চাঁদ অভিযান নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়ল আর্টেমিস-২। নাসার এই মিশন শনিবার (১১ এপ্রিল) ভোরে প্রশান্ত মহাসাগরে নিরাপদে অবতরণ করে।
এর মাধ্যমে চার মহাকাশচারী সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসায় মহাকাশ গবেষণায় যুক্ত হলো একাধিক নতুন মাইলফলক।
এর আগে আর্টেমিস-২ মিশনের হিট শিল্ড ক্ষয় নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এই মিশনের সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ফিরে আসার সময় আর্টেমিস-২ স্বল্প সময়ের জন্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, যা কিছুটা উৎকণ্ঠা তৈরি করে। তবে পরে মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের কণ্ঠ ভেসে এলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
তিনি জানান, “হিউস্টন। ইন্টিগ্রিটি। আমরা আপনাদের কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।”-যা মিশন কন্ট্রোলকে স্বস্তি দেয়।
এই ১০ দিনের ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন ও কানাডার একজন মহাকাশচারী। তারা হলেন- ক্রিস্টিনা কচ, ভিক্টর গ্লোভার, জেরেমি হ্যানসেন এবং রিড ওয়াইজম্যান।
মিশনটির অন্যতম লক্ষ্য ভবিষ্যতে চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিত করা, যার অংশ হিসেবে একটি ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এটি ছিল প্রথম চাঁদ প্রদক্ষিণ মিশন, যা মহাকাশ অভিযানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ঘণ্টায় ৪০ হাজার কিলোমিটার গতিতে ফিরে আসা ছিল অভিযানের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ।
৯ দিন ধরে নির্বিঘ্নে চলা এই অভিযানের ১০ম দিনে আসে সবচেয়ে বড় এবং বহুল প্রতীক্ষিত চ্যালেঞ্জ। এ সময় এর গতিবেগ পৌঁছে যায় ঘণ্টায় ৪০ হাজার কিলোমিটার এবং তাপমাত্রা ২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর সর্বোচ্চ গতিবেগ শব্দের গতির প্রায় ৩০ গুণ এবং তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় অর্ধেক।
যখন সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় ওরিয়ন ক্যাপসুলটি লাল-তপ্ত প্লাজমায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, তখন হিউস্টনের গ্রাউন্ড কন্ট্রোলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে। সেই ছয় মিনিটের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সময় সবাই নির্ভর করছিল জীবনরক্ষাকারী হিট শিল্ডের কার্যকারিতার ওপর।
পরে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন হওয়ার পর প্যারাশুট খোলা হয়।
চাঁদে ২০২২ সালের মনুষ্যবিহীন আর্টেমিস-১ পরীক্ষামূলক মিশনের সময়, একটি গুরুত্বপূর্ণ হিট শিল্ড অপ্রত্যাশিতভাবে ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল, যার ফলে শিল্ডের পোড়া বাইরের অংশটি চাঁদের পৃষ্ঠের মতো দেখাচ্ছিল। এই ঝুঁকি কমাতে ফিরে আসার জন্য আরও খাড়া এবং সংক্ষিপ্ত গতিপথ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
একটি বৈচিত্র্যময় দল
এই অভিযানে প্রথম নারী হিসেবে ক্রিস্টিনা কচ, প্রথম অশ্বেতাঙ্গ ভিক্টর গ্লোভার এবং জেরেমি হ্যানসেন ছিলেন প্রথম নন-আমেরিকান, যারা চন্দ্রাভিযানে অংশ নেন।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে নাসার অ্যাপোলো মিশনগুলোতে ক্রু সদস্যরা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান পুরুষদের নিয়ে গঠিত। আর এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার কঠোর ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ফেডারেল সংস্থাগুলোতে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা ভেঙে দিচ্ছেন।
অ্যাপোলো ১৩ এর থেকে ৪ হাজার মাইল এগিয়ে
আর্টেমিস-২ মিশনের ক্রুরা পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে ভ্রমণের রেকর্ড গড়েছেন, যা ১৯৭০ সালের অ্যাপোলো ১৩ মিশনের তুলনায় প্রায় ৬ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বেশি। তারা চাঁদের চারপাশে ফ্লাইবাই করার সময় পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৭১ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছান।
অভিযানটির সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি ছিল যখন অশ্রুসজল নভোচারীরা তাদের চন্দ্রযান এবং ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারলের নামে দুটি গর্তের নামকরণের অনুমতি চেয়েছিলেন।
মহাকাশচারীরা কী খেয়েছিলেন?
তাদের অভিযান চলাকালীন ১৮৯টি আইটেমের একটি মেনু উপলব্ধ ছিল, যার মধ্যে কফি এবং স্মুদির মতো ১০ ধরনের পানীয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাধারণ খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ছিল টরটিয়া, বাদাম, বারবিকিউ করা গরুর বুকের মাংস, ফুলকপি, ম্যাকরনি ও চিজ, বাটারনাট স্কোয়াশ, কুকিজ এবং চকোলেট।
ব্যক্তিগত পছন্দকে মাথায় রেখে ক্যালোরির চাহিদা, জলীয়ভাব ও পুষ্টি গ্রহণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য মহাকাশের খাদ্য বিশেষজ্ঞ এবং ক্রুদের সঙ্গে আলোচনা করে খাবারের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল।
আগামীর পথ
নবায়ন করা আর্টেমিস কর্মসূচির অধীনে, আগামী বছরের আর্টেমিস-৩ মিশনে মহাকাশচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে একটি বা দুটি লুনার ল্যান্ডারের সঙ্গে তাদের ক্যাপসুল ডকিং করার অনুশীলন করবেন। আর্টেমিস-৪ মিশনে ২০২৮ সালে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি দুইজন মহাকাশচারীকে অবতরণের চেষ্টা করা হবে। সূত্র: এনডিটিভি
অমিয়/