বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (জেসিডি) ঢাকা কলেজ শাখার সদস্যসচিব মিলাদ হোসেন গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। অচল হয়ে গেছে তার এক হাত। তবু তিনি এই ভেবে স্বস্তি পান যে তার অঙ্গহানির বিনিময়ে হলেও দেশ স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্ত হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে আহত মিলাদ বলেন, ‘আমি যখন ভাবি যে দেশের মুক্তির জন্য আমি রক্ত দিয়েছি, তখন শান্তি পাই, স্বস্তি পাই।
সেদিনের সেই ভয়ংকর স্মৃতি
সেদিনের ভয়ংকর স্মৃতি স্মরণ করে মিলাদ বলেন, ‘১৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিএনপি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে একটি সমাবেশ আহ্বান করেছিল, যা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানারে অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের নেতৃত্বে বিএনপির ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পল্টন টাওয়ার চত্বর থেকে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন। আমরা বেলা ২টার দিকে মিছিল শুরু করি, কিন্তু বিজয়নগর পানির ট্যাংকির পাশে মোতায়েন করা পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়ে আমাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখন আমরা আশপাশের গলিতে অবস্থান নিই।’
তিনি বলেন, ‘আধা ঘণ্টা পর আমরা আবারও একত্রিত হই এবং মিছিল নিয়ে প্রধান সড়কে ওঠার চেষ্টা করি। ঠিক তখনই পুলিশ সরাসরি গুলি চালায়, যাতে যুবদল নেতা নবীন তালুকদারসহ দুইজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং তিনজন আহত হই। অন্য দুইজন হলেন কলেজ ছাত্রদলের সহ-প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ইমরান এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফখরুল ইসলাম ফাহাদ।’
চিকিৎসা পেতে ঝক্কি
মিলাদ বলেন, ‘একটি গুলি আমার বাঁ হাতে লাগে এবং পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে আমার বাঁ হাত অচল হয়ে পড়ে। সে সময় সহকর্মীরা আমাকে উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আমাকে প্রথমে কাকরাইলের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানকার কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানান।’
তিনি বলেন, ‘পরে আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলে কাকরাইল মোড়ে পুলিশ আমাদের আটকে দেয়। এরপর আমাকে শান্তিনগরের অরোরা হাসপাতালে নেওয়া হয়।’
সেখানে মিলাদকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয় এবং সেদিনই তার অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে এক দিন পর ২১ জুলাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ১০ মিনিটের মধ্যে হাসপাতাল ছাড়ার অনুরোধ জানায়, কারণ গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সেখানে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরদিন মিলাদ আত্মগোপনে চলে যান এবং ২৩ জুলাই ধানমন্ডি জেনারেল অ্যান্ড কিডনি হাসপাতালে ভর্তি হন, যেখানে ২৬ জুলাই তার দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে ৩০ জুলাই তিনি বাড়ি ফিরে যান।
চিকিৎসা চলছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
মিলাদ বর্তমানে আজিমপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন এবং ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, এখনো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং নিয়মিত ফিজিওথেরাপি করাতে হচ্ছে।
মিলাদ বলেন, ‘ডাক্তাররা জানিয়েছেন, আমার গুলিবিদ্ধ হাত কখনোই আগের মতো স্বাভাবিক হবে না। আরও এক বছর আমাকে পর্যবেক্ষণে রাখার প্রয়োজন। গুলির আঘাতে হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে স্টিলের প্লেট বসানো হয়েছে, যা পরে অপসারণ করতে হবে।’
স্বৈরাচারের পতনে স্বস্তি
সবকিছু সত্ত্বেও শেখ হাসিনা সরকার পতন হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমার বিরুদ্ধে ১২টি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল। বহুবার জেল খেটেছি এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলার শিকার হয়েছি।’ ডিবি পুলিশ তাকে গুম করেছিল বলে দাবি করেন।
চিকিৎসা খরচ প্রসঙ্গে মিলাদ জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবসময় তার খোঁজখবর রাখছেন এবং চিকিৎসার ব্যয় বহন করছেন। সূত্র: বাসস