প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংলাপে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার তাগিদ দিয়েছে গণফোরাম, এলডিপিসহ ৮টি রাজনৈতিক দল ও জোট।
সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতার কথা জানিয়ে দলগুলোর নেতারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি বিতর্কিত ও অনভিজ্ঞ উপদেষ্টাদের অপসারণ করার দাবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদের আকার বাড়ানো, যোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি জানান তারা।
শনিবার (১৯ অক্টোবর) বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা এ দাবি জানান।
বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে সব দাবি একত্র করলে দলগুলোর দাবির সংখ্যা শতাধিক হবে।
সংলাপে দলগুলোর পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে স্থায়ীকরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সংবিধান ও বিচার বিভাগ সংস্কারের লিখিত প্রস্তাব, অর্থ পাচারকারীদের গ্রেপ্তার ও বিদেশ থেকে টাকা ফেরত আনার বিষয়ে জোর তাগিদ দেওয়া হয়। বলা হয়, প্রশাসন থেকে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সরাতে হবে। আগস্ট বিপ্লব ও ফ্যাসিবাদবিরোধী ১৭ বছরের আন্দোলনে নিহত, আহত ও নিখোঁজের তালিকা প্রকাশ করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পরিবারের কমপক্ষে একজনকে চাকরি প্রদান এবং রাষ্ট্র সংস্কারকাজের পরিকল্পনা প্রকাশ করার দাবিও তোলেন তারা। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টির নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি তোলেন কেউ কেউ। আর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) বিগত ৩ সংসদ নির্বাচন অবৈধ ঘোষণাসহ একগুচ্ছ দাবির কথা জানায়।
প্রধান উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চতুর্থ দফায় এ সংলাপে বসেন।
বেলা ৩টায় গণফোরামের ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামালের সঙ্গে শুরু হয় দিনের সংলাপ। রাতে বাংলাদেশ লেবার পার্টির আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় সংলাপ। পর্যায়ক্রমে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, ১২-দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ও লেবার পার্টির সঙ্গে পৃথকভাবে সংলাপ করেন প্রধান উপদেষ্টা। পরে নিজ নিজ দলের পক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন দলগুলোর শীর্ষ নেতারা।
আলোচনা শেষে এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমেদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজনে ২৩টি প্রস্তাব দিয়েছি। আগামীতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন, সুন্দর প্রশাসন চালানোর জন্য, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য, দ্রব্যমূল্যের জন্য মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, তাদের সহযোগিতা করার জন্য আমাদের প্রস্তাবগুলো দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সেদিন আমরা তাদের নিষিদ্ধ করেছিলাম। আজকে কী কারণে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে না? আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ, আওয়ামী লীগ ১৮ কোটি মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। তারা অন্যায়ভাবে পুলিশকে ব্যবহার করেছে, প্রশাসনকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে। দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে, দেশ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়েছে।’
সংলাপ শেষে গণফোরাম সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মোস্তফা মোহসীন মন্টু সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জোর দিয়েছি। সিন্ডিকেটকে অবশ্যই ভাঙতে হবে। আমরা সরকারকে পরামর্শ দিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করব। জনগণের জন্য দরজা খোলা আছে বলে প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন।’
গণফোরাম অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন চায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো তারিখ উল্লেখ করিনি। বলেছি সংস্কার শেষে অতিদ্রুত নির্বাচন দেওয়ার জন্য। নিজেদের রক্ষার স্বার্থে আগামীতে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে। তবে নির্বাচনের আগে থাকি রাম, নির্বাচনের পরে হই রাবণ। ওই ধরনের নির্বাচন কমিশন চাই না। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন চাই। সংবিধান সংশোধনের জন্য দুই-এক দিনের জন্য লিখিত প্রস্তাব দেব।’
১২-দলীয় জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের (আওয়ামী লীগ) যেসব দোসর এখনো প্রশাসনে ঘাপটি মেরে বসে আছে তাদের আমরা অপসারণ করতে বলেছি। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে ট্রাকের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছি। সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে হলেও অবিলম্বে এই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য যা করা প্রয়োজন তিনি সেই পদক্ষেপ নেবেন।’
গণহত্যাকারীদের রাজনীতি ও নির্বাচন থেকে দূরে রাখার দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটা শুরু হওয়া উচিত। নির্বাচন কমিশন সংস্কারের জন্য একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের প্রস্তাব ও আওয়ামী লীগের আমলে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবৈধ ঘোষণা করা যায় কি না, সে ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছি।’ তিনি বলেন, আপনারা নির্বাচনমুখী সংস্কার করবেন, এমন কোনো সংস্কার হাতে নেবেন না, যেটা গণতান্ত্রিক সরকারের নেওয়া উচিত। প্রস্তাব থাকতেই পারে, সেগুলো হয়তো পরবর্তী সরকার করবে।
জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম বলেন, ‘বিদ্যমান সংবিধান একটি অবৈধ সংবিধান। আমরা সুস্পষ্টভাবে সরকারকে বলেছি ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ভারত থেকে নিয়ে এসে ফ্যাসিবাদের দোসরদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। তারা কীভাবে পালিয়ে গেল? ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যারা শহিদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে হবে এবং আবাসন চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।’
লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, ‘সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে স্থায়ী ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আইন প্রবর্তন ও সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা, শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন, সরকারি কর্মকর্তাদের অবসরের ৫ বছরের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণ বেআইনি ঘোষণা, জাতীয় পরিচয়পত্র আইন-২৩ বাতিল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনে রাখা এবং প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছি।’
সংলাপ শেষে এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘২০২৫ সালের জুন বা জুনের পরেই নির্বাচন দেওয়া সম্ভব। ওনাদের চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন সবার সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবেন। কমিশন যেসব সংস্কার প্রস্তাব করবে সেগুলোর বাস্তবায়ন এই সরকার করবে নাকি নির্বাচিত সরকার করবে, সে বিষয়ে মতামত নেওয়া হবে বলে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন।’
সংলাপ শেষে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের আহ্বায়ক ফরিদুজ্জামান ফরহাদ জানান, সময় না বাড়িয়ে সংস্কার কমিশনগুলোর কাজ নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যেই শেষ করা, রাষ্ট্র সংস্কার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না রাখতে, বাজার মনিটরিং এবং ২০০৯ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত সব ধরনের রাজনৈতিক গায়েবি মামলা প্রত্যাহার করতে পরামর্শ দিয়েছি।