যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে গতকাল শনিবার হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। একদিকে ছিল কট্টর ডানপন্থি কর্মী টমি রবিনসনের আয়োজিত মিছিল, অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থি ও বর্ণবাদবিরোধী পাল্টা সমাবেশ। শহরজুড়ে ছিল ব্যাপক পুলিশি উপস্থিতি।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ আগেই জানিয়েছিল, সাম্প্রতিক বছরের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা অভিযানের একটি পরিচালনা করা হবে। একই দিনে রাজধানীতে এফএ কাপ ফাইনালও অনুষ্ঠিত হওয়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ৪ হাজার কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে ছিল ঘোড়া, কুকুর, ড্রোন ও হেলিকপ্টার। এসব বাহিনী রবিনসনের ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ মিছিল এবং নাকবা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত পাল্টা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
নাকবা দিবস ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার স্মরণে পালন করা হয়। এ বছরের কর্মসূচিতে ‘স্ট্যান্ডআপ টু রেসিজম’ নামের সংগঠনের আয়োজিত ফ্যাসিবাদবিরোধী মিছিলও যুক্ত হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের ধারণা, পশ্চিম লন্ডন থেকে শুরু হওয়া পাল্টা সমাবেশে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অংশ নেবেন। অন্যদিকে রাজধানীর কেন্দ্রস্থল হলবর্ন থেকে শুরু হওয়া ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ মিছিলে অংশ নেবেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
রবিনসনের সমাবেশে অংশ নিতে আসা ৪৪ বছর বয়সী নাতাশা ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ্যাকের রঙের টুপি ও পতাকা পরে উপস্থিত ছিলেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘নিজের সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে।’ তিনি এই সমাবেশকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এতে বর্ণবাদী কিছু নেই।’
এসেক্স থেকে আসা ৫৬ বছর বয়সী জাস্টিনও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, অংশগ্রহণকারীরা ‘অনেক বিষয়’ নিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই অভিবাসন একটি বড় ইস্যু।’ অন্যদিকে লন্ডনের আরেক প্রান্তে নটিংহ্যাম থেকে আসা ৬২ বছর বয়সী সাইমন রলস ফিলিস্তিনপন্থি ও বর্ণবাদবিরোধী কর্মসূচিতে যোগ দেন।
তিনি বলেন, ‘ডানপন্থিরা এখন আরও সাহসী হয়ে উঠছেন। আমরা এখানে এসেছি এর মোকাবিলা করতে, যেন মানুষ অজ্ঞ না থাকেন।’
টমি রবিনসনের আসল নাম স্টিফেন ইয়াক্সলি-লেনন। তিনি একসময় ফুটবল হুলিগান ছিলেন, পরে ইসলামবিরোধী কর্মী হিসেবে পরিচিতি পান। বিশেষ করে অনলাইনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
গত সেপ্টেম্বরেও তিনি ‘জাতীয় ঐক্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধ’ স্লোগানে একই ধরনের সমাবেশ করেছিলেন। তখন প্রায় দেড় লাখ মানুষ কেন্দ্রীয় লন্ডনে জড়ো হয়েছিলেন, যা কোনো কট্টর ডানপন্থি নেতার ডাকে নজিরবিহীন উপস্থিতি হিসেবে দেখা হয়।
ছোট নৌকায় করে প্রতিবছর হাজারও অভিবাসীর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া, যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে অসন্তোষকে তিনি রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মালিক ইলন মাস্ক গত বছরের সেই সমাবেশে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছিলেন। বিক্ষোভকারীদের কিছু অংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে বহু কর্মকর্তা আহত হওয়ার ঘটনাও তখন আলোচনায় আসে।
এবারের দুই সমাবেশকে আলাদা রাখতে পুলিশ তাদের রুট ও সময়সূচিতে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করেছে। মেট পুলিশ জানিয়েছে, পুরো অভিযানে প্রায় ৪৫ লাখ পাউন্ড বা ৬০ লাখ ডলার ব্যয় হতে পারে। পাশাপাশি তারা ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এবার প্রথমবারের মতো আয়োজকদের আইনি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যেন আমন্ত্রিত বক্তারা ঘৃণামূলক বক্তব্যবিরোধী আইন ভঙ্গ না করেন। গতকাল শনিবার সকালে রবিনসনের সমাবেশে যোগ দিতে আসা দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে এক ব্যক্তিকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনায় গুরুতর হামলার সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি পুলিশ।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত শুক্রবার সতর্ক করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে, কাউকে ভয় দেখাতে বা হুমকি দিতে চাইবে, তাকে আইনের পূর্ণ শক্তির মুখোমুখি হতে হবে।’ তিনি রবিনসনের সমাবেশের আয়োজকদের বিরুদ্ধে ‘ঘৃণা ও বিভাজন ছড়ানোর’ অভিযোগও তোলেন। সূত্র: এএফপি