা যায়, হামলার আগেই ইরান হয়তো ওই সরঞ্জামগুলো নিরাপদ ভূগর্ভস্থ স্থানে সরিয়ে নিতে পেরেছিল অথবা সেগুলোর বিকল্প জোগাড় করেছিল।’
গত বছরের ইসরায়েল-ইরান সংঘাত ইরানের কমান্ড কাঠামোর দুর্বলতাও প্রকাশ করে দেয়। চাপের মুখে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে জানা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রাদেশিক গভর্নরদের হাতে ন্যস্ত হয়েছিল।
এরপর থেকে তেহরান তার সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করেছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন খামেনির ঘনিষ্ঠ আলী লারিজানি। পাশাপাশি যুদ্ধকালীন শাসন পরিচালনার জন্য নতুন একটি সংস্থা প্রতিরক্ষা পরিষদ গঠন করা হয়েছে।
গত বছরের যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া যুদ্ধ অভিজ্ঞ ও সাবেক ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কমান্ডার আলী শামখানিকে চলতি মাসে ডিফেন্স কাউন্সিলের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নূর নিউজ জানিয়েছে, এই নিয়োগের লক্ষ্য হলো ‘সমগ্রভাবে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করা’ এবং ‘উদীয়মান হুমকি মোকাবিলায় কার্যকর প্রক্রিয়া তৈরি করা।’ সূত্র: সিএনএন