নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন অনেকটা লাইনচ্যুত একটি ট্রেনকে আবার লাইনে ফিরিয়ে আনার মতো। ন্যূনতম সংস্কার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বদলে নির্বাচনি ব্যবস্থাকে অন্তত কার্যকর গতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটি সম্ভব হলে এটাকেই নির্বাচন কমিশনের প্রথম বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হবে।
বুধবার (৭ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনজিও ব্যুরো কার্যালয়ে ৮১টি সংস্থার মোর্চা ‘অ্যালায়েন্স ফর ফেয়ার ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (এএফইডি)’–এর একটি প্রকল্প উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
নির্বাচনি ব্যবস্থা ও চলমান সংস্কার কার্যক্রমের প্রসঙ্গ টেনে নির্বাচন কমিশনার বলেন, '২০২৬ সালের নির্বাচন একটি ভাঙাচোরা কাঠামোকে আবার সচল করার প্রচেষ্টা। বড় ধরনের সংস্কার হয়তো একবারে সম্ভব নয়, তবে ন্যূনতম রিপেয়ার করে গতি ফিরিয়ে আনা গেলে সেটিই হবে আমাদের বড় অর্জন। এরপর ধাপে ধাপে উন্নতির দিকে এগোতে হবে।'
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে যারা কাজ করছেন, তাদের অভিজ্ঞতার জায়গাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই একরকম। সে কারণেই সংস্কার ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলোও সবার কাছে প্রায় একই।
২০২৬ সালের নির্বাচনকে প্রেক্ষাপটে ফেলতে গিয়ে আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ তিনটি নির্বাচনের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন- ১৯৯১, ২০০৮ এবং আসন্ন নির্বাচন। তিনি বলেন, এই তিনটি সময়েই নির্বাচনি ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য আইনি সংস্কার হয়েছে।
১৯৯১ সালে নির্বাচন পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের জন্য একটি কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরি হয়, যার সুফল পরবর্তী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পাওয়া গেছে। পরে ২০০৭ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, প্রার্থীর যোগ্যতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটসংক্রান্ত বিধানসহ নানা সংস্কার যুক্ত হয়। তবে দুঃখজনকভাবে, পরবর্তী তিনটি নির্বাচনে সেসব বিধান আরও উন্নত করার সুযোগ হয়নি।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে আবারও অনেক আইনি ও বিধিগত সংস্কার হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনবিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রশংসার দাবিদার। তবে কিছু ঘাটতি থেকেই যাবে, যেগুলো এই নির্বাচনের পর আবার পর্যালোচনা করতে হবে। সামনের কয়েকটি নির্বাচনে ধাপে ধাপে সেগুলো পরিমার্জন করে একটি শক্ত ও স্বচ্ছ ভিত্তি তৈরি করাই লক্ষ্য।
অবজারভার সংস্থার নিবন্ধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে কিছু সিটিজেন অবজারভেশন সংস্থার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় এবার অনেক সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিন শতাধিক আবেদন এলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ৮১টি সংস্থাকে নিবন্ধন দেওয়া গেছে।
'আমি আরও খুশি হতাম যদি ২০০ বা ৩০০টি সংস্থা মাঠে কাজ করত' বলেন তিনি।
নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর প্রতি প্রত্যাশার কথা জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার বলেন, তারা যেন বস্তুনিষ্ঠ ও মানসম্মতভাবে দায়িত্ব পালন করে। ভবিষ্যতে এই পরিসর আরও বাড়াতে হবে। কারণ অবজারভার সংস্থাগুলো নির্বাচন কমিশনের ‘থার্ড আই’ হিসেবে কাজ করে- ভুল, সীমাবদ্ধতা ও ঘাটতি চিহ্নিত করে দেয়। নির্বাচন কমিশন নীতিমালার ভেতরে থেকে তাদের কাজের ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সহায়তা দেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রথমবার ভোটার, দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারা মানুষ, নারী ও প্রতিবন্ধী ভোটার, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং দূরবর্তী এলাকায় কর্মরত শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে অবজারভারদের পর্যবেক্ষণ নির্বাচন কমিশনের জন্য সহায়ক হবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ডেমোক্রেসি ওয়াচের চেয়ারপারসন তালেয়া রহমান, খান ফাউন্ডেশনের কো-চেয়ার রোকসানা খন্দকারসহ সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এলিস/সুমন/