ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটের তফসিল ঘোষণার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সিইসির তফসিলের ঘোষণা বিটিভি ও বেতারে প্রচারের জন্য নেওয়া হয়েছে রেকর্ডের প্রস্তুতি। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আজ বুধবার দুপুরে সাক্ষাৎ শেষে সন্ধ্যায় অথবা আগামীকাল বৃহস্পতিবার তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সিইসির এবারের তফসিল ঘোষণায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে রাজনৈতিক দলসহ সবার সহযোগিতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ইসি সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার জন্য তাদের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত। দুই ভোটের তফসিল ঘোষণার ভাষণও চূড়ান্ত। আজ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের ভাষণ রেকর্ড করা হবে। সেই ভাষণই তফসিলের ঘোষণা হিসেবে গণমাধ্যমে সম্প্রচার করা হবে।
দুপুরে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক
প্রথা অনুযায়ী আজ বুধবার দুপুর ১২টার দিকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ফুল কমিশন। এরপর বিকেলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের তফসিলসংক্রান্ত ভাষণ রেকর্ড করা হবে। সাধারণত রেকর্ডিংয়ের দিন রাতেই জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে তফসিল ঘোষণা করা হয়। তবে কোনো কারণে আজ তা ঘোষণা করা সম্ভব না হলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সম্প্রচার হবে।
এ বিষয়ে গতকাল ইসি আবদুর রহমানেল মাছউদ জানান, ‘তফসিলের ভাষণ রেকর্ডে বিটিভি ও বেতারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভাষণের সময় ও বিষয়বস্তু সিইসি নির্ধারণ করবেন এবং সেই অনুযায়ী প্রচার সম্পন্ন হবে। সিইসির রেকর্ড করা এই ভাষণ তফসিল ঘোষণা হিসেবে গণমাধ্যমে সম্প্রচার করা হবে। ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে অবশ্যই তফসিল ঘোষণা করতে হবে।’ তফসিলে আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে (সম্ভাব্য ৮ ফেব্রুয়ারি) ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া কমিশন ইতোমধ্যেই ভোট পরিচালনার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন ও নির্বাচন কমিশনাররা গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকে প্রশাসনিক সহযোগিতা, নির্বাচনসংক্রান্ত অনুসন্ধান ও ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কার্যক্রমসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখান থেকে বের হয়ে সিইসি সাংবাদিকদের জানান, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির মাধ্যমে সব ব্যবস্থা যথাযথভাবে সম্পন্ন হবে। এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য ছিল প্রধান বিচারপতি সঙ্গে বিদায়ী সৌজন্য বৈঠক এবং আগামী নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ
রেওয়াজ অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার আগে শুধু রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করার রীতি থাকলেও এবার সেই রীতিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে বর্তমান সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। গত রবিবার কমিশন সভা শেষে সন্ধ্যায় তফসিলের খসড়া নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোট আয়োজনে ইসির পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে বলে প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করেছেন সিইসি। আর প্রধান উপদেষ্টা এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সরকার ইসিকে সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে জানান।
একসঙ্গে দুই ভোট, গ্রহণের সময় ৯ ঘণ্টা
এই নির্বাচনের সবচেয়ে লক্ষণীয় ঘোষণা হলো ভোটের সময়সীমা বৃদ্ধি। এবার ভোট শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায়, চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। ভোট গ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বৃদ্ধি। দুটি ভোট- সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ভোটার চাপ বাড়বে; সেই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে ইসির কমিশন সভায় ভোট গ্রহণের আগের সময় ৮ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৯ ঘণ্টা করা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে জায়গার সংকট থাকলে বাড়তি গোপন কক্ষ স্থাপন এবং ভোট পরিচালনার সুবিধার্থে বুথ সংখ্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জায়গার সংকট থাকলে প্রতিটি বুথে অতিরিক্ত গোপন কক্ষ স্থাপন করা হবে। তাদের আশা, ভোটারের সুবিধার্থে সময় বৃদ্ধি এবং পোস্টাল ভোটের প্রস্তুতি আরও কার্যকর হবে। সব মিলিয়ে ইসির লক্ষ্য- স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন করা।
দুবার আরপিও সংশোধন
তফসিল ঘোষণার আগে এবার দ্বিতীয় দফায় আরপিও (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) সংশোধন করে গতকাল গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। নতুন বিধান অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটে কোনো মার্ক না থাকলে বা একাধিক প্রতীকে টিক/ক্রস থাকলে ব্যালট গণনা হবে না। এ ছাড়া আদালতের রায়ে প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন ঘটলে ওই আসনের জমা হওয়া পোস্টাল ব্যালটও গণনা করা হবে না। এ দফা সংশোধন আকারে ৩ ডিসেম্বর আরপিও উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত হয়। এতে পোস্টাল ভোট সাধারণ ভোটের একই সঙ্গে গণনা হবে এবং একাধিক সিল থাকলে ভোট বাতিল বলে গণ্য হবে।
ইসি জানিয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর ১৫ দিনের মধ্যে সরকারি চাকরিজীবী ও আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধন করতে হবে। পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসারসহ নির্বাচনি দায়িত্বে মাঠে থাকা সদস্যদের নিবন্ধনের সময় পরে নির্ধারিত হবে। এসব ছাড়া অন্য যোগ্য ভোটারদেরও ১৫ দিনের মধ্যেই নিবন্ধন শেষ করতে হবে।
এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৮১টি দেশীয় সংস্থাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিবন্ধন দিয়েছে ইসি। প্রথম ধাপে ৬৬ সংস্থা, দ্বিতীয় ধাপে ১৫ সংস্থা অনুমোদিত হয়েছে। এই সংস্থাগুলো ভোটের অগ্রগতি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এবং নির্বাচনি আচরণ পর্যবেক্ষণ করবে।