আগে আসকার শরণার্থী শিবিরের পরিবার ও তরুণরা তেল আসকার পাহাড়ের ঢালে জলপাই গাছের নিচে জড়ো হতো। দখলকৃত পশ্চিম তীরের উত্তরের এই পাহাড়ি এলাকাতেই শিবিরটি অবস্থিত। সেখানের বাসিন্দা ইসলাম মাদানি (৩২) বলেন, ‘এখন বেশির ভাগ মানুষ আর সেখানে যায় না। কারণ সৈন্যরা সেখানে অনেককে গুলি করে।’
আসকার সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক আমজাদ রেফায়ি বলেন, ইসরায়েলি সেনাদের হাতে নিহতদের স্মৃতি শিবিরের অন্যতম একমাত্র সবুজ জায়গাটিকে তাড়িয়ে বেড়ায়, যেখানে শিশুরা খেলতে পারে। তিনি জানান, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর এবং গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সেখানে তিনজন কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরও অনেককে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে।
রেফায়ি বলেন, এখন আর সৈন্যরা রাবার বুলেট ব্যবহার করে না বা কোমরের নিচে লক্ষ্য করে না, ‘তারা সরাসরি হত্যা করতে বা পঙ্গু করতে গুলি করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাদের কাছে আমরা পশুর মতো। তারা আমাদের আতঙ্কিত করে, ঠান্ডা মাথায় আমাদের তরুণদের হত্যা করে এবং আমাদের এখানে এক ধরনের কারাগারে আটকে রাখে।’
শিবিরের বাসিন্দারা জানান, তেল আসকার এখন ইসরায়েলি সেনাদের প্রবেশের একটি প্রধান পথ হয়ে উঠেছে। তারা পূর্ব নাবলুসের ওপর অবস্থিত অবৈধ বসতি এলন মোরেহ হয়ে শিবিরের সরু ও জরাজীর্ণ রাস্তায় ঢুকে পড়ে। এই পাহাড়েই গত জানুয়ারিতে ১৮ বছর বয়সী আমির ওসমানকে গুলি করা হয়, যার ফলে তিনি পঙ্গু হয়ে যান। ঠিক প্রায় একই জায়গায় এক বছর আগে তার শৈশবের বন্ধু মোহাম্মদ আবু হানিনকে হত্যা করা হয়েছিল। তার বয়সও ছিল ১৮।
গত জানুয়ারিতে ইসরায়েলি সেনারা তেল আসকার দিয়ে জিপের বহর নিয়ে যাওয়ার সময় আমিরের পায়ে গুলি করে। সে সময় পর্যন্ত আমির একজন সম্ভাবনাময় ফুটবলার ও নৃত্যশিল্পী ছিলেন। তিনি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী নৃত্য দাবকে পরিবেশন করতে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন।
আমির এখন একজন নার্স হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। তিনি বলেন, ‘আমার হাঁটুর ক্যাপ আর ঊরুর হাড় চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আমি আমার পা আর অনুভব করতে পারছিলাম না, তাই মনে হচ্ছিল আমি পা হারিয়ে ফেলেছি। রক্তটা যেন ফুটন্ত পানির মতো আমার পা থেকে বের হচ্ছিল।’
আমির রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও সৈন্যরা অ্যাম্বুলেন্সকে তার কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। স্বাস্থ্যকর্মী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে অভিযান বাড়ানোর পর এমন ঘটনা শত শতবার ঘটেছে। অবশেষে আমির চারটি অস্ত্রোপচার করান, যাতে তিনি আবার হাঁটতে পারেন। চার মাস তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন।
চিকিৎসকরা জানান, তার চলাফেরা আর কখনো স্বাভাবিক হবে না। তিনি বলেন, ‘প্রথম অস্ত্রোপচারের পর জেগে উঠে আমি আমার চাচাকে বলেছিলাম আমাকে গুলি করতে, কারণ তখন মনে হয়েছিল সেটাই ভালো। কিন্তু এখন আমি পরিস্থিতি মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি।’
আমির জানান, তিনি এখনো স্বপ্ন দেখেন আবার ভ্রমণ করবেন, নাচবেন, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়াবেন। কিন্তু এখন আর সেসব সম্ভব নয়। ফিলিস্তিনি পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অভিযান জোরদার হওয়ার পর থেকে আসকারে অন্তত ১৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। অবিরাম অভিযানে আরও অনেকেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল প্যালেস্টাইনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে অন্তত ১৫৭ শিশু ইসরায়েলি সেনা বা বসতিস্থাপনকারীদের হাতে নিহত হয়েছে।
ইসরায়েল শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে তারা বলে, নিরাপত্তার কারণে এবং ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের দমন করতে এসব অভিযান চালানো হয়। দখলকৃত পশ্চিম তীরের ১৯টি শরণার্থী শিবিরের মধ্যে আসকার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণগুলোর একটি। প্রায় ১৭টি ফুটবল মাঠের সমান জায়গায় এখানে ২৪ হাজার মানুষ বাস করেন।
জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর মতে, এখানে বেকারত্ব বেশি এবং অনেক বাসিন্দা দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। পাশাপাশি ‘সংকীর্ণ ও অস্বস্তিকর জীবনযাপন’ সহ্য করতে হয়।
১৯৪৮ সালের নাকবা, যখন ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, সেই সময় ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ হওয়া শত শত হাজার মানুষের জন্য অস্থায়ী আশ্রয় হিসেবে শরণার্থী শিবিরগুলো প্রথমে গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আশা ক্ষীণ হয়ে আসায়, এসব শিবির ঘনবসতিপূর্ণ ও স্থায়ী বসতিতে পরিণত হয়েছে।
আমির বর্তমানে শিবিরের নতুন জরুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বসেছিলেন তার বন্ধু ১৭ বছর বয়সী ইয়ামেন হাবরোন এবং ৩২ বছর বয়সী ইসলাম মাদানির সঙ্গে। গত তিন বছরে তারাও ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে গেছেন। সূত্র: আল-জাজিরা