চীনের বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়ানআনমেন স্কয়ারের নিরাপত্তা কয়েক দিন ধরেই জোরদার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ কুচকাওয়াজ বা বড় ধরনের কোনো পরিকল্পিত অনুষ্ঠানের গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে। সবকিছু শুরু হয়েছিল ফিসফাস দিয়ে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঘিরে বড় আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে চীন। এই সফরে বৈঠক, নৈশভোজ এবং টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি সম্রাটদের প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত ঐতিহাসিক মন্দির কমপ্লেক্স, যেখানে ভালো ফসলের আশায় প্রার্থনা করা হতো।
ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুজনই আশা করছেন, এই সফর ফলপ্রসূ হবে। বিশ্বের দুই পরাশক্তি নেতার এই বৈঠককে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাক্ষাৎগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক অগ্রাধিকার পায়নি। তাদের মূল মনোযোগ ছিল ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ, পশ্চিম গোলার্ধে সামরিক অভিযান এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে। তবে এই সপ্তাহে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ, তাইওয়ানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা, সবই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ইরান সংঘাত শি জিনপিংয়ের জন্য নেতিবাচক হলেও আদর্শিক ও রাজনৈতিকভাবে তা তার জন্য সুযোগ তৈরি করেছে। ফলে তিনি আলোচনায় নিজেকে শক্ত অবস্থানে মনে করছেন। এই সফর ভবিষ্যতের সহযোগিতা কিংবা সংঘাত–দুই সম্ভাবনারই ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
ইরান যুদ্ধের মধ্যস্থতাকারী?
ইরান যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়ানোর পর চীন নীরবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসার চেষ্টা করছে। বেইজিং পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ঘিরে চলা সংঘাতে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছে।
মার্চ মাসে বেইজিং ও ইসলামাবাদ যৌথভাবে পাঁচ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। একই সঙ্গে চীনা কর্মকর্তারা নেপথ্যে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন।
চীন প্রকাশ্যে শক্ত অবস্থান দেখালেও যুদ্ধ দ্রুত শেষ হোক এমন আগ্রহ তাদের রয়েছে। চীনের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই ধীরগতির প্রবৃদ্ধি ও বাড়তি বেকারত্বের চাপে রয়েছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। বস্ত্র থেকে প্লাস্টিক, বিভিন্ন শিল্পে খরচ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
যদিও চীনের বড় তেল মজুত রয়েছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক গাড়িতে তাদের অগ্রগতি জ্বালানি সংকটের প্রভাব কিছুটা কমিয়েছে, তবু যুদ্ধ রপ্তানিনির্ভর চীনা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করতে হলে চীনও বিনিময়ে কিছু চাইবে।
গত সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বেইজিং সফরকে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব প্রদর্শনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমি আশা করি চীন তাকে সঠিক বার্তা দেবে, হরমুজ প্রণালিতে যা করছে, তার কারণে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।’
হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নতুন প্রস্তাব আনার ক্ষেত্রেও চীনকে বাধা না দিতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে চীন ও রাশিয়া একটি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা আলি ওয়াইন বলেন, ‘ইরানকে দীর্ঘমেয়াদে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে হলে চীনের কোনো না কোনো ভূমিকা থাকবে, এটা যুক্তরাষ্ট্রও বুঝতে পারছে।’ ট্রাম্প অবশ্য ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে খুব একটা উদ্বেগ দেখাননি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানি তেল পরিবহনের অভিযোগে চীনভিত্তিক একটি রিফাইনারির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও ট্রাম্প বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটাই বাস্তবতা। আমরা যেমন তাদের বিরুদ্ধে কিছু করি, তারাও করে।’
তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ
তাইওয়ান প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানকে অনেকেই দ্বিধান্বিত বলে মনে করছেন। গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি ঘোষণা করে, যা চীনকে ক্ষুব্ধ করে। তবে ট্রাম্প পরে তাইওয়ানকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে অনেকটা নরম অবস্থান নেন।
শি জিনপিং সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি তাইওয়ানকে চীনের অংশ মনে করেন, আর সেটা তার ব্যাপার।’ ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তার যথেষ্ট মূল্য দেয় না তাইওয়ান। গত বছর তিনি তাইওয়ানের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন এবং অভিযোগ করেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ‘ছিনিয়ে নিয়েছে’।
গত সপ্তাহে রুবিও জানান, ট্রাম্পের সফরে তাইওয়ান অবশ্যই আলোচনার বিষয় হবে। তবে উদ্দেশ্য হবে, যাতে এটি দুই পরাশক্তির মধ্যে নতুন উত্তেজনার কারণ না হয়। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়্যাং ই সম্প্রতি রুবিওর সঙ্গে ফোনালাপে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ নেবে বলে তিনি আশা করছেন।
এদিকে চীন প্রায় প্রতিদিনই তাইওয়ানের চারপাশে যুদ্ধবিমান ও নৌযান পাঠিয়ে সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, ১৯৮২ সালে নির্ধারিত তাইওয়ান নীতির ভাষা পরিবর্তনের চেষ্টা করতে পারে বেইজিং। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো, তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। তবে চীন হয়তো আরও কঠোর ভাষা চাইতে পারে, যেমন ‘যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে’।
এশিয়া সোসাইটির জন ডেলুরি বলেন, ‘শি জিনপিং খুব দ্রুত এমন বিষয়ে ভরসা করবেন বলে মনে হয় না। ট্রাম্প হঠাৎ কিছু বলে ফেললেও পরে আবার তা বদলে দিতে পারেন।’
বাণিজ্য আলোচনা
২০২৫ সালের বেশির ভাগ সময়জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নতুন বাণিজ্যযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ছিল। ট্রাম্প বারবার চীনাপণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছেন ও কমিয়েছেন, যা কখনো কখনো ১০০ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। এর জবাবে চীন যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিত করে এবং মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি কমিয়ে দেয়। এতে ট্রাম্পের সমর্থনভিত্তিক অঙ্গরাজ্যগুলোর কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও শির বৈঠকের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের একতরফা শুল্ক আরোপ ক্ষমতা সীমিত করায় উত্তেজনা আরও কমে। তবু বেইজিং বৈঠকে দুই নেতার আলোচনার বিষয়ের অভাব হবে না। ট্রাম্প চাইবেন চীন আরও বেশি মার্কিন কৃষিপণ্য কিনুক। অন্যদিকে চীন চাপ দেবে, যেন যুক্তরাষ্ট্র চীনের ‘অন্যায্য ব্যবসায়িক আচরণ’ নিয়ে সাম্প্রতিক তদন্ত প্রত্যাহার করে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের মাইকেল ও’হ্যানলন বলেন, ‘চীনের বিস্তৃত ও বাজারবিকৃতকারী বাণিজ্যনীতির তদন্ত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসা কঠিন হবে।’ রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন এনভিডিয়া, অ্যাপল, এক্সন ও বোয়িংসহ বড় বড় কোম্পানির প্রধান নির্বাহীদেরও সফরে সঙ্গে নিতে চায়।
প্রথম মেয়াদের তুলনায় এখন চীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কম নির্ভরশীল হলেও বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য শি জিনপিং এই বৈঠক সফল করতে চাইবেন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের রায়ান হাস বলেন, ‘সফর যদি ভালোভাবে শেষ হয় এবং ট্রাম্প সম্মানিত বোধ করেন, তা হলে দুই দেশের অস্বস্তিকর স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে। কিন্তু তিনি যদি অসম্মানিত মনে করেন, তা হলে তার মনোভাব দ্রুত বদলে যেতে পারে।’
এআই ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ
চীন এখন ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে যেতে চায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও মানবসদৃশ রোবটে তারা ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। শি জিনপিং এগুলোকে ‘নতুন উৎপাদনশীল শক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন।
তবে অনেক মার্কিন নীতিনির্ধারকের অভিযোগ, চীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি দখল বা চুরি করে নিজেদের শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছে। এ কারণে অত্যাধুনিক মাইক্রোপ্রসেসর রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। টিকটকের মালিকানা ও পরিচালনা নিয়ে জটিল বিরোধের সমাধান যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রযুক্তি সম্পর্কের বিরল ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই ধরনের প্রতিযোগিতা এখন এআই প্রযুক্তিতেও চলছে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে, ডিপসিকের মতো চীনা কোম্পানিগুলো মার্কিন এআই প্রযুক্তি চুরি করছে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের ইংই মা বলেন, ‘এআইকে ঘিরে এক নতুন শীতল যুদ্ধের সূচনা হচ্ছে। তবে মূল লড়াই কার মডেল কে নকল করছে তা নয়, বরং ভবিষ্যতের এআই তৈরি করতে সক্ষম মেধাবীদের দখল নিয়ে।’
চীনের তৈরি রোবট ইতোমধ্যে কুংফু নাচ করতে পারে, এমনকি ম্যারাথনে মানুষের চেয়েও দ্রুত দৌড়াতে পারে। তবে রোবটের দেহ তৈরিতে দক্ষ হলেও অনেক চীনা কোম্পানি এখনো তাদের ‘মস্তিষ্ক’ বা সফটওয়্যার উন্নয়নের চ্যালেঞ্জে আছে। এর জন্য দরকার উন্নত কম্পিউটার চিপ, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকেই আসে।
এখানেই বিরল খনিজ নিয়ে চীনের শক্ত অবস্থান কাজে লাগতে পারে। স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান– সব আধুনিক প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে চীন। ফলে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীন দিতে পারে বিরল খনিজ, আর যুক্তরাষ্ট্র দিতে পারে উন্নত চিপ প্রযুক্তি। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এটি যেন চীনের নিজস্ব ‘হরমুজ প্রণালি’; চাইলে যেকোনো সময় তারা সরবরাহ বন্ধ করতে পারে।
গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার নির্ধারিত এই সফরে আলোচনার জন্য সময় খুব বেশি থাকবে না। তবে অল্প সময়ের এই বৈঠকই আগামী কয়েক বছরের জন্য দুই পরাশক্তির সম্পর্ক ও আলোচনার দিক নির্ধারণ করে দিতে পারে। সূত্র: বিবিসি