যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে এবং চলমান সংকট নিরসনে নতুন করে মাঠে নেমেছে কাতার। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমন্বয় করে গতকাল শুক্রবার কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের মধ্যস্থতাকারী দল ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গাজা যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকটে কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলায় কাতারের রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্রসহ এলএনজি অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কাতার এতদিন এই যুদ্ধ নিয়ে মধ্যস্থতা থেকে দূরে ছিল। ইরানি হামলায় কাতারের প্রায় ১৭ শতাংশ এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায় এবং গত ২ মার্চ থেকে দেশটি এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র এবং তেহরানের বিশ্বস্ত ব্যাক-চ্যানেল হিসেবে কাতার আবার এই আলোচনায় যুক্ত হলো।
মূল মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান সেনাপ্রধানের তেহরান সফর
কাতার আলোচনায় যোগ দিলেও মার্কিন প্রশাসন পরিষ্কার করেছে, এই সংকটে পাকিস্তানই তাদের প্রধান মধ্যস্থতাকারী। সুইডেনে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘আমরা সব দেশের সঙ্গেই কথা বলছি। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় আমরা মূলত পাকিস্তানের সঙ্গেই কাজ করছি এবং সেটিই বহাল থাকছে। পাকিস্তান চমৎকার কাজ করেছে।’
এই কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল এবং সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনির গতকাল তেহরানের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্র এএফপি-কে জানায়, তিনি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক ও পরামর্শ করবেন। এর আগে গত বুধবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসীন নকভি তেহরান সফর করেন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গতকালও মহসীন নকভি ও আব্বাস আরাগচির মধ্যে তেহরানে আরেক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উল্লেখ্য, গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানেই একমাত্র সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে, যেখানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অংশ নিয়েছিলেন। তবে ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত দাবির’ কারণে সেই আলোচনা সফল হয়নি।
অগ্রগতি হলেও কাটেনি প্রধান দুই জট
গত ৮ এপ্রিল থেকে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকায় বড় কোনো সামরিক সংঘাত হয়নি। তবে গতকাল যুদ্ধের ১২তম সপ্তাহ এবং যুদ্ধবিরতির ষষ্ঠ সপ্তাহ শেষ হতে চললেও কোনো বড় ধরনের চুক্তি সম্পন্ন করা যায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আমি বিষয়টিকে বাড়িয়েও বলব না, আবার ছোট করেও দেখব না। তবে এখনো অনেক কাজ বাকি। আমরা এখনো চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারিনি।’
আলোচনার প্রধান দুটি বাধা হলো– ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্ববাজারে চলাচলকারী মোট তেল ও এলএনজির এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। যুদ্ধের শুরুতে ইরান এটি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে ইরান সেখানে একটি ‘টোল বা ফি ব্যবস্থা’ চালুর পরিকল্পনা করছে, যার মাধ্যমে তারা শুধু তাদের শর্ত মানা বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৩৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ আইআরজিসির (রেভল্যুশনারি গার্ডস) অনুমতি নিয়ে এই প্রণালি পার হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ চলত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইরানের এই টোল আদায়ের পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা খুব কঠিন একদল মানুষের সঙ্গে আলোচনা করছি। ইরান যদি তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে অন্য বিকল্প (প্ল্যান বি) প্রস্তুত রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, হরমুজ প্রণালি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো ন্যাটোর সামরিক সহায়তা চায়নি।
ট্রাম্পের চাপ এবং ইরানের অবস্থান
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত উদ্ধার করবে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা, ইরান এই ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারে। তবে তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। দুটি ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিই স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, এই ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা