প্রতিটি বাড়িতে হিউম্যানয়েড রোবট স্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। এ জন্য তারা এদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বেইজিংয়ের উপকণ্ঠে এক্স-হিউম্যানয়েডের রোবট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এই প্রশিক্ষণ দিতে দেখা যায়। প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলে এই রোবট একসময়ে দোকান, অফিস এবং বাড়িতে কাজ করতে পারবে।
রোবটকে কার্যকরভাবে মানুষের স্থান নেওয়ার কৌশল শেখাতে বিপুল পরিমাণ ডেটার প্রয়োজন। এই ডেটা তৈরি হচ্ছে মানুষের দ্বারা, যারা দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজ করার সময় নিজেদের ভিডিও রেকর্ড করছে। রোবট প্রশিক্ষণের জন্য মূলত ব্যবহৃত হয় ফার্স্ট-পারসন ফুটেজ। এটি হিউম্যান ডেটা নামেও পরিচিত। গত কয়েক মাস ধরে স্টার্টআপগুলো বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মীর হিউম্যান ডেটার ভিডিও সংগ্রহ করে সেই প্রশিক্ষণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
চীনজুড়ে ইতোমধ্যে ৬০টি রোবট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রযুক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারঅ্যাক্ট অ্যানালাইসিসের সাংহাইভিত্তিক বিশ্লেষক মার্কো ওয়াং বলেন, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার জন্য চীনে গণ-উৎপাদিত অসংখ্য হিউম্যানয়েড রোবট কেনা হয়েছে।
দেশটির মাইক্রো-১-এর রোবোটিকস প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে গত বছর থেকে নিজস্ব রিমোট ভিডিওগ্রাফার দল নিয়োগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট আরিয়ান সাদেঘি বলেছেন, ‘উৎপাদন, কারখানার গুদাম, খুচরা ব্যবসা, নার্সিং হোম, হাসপাতাল–মূলত প্রতিটি ক্ষেত্রেই গৃহস্থালি ডেটার প্রয়োজন হয় এবং এর কারণ হলো সবগুলোর গতিবিধি ভিন্ন ভিন্ন।’ প্রশিক্ষণে নিয়োজিত কর্মীদের পালাক্রমে বিভিন্ন কাজ করতে এসব ডেটার ভিডিও জমা দিতে হয়।
ডেটা অ্যানোটেশন কোম্পানি অবজেক্টওয়েজের প্রতিষ্ঠাতা রবি রাজালিঙ্গম। মানুষের ডেটা সংগ্রহের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ শুরু করার পর থেকে তিনি দেখেছেন যে জমা দেওয়া ফুটেজের প্রায় অর্ধেকই ব্যবহারযোগ্য।
কেউ কেউ মার্কিন পরিবারগুলোর ডেটার জন্য বেশি অর্থ দিতে ইচ্ছুক, যদিও এর ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ভিয়েতনাম বা ভারতের একজন শ্রমিকের তুলনায় তিন গুণ বেশি হতে পারে। ‘ভারতের রান্নাঘর আমেরিকার রান্নাঘর থেকে অনেকটাই আলাদা। ভারতে একটি ঝাড়ু আর আমেরিকায় একটি ঝাড়ু সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটা নির্ভর করে আপনি আপনার রোবটগুলোকে প্রথমে কোথায় রাখবেন তার ওপর,’ বললেন রাজালিঙ্গম। ‘এ কারণেই আমরা সারা বিশ্ব থেকে এগুলোর ফুটেজ সংগ্রহ করছি।’
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়া সম্প্রতি তাদের একটি প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রোবট প্রশিক্ষণে ২০ হাজার ঘণ্টারও বেশি ফার্স্ট-পারসন ভিডিও অন্তর্ভুক্ত করার ফলে টি-শার্ট গোটানো, তাস গোটানো, বোতলের ছিপি খোলা এবং সিরিঞ্জ ব্যবহারের মতো কাজগুলোর সফলতার হার ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
টেক্সাস ইউনিভার্সিটি অ্যাট অস্টিনের রোবোটিকস গবেষক রুতাভ শাহ বলেছেন, ‘সাধারণ কাজের রোবটগুলোর এত বেশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হওয়ার অন্যতম কারণ হলো গৃহস্থালির পরিবেশের চরম অনিশ্চয়তা। কারণ আসবাবপত্র, যন্ত্রপাতি এবং মানুষ ক্রমাগত নড়াচড়া করে।
শাহ বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে যার অভাব রয়েছে তা হলো বল, ঘর্ষণ এবং অনিশ্চয়তা সম্পর্কে মানুষের মতো সহজাত বোধ, যা মানুষ তার জীবনভর অর্জন করে। রান্না, পরিষ্কার করার মতো দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজে রোবটকে সাধারণভাবে উপযোগী করে তোলাই হবে স্বয়ংক্রিয়করণের শেষ ধাপ।’
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রোবোটিকসের গবেষণা বিভাগের চেয়ারম্যান আলেকজান্ডার ভার্ল বলেছেন, এখন পর্যন্ত হিউম্যানয়েড রোবটগুলোকে প্রধানত কারখানার মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মোতায়েন করা হয়েছে, যেখানে তারা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষেত্রে তাদের কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘টি-শার্ট ভাঁজ করার ক্ষেত্রেও রোবটের সাফলতা লক্ষ করা গেছে।’ সূত্র: সিএনএন