অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যকার আজকের বৈঠকটি নিছক দুজন ব্যক্তি বা পক্ষের বৈঠক নয়; এটি দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের বৈঠক। কারণ, বৈঠকটি সফল হলে দেশের রাজনীতি একরকম হবে। আবার ব্যর্থ হলে গতিপথ হবে আরেকরকম। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ জন্যই আশাবাদ ব্যক্ত করে লন্ডনের বৈঠকটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হবে বলে উল্লেখ করেছেন।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দেশে আগামীতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কি না, সেটি আজকের বৈঠকে আলোচনার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। পাশাপাশি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক, রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন ইস্যু, জুলাই সনদসহ অনেক কিছুর নিষ্পত্তি নির্ভর করছে আজকের বৈঠকের ওপর। নির্বাচনের দিনক্ষণের বিষয়ে দুই নেতা একমত হলে একটি উপযুক্ত সময়ে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে জনমনে স্বস্তি ফিরে আসবে। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরলে দেশের অর্থনীতিতে গতির সঞ্চার হবে।
অন্যদিকে বৈঠক ব্যর্থ হলে বিএনপির সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হবে। দলটি আন্দোলনে গেলে দেশে সহিংস পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার একধরনের সম্ভাবনা আছে বলে রাজনীতিতে যে বিদ্যমান আলোচনা রয়েছে, সেটি পিছিয়ে যাবে। সব মিলিয়ে দেশে আবার এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘লন্ডনের দুই ঘণ্টার বৈঠকের সাফল্যের ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের আগামী দিনের গতিপথ। আশা করি, খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে ভালোর দিকেই টার্ন নেবে। যেহেতু বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে সবকিছু গাইড করছেন।’
তিনি বলেন, ‘লন্ডনের বৈঠক নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে আশা-আকাঙ্ক্ষা বেশি। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ একধরনের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকট উত্তরণের জন্য দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারকে দলগুলোর সর্বত্র সহযোগিতা করা। গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্য। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিজেদের ঐক্য ধরে রেখে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে।’ দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, ‘যদি কোনো কারণে বৈঠকে সমঝোতা না হয়, বিএনপি যদি আন্দোলনে নামে, তাহলে তৃতীয় পক্ষ, অর্থাৎ অন্য দলগুলো সুযোগ বুঝে তাদের এজেন্ডা নিয়ে নেমে পড়বে। এতে বিএনপির লোকসান হবে বেশি।’
ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে আজকের বৈঠকটি লন্ডনের হোটেল ডরচেষ্টারে অনুষ্ঠিত হবে। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বৈঠকটি দুই ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যতদূর জানা গেছে, এই বৈঠক ‘ওয়ান টু ওয়ান’ অনুষ্ঠিত হবে। বিভিন্ন সূত্রে খবর নিয়ে জানা গেছে, আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে গত ৯ জুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির নেতাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন তারেক রহমান। ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠজনরা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, অত্যন্ত খোলা মন নিয়ে তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন।
নামপ্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য খবরের কাগজকে জানান, বিএনপির পক্ষ থেকে আগামী ডিসেম্বর থেকে রমজানের আগে ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো একদিন নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করা হতে পারে। মধ্য ফেব্রুয়ারিতে পবিত্র রমজান শুরু হবে। তারপরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা, তার ওপর এপ্রিলে ঝড়-বৃষ্টি শুরু হওয়ার আশঙ্ক্ষা থাকে।
যতদূর জানা গেছে, সরকার ও বিএনপির মধ্যে সৃষ্ট টানাপোড়েনের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ভূমিকা পালন করে রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তার নির্দেশনায় বিএনপি কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে নমনীয় হয়েছে। খালেদা জিয়া লন্ডনে তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেও নির্দেশনা দিয়েছেন। বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ হওয়ার পর এখন অবশ্য বিএনপিতেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। নেতারা আশাবাদী হয়ে উঠছেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনার পর নেতারা উপলব্ধি করেছেন যে, নির্বাচন নিয়ে কঠোর আন্দোলন বা সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নিলে নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। তাতে বিএনপির কোনো লাভ হবে না। দলটির একাধিক প্রভাবশালী নেতা খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতার কাছাকাছি রয়েছে বিএনপি। কিন্তু নৈরাজ্য হলে নির্বাচন ভণ্ডুল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। দুই নেতার মধ্যে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে দেশের সব রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশ একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে।’
সরকারের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা যায়, ডিসেম্বর মাসকে অনেকে আওয়ামী লীগের জন্য অনুকূল সময় বলে মনে করেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ডিসেম্বরে নির্বাচন চেয়েছেন। কিন্তু সরকার ডিসেম্বরে নির্বাচন করতে রাজি নয়।
সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই সনদ এবং গণহত্যার বিচার- এই তিন ইস্যু নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ ছাড়া নতুন দল এনসিপির সঙ্গে আসন সমঝোতার বিষয়ে প্রসঙ্গক্রমে আলোচনা উঠলে কথা হতে পারে দুই নেতার।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের সঙ্গে থাকা বা তাকে রাষ্ট্রপতি পদমর্যাদায় কোনো পদে রাখার বিষয়ে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে। অনেকেই বলছেন, বিএনপির সঙ্গে তিনি থাকলে তাতে ভবিষ্যৎ সরকারই লাভবান হবে। কারণ, বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারবেন। যদিও লন্ডনে ড. ইউনূস বলেছেন যে, তিনি নির্বাচন-পরবর্তী সরকারে থাকবেন না।
বিএনপির একাধিক নেতা জানান, ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের দিনক্ষণের যুক্তি, তারেক রহমানের দেশে ফেরা, গণহত্যার দায়ে শেখ হাসিনাসহ ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার-প্রক্রিয়া দৃশ্যমান করা, প্রধান উপদেষ্টার অধীনে নির্বাচনসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে আলোচনা হতে পারে। এ বৈঠকে অনেক সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি কিছু বিষয় সহজ হয়ে যেতে পারে।
তারা জানান, নির্বাচন নিয়ে দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র, সেটি তুলে ধরার পাশাপাশি বিএনপি যে ড. ইউনূসের অধীনেই নির্বাচন চায় এবং তার হাত ধরেই যে দেশের গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটুক, তা-ও প্রধান উপদেষ্টাকে জানানো হবে। পাশাপাশি এপ্রিলে নির্বাচন হলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তা-ও প্রধান উপদেষ্টাকে জানানো হবে। এ ছাড়া সংস্কারের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো দ্রুতই বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাবেন তারেক রহমান।