রংপুরের গঙ্গাচড়ায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা, বাড়ি ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত গুজব’ বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক দলের নেতা, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা।
তারা মনে করেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব রটিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে একটি পক্ষ। তদন্তসাপেক্ষে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। গতকাল পৃথক বিবৃতিতে তারা এই দাবি জানান।
ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ি ইউনিয়নে গত শনিবার রাতে দুই দফায় প্রায় ১৫টি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়। এক কিশোরের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এই ঘটনা ঘটে। পুলিশ সেই কিশোরকে গ্রেপ্তার করার পরও উচ্ছৃঙ্খল জনতা এই ঘটনা ঘটায়, যা ছিল পরিকল্পিত। আতঙ্কে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই এলাকা ছাড়ছেন।
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়িয়েছে, তাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আটক করে আইনের কাছে সোপর্দ করেছে। এমন বাস্তবতায় অকারণে জল ঘোলা করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা ষড়যন্ত্রের অংশ মনে করছে দেশবাসী।’
তিনি বলেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্মম হামলায় আবার প্রমাণিত হলো দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক। শুধু সংখ্যালঘু নয়, এ দেশের কোনো নাগরিকই নিরাপদ নয়।’
ধর্মীয় সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া এবং সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক গতকাল যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। ধর্মের অপব্যাখ্যা ও গুজব ছড়িয়ে কোনো একটি নিরীহ সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানো নিন্দনীয়, সংবিধান পরিপন্থি এবং মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই ধরনের ঘটনা দেশের সামাজিক স্থিতি এবং বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানে গুরুতর আঘাত।’
তারা বলেন, ‘আমরা মনে করি, এই ঘটনা উদ্দেশ্যমূলক এবং পরিকল্পিত। এটি গুজব রটিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির অপপ্রয়াস।’
প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বাংলাদেশ জাসদের নেতারা বলেন, ‘এই ঘটনায় জড়িত কেউ যেন কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক ছত্রচ্ছায়ায় আশ্রয় না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। নিরপরাধ, নিরীহ হিন্দু পরিবারগুলোর জান-মাল রক্ষায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
বেতগাড়ি ইউনিয়নের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এলাকা ছাড়ার ঘটনায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা বারবারই ঘটছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ভূমিকা নিতে পারছে না।’ তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।
সরকারি তৎপরতায় শক্তিশালী করা হচ্ছে নিপীড়কদের: শিক্ষক-সংস্কৃতিকর্মীদের মোর্চা
শিক্ষক-লেখক-সংস্কৃতিকর্মীদের মোর্চা গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি রংপুরের বেতগাড়ি গ্রামের এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেন, দেশে সামাজিক নিপীড়ন ক্রমাগত বেড়ে চললেও সরকার কার্যকর ভূমিকা নিতে পারছে না। এতে নিপীড়করা শক্তিশালী হয়ে উঠছেন।
গতকাল বিকেলে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ স্বাক্ষরিত বিবৃতি আসে গণমাধ্যমে। তারা বলেন, ‘প্রত্যাশা ছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গায়ের জোরে ভিন্নমতের ওপর আক্রমণের ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির অবসান হবে। অথচ নানা ধরনের মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে, ট্যাগ দিয়ে মাজারে হামলা হচ্ছে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হচ্ছে, নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে না। এসব ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকেও তৎপরতার সঙ্গে উদ্যোগ নেওয়ার ঘাটতি লক্ষণীয়। এর মাধ্যমে আসলে নিপীড়কদেরই শক্তিশালী করা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কক্সবাজারের রামু, যশোরের অভয়নগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, সুনামগঞ্জের শাল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার এমন অভিযোগ তুলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে হামলার ঘৃণ্য ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ ও প্রশাসনকে খুব বেশি তৎপর হতে দেখা যায়নি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সেই একই কৌশল অবলম্বন করে হিন্দু বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে।’
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদও এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে।