সরকারি কেনাকাটায় ১২ বছর আগে ই-জিপি চালু হলেও এখনো সিন্ডিকেটের কবজায় রয়ে গেছে সরকারি কেনাকাটা। ১০টি মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন প্রায় ৫৩ হাজার ঠিকাদার। এর মধ্যে ৫ শতাংশ পেয়েছেন ৬১ শতাংশ কাজ। মোট কাজের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির উদ্যোগে রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলন এসব তথ্য জানানো হয়।
এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাজনৈতিক শক্তি ও ঠিকাদারের দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। সরকারি ক্রয় খাত একটি জিম্মি অবস্থায় রয়েছে।’
ই-প্রকিউরমেন্ট ইন বাংলাদেশ-মার্কেট কন্সেন্ট্রেশন, কলিউশন অ্যান্ড পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স- এই নামে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির পরিচালক মো.তোহিদুল ইসলাম। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ই-জিপির মাধ্যমে ক্রয় ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হওয়ার চিত্র এ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়েছে। ৬৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজ বাস্তবায়নের জন্য এসব অর্থ খরচের অনুমোদন দেওয়া হয়।
ড. ইফতেখরুজ্জামান বলেন, ‘সরকারের কেনা-কাটার ব্যাপারে সবার প্রত্যাশা ছিল ইজিপিতে স্বচ্ছভাবে সব কাজ হবে। গবেষণায় দেখে গেছে, ম্যানুয়ালি কাজটা শুধু ডিজিটালাইজড হয়েছে। রাজনৈতিক শক্তি ও ঠিকাদারের দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৯২১ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তাতে শীর্ষ ১০ জন ঠিকাদার মোট অর্থের ৯২ শতাংশ খরচ করেছেন। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই বাজার দখল হয়েছে। আবার আইনের ফাঁকফোকরে একই ঠিকাদাররা যৌথভাবে কার্যাদেশ পেয়েছেন। নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে দুই একজন ঠিকাদার ছাড়া ঘুরেফিরে কয়েকজন ঠিকাদারিই কাজ করেছেন। কাজের নিয়ন্ত্রণে শুধু একটু হাত বদল হয়েছে। এ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া রহিত করতে হবে।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের যে তথ্য ভাণ্ডর তা বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঠিকাদারদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতার তীব্র প্রবণতা রয়েছে। বাজারে মুষ্টিমেয় ঠিকাদারের দখলদারিত্ব রয়ে গেছে। প্রায় ৫৩ শতাংশ কাজ ওপেন টেন্ডার মেথডে (ওটিএম) এবং ৪৪ শতাংশ এলটিএম পদ্ধতিতে হয়েছে। প্রতি টেন্ডারে একটি মাত্র দরপত্র পড়ে ১৭ শতাংশ, দুই-৩টি দরপত্র পড়েছে ২৭ শতাংশ। ১২ থেকে ২৪টি দরপত্র পড়ে ৭ শতাংশ এবং ৩৬টির বেশি দরপত্র পড়ে ১৯ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০টি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পাঁচজন ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রায় ৯২ শতাংশ অর্থ খরচ করা হয়েছে। এভাবেই তারা বাজার দখল করে রাখে। শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার মোট কাজের ৬১.৩১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ৫ শতাংশ ঠিকাদার কাজ পেয়েছেন ৭৫ শতাংশ কাজ। একই সঙ্গে তারা সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের ৬৯ শতাংশ কাজ পেয়েছেন। এভাবে প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের কাজ মুষ্টিমেয় কয়েকজন ঠিকাদার যোগসাজশ করে পেয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ৪২ হাজার ৮৪৬ জন ঠিকাদারের মধ্যে ১১ হাজার ৪৪৮ জন যৌথ উদ্যোগে কাজ করেছেন। এটা মোট কাজের প্রায় ২৮ শতাংশ। শীর্ষ ঠিকাদাররা নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার (জেভি) গঠন করে বড় বড় কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছে। যার ফলে তাদের বাজার দখল আরও বেশি পোক্ত হয়। এছাড়া, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে শীর্ষ ঠিকাদারদের আধিপত্য বদলে যায়। যেমন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে মেয়র পরিবর্তনের পর শীর্ষ ১০ ঠিকাদারের তালিকা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়েও মন্ত্রী পরিবর্তনের পর শীর্ষ ঠিকাদারদের তালিকায় বড় পরিবর্তন এসেছে। কিছু সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে সরকারি প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। এ জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বাজার শেয়ার সীমিতকরণ এবং প্রকৃত মালিকানার তথ্য উন্মুক্ত করতে হবে। এসব করা হলে ঠিকাদারদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে এবং সরকারি কেনাকাটায় সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ঠিকাদারের কাজ
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়: ২০১৫ সালে ৫ শতাংশ ঠিকাদার ৮৪ শতাংশ কাজ পেয়েছে। ২০২৪ সালে তা ৭৭ শতাংশে ঠেকেছে। গত ১০ বছরে এই মন্ত্রণালয়ে ৬৩ জন ঠিকাদার ৩৫ শতাংশ কাজ করেছেন।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি): এখানেও শীর্ষ ৫ শতাংশ ঠিকাদার ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬২ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। ২০২৪ সালে এসে তা বেড়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছে। এই বিভাগে গত ১০ বছরে ৫৯ জন ঠিকাদার যৌথ বা সম্মিলিতভাবে ৪৫ শতাংশ কাজ করে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়: এখানেও পাঁচ ঠিকাদার ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬০ শতাংশ কাজ পেলেও ২০২৪ সালে তা ৭০ শতাংশে পৌঁছে। মাত্র ২৫ জন ঠিকাদার যৌথভাবে ৪০ শতাংশ বাজার দখল করেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি): এ বিভাগেও শীর্ষ পাঁচ ঠিকাদার ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৩৬ শতাংশ বাজার দখলে রাখেন। কিন্তু ২০২৪ সালে তা বেড়ে ৫৮ শতাংশে ঠেকে। গত ১০ বছরে ৬৫ জন ঠিকাদার প্রায় ১২ শতাংশ কাজ পান। এর মধ্যে শীর্ষে ছিল মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড। ১২টির মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন সবচেয়ে বেশি ৫৫ শতাংশ অর্থ খরচ করেছে। অন্যদিকে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে রাজউক সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছে। এভাবে সব মন্ত্রণালয়ে শীর্ষ কয়েকজন ঠিকাদারই কাজ করেছেন।