যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতে অত্যাধুনিক নানা প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ করা গেছে, যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং উন্নতমানের আকাশভিত্তিক সামরিক প্ল্যাটফর্ম। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূচনা হয়, যার জবাবে ইরান ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ফলে পুরো অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এখন যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন, সাইবার আক্রমণ এবং তথ্যভিত্তিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ যুদ্ধক্ষেত্রে ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত লক্ষ্য নির্ধারণ করছে এবং তা বাস্তবায়ন করছে, যা যুদ্ধের গতি ও কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ইরানের ওপর হামলার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে ভয়াবহ আঘাত হানার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী যুদ্ধে তাদের ব্যবহৃত সবচেয়ে উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়েছিল বলে গত মার্চ মাসে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম ওই হামলাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
অ্যানথ্রোপিকের তৈরি এআই মডেল ‘Claude’ সামরিক পরিকল্পনা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং যুদ্ধের পরিস্থিতির সিমুলেশন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ‘কিল চেইন’ বা সিদ্ধান্ত থেকে হামলা পর্যন্ত সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, যা যুদ্ধ পরিচালনার গতি বাড়িয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে আরও বলা হয় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানে সাম্প্রতিক হামলায় অ্যানথ্রোপিকের মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ, টার্গেট চিহ্নিত করা এবং যুদ্ধের পরিস্থিতি আগে থেকে অনুশীলন (সিমুলেশন) করেছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য এআই সরঞ্জামের ব্যবহার ‘চিন্তার গতির’ চেয়েও দ্রুত বোমাবর্ষণের এক নতুন যুগের সূচনা করছে।
ড্রোন হামলার ব্যবস্থা
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ড্রোন যুদ্ধসক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। তারা ইরানের নিজস্ব ড্রোন কৌশলকেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অধীনে ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিত হামলায় প্রথমবারের মতো তারা তাদের নতুন স্বল্পমূল্যের একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, ‘লো-কস্ট আনম্যানড কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম (লুকাস)’ ব্যবহার করছে। ‘লুকাস’ মূলত দীর্ঘক্ষণ ধরে লক্ষ্যবস্তুর ওপর উড়তে পারে এবং পরবর্তীতে লক্ষ্যবস্তুর ওপর আছড়ে পড়ে বিস্ফোরিত হয়। ড্রোনের ডেল্টা-উইং নকশাটি ইরানি শাহেদের মতো হলেও এই ধরনের অস্ত্রের জন্য এই নকশাটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এ ছাড়াও এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ব্যবহার করছে। যা মূলত চালকবিহীন আকাশযান। এটি গোয়েন্দা নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ অভিযানের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট আঘাত হানার কাজেও ব্যবহৃত হয়। এবং ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। দেশটির দুটি বহুল ব্যবহৃত মানববিহীন আকাশযান হেরন টিপি এবং এলবিট সিস্টেমস হার্মিস-৯০০ বর্তমানে নজরদারি ও সামরিক পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আকাশশক্তি ও নৌশক্তি
ইরানের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিমান ও নৌ শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক স্টিলথ বোম্বার বি-২ স্টিলথ আবারও সামরিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক অভিযানে এই বোম্বার ব্যবহার করে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলা চালানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। মূলত গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো যেগুলো শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আড়ালে বা মাটির গভীরে লুকানো থাকে এমন জায়গায় হামলা চালাতে এই বিমান ব্যবহৃত হয়। এই উত্তেজনায় এফ-৩৫ লাইটনিং টু ও এফ-২২ র্যাপ্টরও ব্যবহার করা হচ্ছে। এফ-৩৫ লাইটনিং টু বহুমুখী আক্রমণ ও নজরদারিতে দক্ষ, আর এফ-২২ র্যাপ্টর আকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় শত্রু বিমান ধ্বংসে বিশেষভাবে কার্যকর। এ ছাড়াও চলমান অভিযানে এফ-১৫ দিয়ে আকাশে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা চলছে।
একই সঙ্গে এফ-১৬ ফাইটিং ফ্যালকন, এফ/এ-১৮ সুপার হর্নেট এবং এ-১০ অ্যাটাকার জেট সরাসরি হামলা ও স্থল সহায়তা মিশনে সক্রিয় রয়েছে।
এবং যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইএ-১৮জি গ্রাউলার শত্রুর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত করছে, আর এডব্লিউএসিএস আকাশ থেকেই পুরো যুদ্ধ পরিচালনায় সমন্বয় করার কাজ করছে। নৌবাহিনীও তাদের শক্তিমত্তা জানান দিচ্ছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ সমুদ্রে শক্তি প্রদর্শন করছে। এবং পি-৮ পোসাইডন সমুদ্র নজরদারি ও সাবমেরিন শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইলেকট্রনিক ও সাইবার যুদ্ধ
আধুনিক যুদ্ধে সরাসরি গোলাবর্ষণের পাশাপাশি ‘নন-কাইনেটিক’ বা অ-ধ্বংসাত্মক আক্রমণের গুরুত্ব দ্রুত বেড়ে গেছে। ইউএস স্পেস কমান্ড এবং ইউএস সাইবার কমান্ড যৌথভাবে ইরানের সফটওয়্যার সিস্টেম ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করে জ্যামিং (সংকেত বিঘ্ন) এবং হ্যাকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব আক্রমণের উদ্দেশ্য হলো শত্রুর যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল করে দেওয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। এই প্রেক্ষাপটে ইএ-১৮জি গ্রাউলার যুদ্ধবিমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি শত্রুপক্ষের রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা শনাক্ত করে সেগুলোকে দমন করতে সক্ষম। ফলে আকাশ ও স্থল অভিযানে যুক্ত বাহিনী তুলনামূলক নিরাপদে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে সাইবার গোয়েন্দা তৎপরতায় উন্নত স্পাইওয়্যারও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে পেগাসাসের মতো উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর নজরদারি করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার মাধ্যম তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই টুল ব্যবহার করে ফোন, মেসেজ, এমনকি এনক্রিপ্টেড যোগাযোগও গোপনে পর্যবেক্ষণ করছে। সূত্র: আল-জাজিরা, প্লাসক্লাউডস