সাইপ্রাসে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স আক্রোতিরি স্টেশন থেকে রাতের আকাশে উড়ন্ত টাইফুন এবং এফ-৩৫ বিমানের গর্জন স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল। এর কিছুক্ষণ পরেই ইরানি ড্রোন ধ্বংস করার একটি অভিযানে যোগ দিতে যাওয়া একটি বড় জ্বালানিবাহী বিমানের গর্জন শোনা গেল।
রয়্যাল এয়ার ফোর্সের এই বিমানটি (ভয়েজার) আকাশে একটি বিশাল পেট্রল স্টেশনের মতো, যা টাইফুন এবং এফ-৩৫ জেটগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই বিমানগুলো সাইপ্রাস এবং জর্ডানের আকাশে টহল দিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই বিবিসি এই ধরনের প্রতিরক্ষামূলক অভিযানগুলো পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
ভয়েজারের ককপিটের ভেতর থেকে আমরা সাইপ্রাসের মিটমিটে আলো মিলিয়ে যেতে দেখছিলাম। আমরা ইসরায়েল ও লেবাননের উপকূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
‘আমরা প্রায়ই এখানে ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র অথবা তার জবাবে ইসরায়েলিদের ছোড়া প্রতিরোধক বিমান দেখতে পাই,’ একজন কর্মী উল্লেখ করেন। ঠিক পরের বাক্যেই তিনি বললেন, ‘এটা ইসরায়েলের লৌহ গম্বুজও হতে পারে।’ ৯ ঘণ্টার এই অভিযান চলাকালে টাইফুন ও এফ-৩৫ বিমানগুলো ভয়েজারকে সাতবার জ্বালানি সরবরাহ করে, যার মোট পরিমাণ ছিল ৩০ টন।
জ্বালানি স্টেশনে থাকাকালীন আমরা দেখলাম, তারা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসছে এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক ও সূক্ষ্ম একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আকাশেই তাদের ট্যাংকভর্তি করছে। যে সময় যুদ্ধবিমানগুলো একটি বড় ট্যাংকের থেকে ঝুলে থাকা পাইপের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
যুদ্ধবিমানের পাইলটদের জন্য মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরা একটি নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। তবে এই মুহূর্তে আসল চ্যালেঞ্জ হলো ইরানি ড্রোনগুলোকে খুঁজে বের করে ধ্বংস করা। গত এক মাসে সাইপ্রাস ও কাতার থেকে পরিচালিত ব্রিটিশ যুদ্ধবিমানগুলো বেশ কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তারা তাদের আধুনিক এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল উন্নত স্বল্প পাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কতবার ব্যবহার করেছে, তা তারা জানায়নি।
এই দামি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সোনালি বুলেটের মতো দেখতে এবং এগুলো ফাইবার গ্লাস দিয়ে তৈরি অপেক্ষাকৃত কম দামি একটি ড্রোনকে ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত হয়। আরএএফের এফ-৩৫ বিমানের পাইলট স্কোয়াড্রন লিডার বেইলি মিশনটির জটিলতা বর্ণনা করেন। ‘একটি দ্রুতগতির জেটে কাজ করা এমনিতেই বিপজ্জনক, বিশেষ করে যখন আকাশে এবং মাটির কাছাকাছি কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার চেষ্টা করা হয়’ তিনি বলেন।
তিনি বলেন, যেহেতু ড্রোনগুলো নিচু উচ্চতায় এবং তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে ওড়ে, তাই সেগুলোর মাটিতে আছড়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
তার মতে, হুমকি শুধু শত্রুপক্ষের কার্যকলাপই নয়, বরং ওই এলাকায় অন্য বিমানের একে অপরের খুব কাছাকাছি ওড়াও বটে।
এই অভিযানে তারা কোনো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি। কিন্তু যুদ্ধের শুরু থেকেই তারা ‘অপারেশন লুমিনোস’ নামে অভিযান চালিয়ে আসছে।
সমালোচনা সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রীরা বারবার বলেছেন, সংঘাতের আগে তারা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই সাইপ্রাসে অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও জনবল পাঠানো হয়েছিল।
সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল টম বেউইক বলেছেন, যুদ্ধের আগে ‘সতর্ক পরিকল্পনা’ করা হয়। সেখানে ছিল অতিরিক্ত ভূমিভিত্তিক বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু যুদ্ধের দ্বিতীয় রাতে সাইপ্রাসের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানো হয়। সম্ভবত লেবানন থেকে উৎক্ষেপিত ছোট ড্রোনটি ঘাঁটির যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর ব্যবহৃত একটি হ্যাঙ্গারে আঘাত হানে।
এটা সর্বজনবিদিত যে যুক্তরাষ্ট্র আরএএফ আক্রোতিরি থেকে নিয়মিতভাবে ইউ-২ গুপ্তচর বিমান ওড়ায়, যদিও এই বিষয়টি জনসমক্ষে স্বীকার করা হয় না। বিবিসি জানতে পেরেছে, দুই মিটার ডানাবিশিষ্ট একটি ড্রোনকে ঘাঁটিটির দিকে এগিয়ে আসতে রাডারে শনাক্ত করা হয়েছিল। তখন বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি করা হয় এবং লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। জেনারেল টম বুইকের মতে, ক্ষতিটা সামান্যই ছিল।
তিনি বলেন, তাদের প্রচেষ্টায় তেমন কোনো লাভ হয়নি এবং তিনি সন্দেহ করেন, যে বা যারা ড্রোনটি চালিয়েছে, তারা ‘তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে।’ জেনারেল টম বুইকের মতে, এই ঘটনার পর আক্রোতিরি ঘাঁটির বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।’ বর্তমানে ঘাঁটিটিতে আটটি টাইফুন এবং আটটি এফ-৩৫ বিমান রয়েছে।
সম্প্রতি ঘাঁটিতে আসা ‘ওয়াইল্ডক্যাট’ হেলিকপ্টারগুলো স্বল্প পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত। এখানে রয়েছে আগাম সতর্কীকরণ রাডারযুক্ত ‘মার্লিন’ হেলিকপ্টার। ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির ডেস্ট্রয়ার এইচ এম এস ড্রাগন এখন সাইপ্রাসের উপকূলের কাছে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা দিচ্ছে।
জেনারেল টম বুইক বলেছেন, এই অঞ্চলে একটি অত্যন্ত আধুনিক যুদ্ধজাহাজ পেয়ে তিনি খুব খুশি। যেহেতু ইরান খোলাখুলিভাবে বলেছে যে আরএএফ আক্রোতিরিকে তারা লক্ষ্যবস্তু করেছে, তাই জেনারেল বুইক বলেছেন, ‘ইরানিদের গুরুত্ব সহকারে না নেওয়াটা বোকামি হবে।’
তারা স্বীকার করেন, ঘাঁটিটি ‘সহজেই আবার আক্রান্ত হতে পারে, কিন্তু তারা এও বলেন যে এটি এখন ‘যতটা সম্ভব সুরক্ষিত’।
ঘাঁটির পরিবেশ শান্ত। হামলার পর বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া অধিকাংশ সামরিক পরিবার এখন ফিরে এসেছেন। উন্নত গোয়েন্দা তথ্য ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কারণে বিমান হামলার সতর্কতা কমে গেছে। ব্রিটেনও সাইপ্রাসকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে। জেনারেল টম বেউইক বলেছেন, তিনি এখন সাইপ্রাসের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ঘাঁটিটির ওপর ব্রিটেনের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ‘কোনো বিতর্ক হবে না’।
এই যুদ্ধ কতদিন চলবে, কখন বা কীভাবে এর সমাপ্তি ঘটবে, তা কেউ জানেন না। আরএএফ আক্রোতিরিতে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে আরএএফ আক্রোতিরিতে অবস্থিত রয়্যাল নেভির কিছু হেলিকপ্টারের মূলত বিমানবাহী রণতরি এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলসের সঙ্গে উত্তর আটলান্টিক যাত্রায় যাওয়ার কথা ছিল।
রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ভয়েজার বিমানবাহী রণতরি সাইপ্রাসের প্রতিরক্ষায় মনোনিবেশ করার জন্য তার দশকব্যাপী ইসলামিক স্টেটবিরোধী অভিযান ‘অপারেশন শেডার’ স্থগিত করেছে। আক্রোতিরি ঘাঁটির স্টেশন কমান্ডার গ্রুপ ক্যাপ্টেন অ্যাডাম স্মোলাকও শিগগিরই এই যুদ্ধের সমাপ্তি আশা করেন না। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তাদের ‘বেশ দীর্ঘ সময়’ ধরে ঘাঁটিটি রক্ষা করে যেতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই অস্থিতিশীল অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ খুব কমই দ্রুত বা সহজে শেষ হয়।