ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৃদ্ধ দম্পতিকে হত্যার ঘটনায় রহস্য উদ্ঘাটনে অন্ধকারে রয়েছেন মামলার তদন্তকারীরা। এটি যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, এ ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুর্বৃত্তরা বাড়ির আলমারি কেন ভাঙল, তা বুঝে উঠতে পারছেন না মামলার তদন্তকারীরা। কারণ সেই আলমারি থেকে কিছুই নেওয়া হয়নি।
তদন্তকারীদের ধারণা, দুর্বৃত্তরা হয়তো কিছু একটা খুঁজছিল। না পেয়ে তারা চলে গেছে।
তদন্তকারীরা পারিবারিক বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এনেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বিরোধের তথ্য তারা পাননি।
ঘটনার পর নিহত শফিকুরের লাশের প্রথম প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ।
ওই প্রত্যক্ষদর্শী পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি যখন ভিকটিমের লাশটি দেখতে পান, তখন আশপাশের কাউকে দেখতে পাননি। এতে তিনি চিৎকার শুরু করেন।
পরে ফজরের নামাজ পড়তে আসা আরও এক মুসল্লি সেখানে এলে ওপরের ভাড়াটিয়াদের ডাকতে থাকেন। ভাড়াটিয়ারা নিচে নেমে আসেন। এ সময় বাসার গেট থেকে গ্যারেজের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা, খুনিরা তাকে এক পাশে হত্যা করে টেনে অন্য পাশে নিয়ে গেছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাত দেখে মনে হয়েছে যে তারা পেশাদার কিলার। দুর্বৃত্তরা ভিকটিমদের গলায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে পালিয়ে গেছে। কিলারদের খুনের সময় নির্ধারণ ও যে পাশ দিয়ে তারা প্রবেশ করেছে, সেই ধরন দেখে মনে হয়েছে, তারা পেশাদার অভিজ্ঞ কিলার। এর আগেও তারা বিভিন্ন স্থানে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। এই ভয়ংকর পেশাদার কিলার চক্রকে ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
যাত্রাবাড়ী থানাধীন মাতুয়াইলের কোনাপাড়ার কফিলউদ্দিন ভূঁইয়া রোডের ২ নম্বর লেনের ১৭৫ নম্বর চারতলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে থাকতেন শফিকুর। তিনি জনতা ব্যাংকের গাড়িচালক ছিলেন। দোতলায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। বাড়ির ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া ছিল। ২০ জুন বৃহস্পতিবার ভোর পৌনে ৫টার দিকে শফিকুর ফজরের নামাজ পড়তে বের হন। এরপর স্থানীয় লোকজন বাড়ির নিচতলার গ্যারেজে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে চিৎকার করতে থাকেন। পরে বাসার ভাড়াটিয়ারা তার স্ত্রীকে এ কথা জানাতে গেলে ঘরের বেডের ওপর তারও রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এই দম্পতির লাশ উদ্ধার করে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, সম্পত্তি বা পূর্বশত্রুতার জেরে তাদের হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, দম্পতি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০ জুন রাতে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে। নিহত দম্পতির ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে এ মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় থানা-পুলিশের পাশাপাাশি র্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ছায়া তদন্ত করছে। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশের ডেমরা জোনের সহকারী কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা খুনিদের শনাক্ত করার জন্য কাজ করছি।’
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই খুনটি এখন পর্যন্ত ক্লুলেস। নিহতের পরিবারের লোকজন ঘটনার সময় কে কোথায় ছিলেন, তা জানার জন্য তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তারা তাদের অবস্থান সম্বন্ধে যার যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ভিকটিম দুজনের ছেলে ও পুত্রবধূ হতাশা ব্যক্ত করেছেন, তাদের সঙ্গে এমন কারও কোনো ঝামেলা নেই যে তাদের বাবাকে এমনভাবে হত্যা করা হবে। তারা কাউকে সন্দেহ করতে পারছেন না। তদন্তকারীরা ভিকটিমের পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্য পেয়েছেন, তা খতিয়ে দেখছেন।
সূত্র জানায়, ভিকটিমের বাসার সামনে কোনো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি ক্যামেরা) নেই। ওই বাড়ির সামনের বাড়িটি টিনশেডের। দূরের একটি বাসায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পাওয়া গেলেও সেটিতে আবছা-আবছা ছবি পাওয়া গেছে। সেখানে দুজনকে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। ছবি এতটাই আবছা যে কাউকে চিহ্নিত করা দুরূহ ব্যাপার। টি-শার্ট ও জিন্স পরা দুই যুবককে হেঁটে যেতে দেখা গেছে। ফজরের নামাজের পর একসঙ্গে তাদের হেঁটে যাওয়ার বিষয়টি সন্দেহ মনে করেছেন তদন্তকারীরা। ম্যানুয়ালি, প্রযুক্তি ও প্রথাগত সোর্স দিয়ে ওই দুজনকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। সূত্র জানায়, এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু তাদের কারও কাছে এ খুনের বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।