পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও শক্তিশালী ‘পুলিশ কমিশন’ গঠনের সুপারিশসহ বেশ কিছু প্রস্তাব সংস্কার কমিশনের কাছে জমা দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম। সম্প্রতি পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন জানান, তারা খসড়া প্রস্তাব জমা দিয়েছেন, তবে কমিশনের কাঠামো কেমন হবে তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে কমিশনপ্রধান সফর রাজ বলেন, ‘আমরা আইজিপির কাছ থেকে একটি প্রস্তাব পেয়েছি। তাতে সাংবিধানিক কমিশন গঠনসহ বেশ কিছু সুপারিশ রয়েছে।’
খসড়া প্রস্তাব প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ‘আমরা পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছি। তাতে বলা হয়েছে, কমিশনের প্রতিটি পদে নিয়োগ হবে দুই বছরের জন্য। শীর্ষস্থানীয় পদগুলোতে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও পুলিশের কর্মকাণ্ড তদারকির দায়িত্বে থাকবে এই কমিশন। এতে করে রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায় পদোন্নতি ও নিয়োগের পুরোনো সংস্কৃতির অবসান ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়। কমিশনের লক্ষ্য পুলিশ যেন নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং জন-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংগতি রেখে মানবাধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে তা নিশ্চিত করা। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইনের শাসন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা। কারণ বিগত দিনে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ ঘোচাতে চান তারা।
এর আগে কীভাবে পুলিশ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে অনলাইনে জরিপ পরিচালনা করে পুলিশ সংস্কার কমিশন। এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জরিপে অংশ নেওয়া ১৪ হাজার ৩৮৯ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং বাইরের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে একটি পৃথক তদারকি সংস্থা গঠনের পক্ষে মত দেন।
সংস্কার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের একটি সংযোজনী হিসেবে পুলিশের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে প্রস্তাবিত ১১ জন সদস্য পুলিশ থাকবেন। এর চেয়ারম্যান হবেন আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা একজন অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি। আর সদস্যদের মধ্যে চারজন সংসদ সদস্য- দুজন ক্ষমতাসীন দলের এবং দুজন বিরোধী দল থেকে মনোনীত হবেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে স্পিকার তাদের নাম প্রস্তাব করবেন। অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাও থাকবেন কমিশনে- একজন আইন বিশেষজ্ঞ, একজন মানবাধিকার কর্মী, একজন অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি এবং সমাজবিজ্ঞান বা পুলিশিং সংক্রান্ত একজন শিক্ষাবিদ। এই চারজনের মধ্যে একজন নারী থাকবেন। রাষ্ট্রপতি একটি বাছাই কমিটির প্রস্তাবিত ছয়জনের তালিকা থেকে তাকে নিয়োগ দেবেন। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্রসচিব এবং আইজিপি পদাধিকারবলে পুলিশ কমিশনের সদস্য হবেন এবং আইজিপি সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রধান বিচারপতি অথবা তার মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি বাছাই কমিটির প্রধান হবেন। এই কমিটিতে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রধানরা এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব অথবা একজন অবসরপ্রাপ্ত আইজিপি অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
কমিশনের কার্যাবলি সম্পর্কে জানানো হয়, কমিশন আইজিপি নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নয় এমন তিনজন কর্মকর্তার একটি প্যানেল সুপারিশ করবে। আইজিপির কর্মকালের মেয়াদ হবে অবসরের বয়স নির্বিশেষে দুই থেকে তিন বছর। প্রস্তাবিত কমিশনকে আইজিপিকে অপসারণ করার ক্ষমতাও দেওয়া হবে, যদি কমিশনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হন। এটি পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিশেষায়িত ইউনিট, উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), মেট্রোপলিটন কমিশনার, জেলা পুলিশ সুপারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের জন্য নামও সুপারিশ করবে।
সংস্কার কমিশন সদস্যরা মনে করেন, এটা করা সম্ভব হলে পুলিশ প্রশাসনে রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং লোভনীয় পদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের অবসান ঘটবে। প্রস্তাবিত কমিশন প্রয়োজনে একটি জাতীয় জননিরাপত্তা নীতি এবং পুলিশ সম্পর্কিত আইন, বিধি ও প্রবিধিও প্রণয়ন করবে। প্রয়োজনে এটি আইনসংগতভাবে বলপ্রয়োগের পরিধি নির্ধারণ, পুলিশ প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা করার কাজও করবে। পুলিশ কমিশনের সদস্যদের মেয়াদ হবে চার বছর। সংসদ ভেঙে গেলে সংসদ সদস্যরা কমিশনের সদস্য থাকবেন না, যেখানে কমিশনে নিয়োগ শুধু এক মেয়াদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে। ঋণখেলাপি, বিদেশি নাগরিক, কর ফাঁকিতে অভিযুক্ত, অর্থ আত্মসাৎকারী, অপরাধী বা প্রজাতন্ত্রের পদাধিকারী ব্যক্তি কমিশনের সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না। সরকার কমিশনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মী দিয়ে সহায়তা করবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনীয় তহবিলও বরাদ্দ করবে সরকার।
কমিশনের থাকবে একটি অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি। এই কমিটি পুলিশের বিরুদ্ধে বিদ্যমান অভিযোগ সুরাহার জন্য আপিল কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করবে। পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তে কেউ সন্তুষ্ট না হলে এই তিন সদস্যের কমিটির কাছে আপিল করতে পারবেন। এই অভিযোগ কমিটি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। পুলিশ কর্মকর্তারা সমস্যায় পড়লে ওই কমিটি তা সমাধানের লক্ষ্যে তিন সদস্যের অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠন করবে।