চট্টগ্রামের হালিশহরে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় একই পরিবারের আরও ছয়জন দগ্ধ হয়ে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান পর্তুগাল প্রবাসী শামীম আহমেদ সুমন (৪০)। এর আগে, সকালে ৫০ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে মো. শাওনের (১৭) মৃত্যু হয়। এর আগে, সোমবার রাতেই শাওনের মা নুরজাহান আক্তার রানী (৪০) শরীরে ১০০ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে মারা যান।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার পশ্চিম মাইজপাড়া গ্রামে গ্যাস লাইন লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে নারী-শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হয়েছেন। তারাও বর্তমানে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গতকাল জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, সামির আহমেদের শরীরের ৪৫ শতাংশ দগ্ধ ছিল এবং তার ইনহেলেশন ইনজুরি ছিল। বাকি ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অনেকের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। তাদের হাসপাতালের আইসিইউ ও এইচডিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দীন জানান, চট্টগ্রাম থেকে আসা দগ্ধ রোগীদের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
দাউদকান্দিতে অবৈধ গ্যাস সংযোগে দগ্ধ ৪
গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার পশ্চিম মাইজপাড়া (বলদাখাল) গ্রামে অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণে নারী-শিশুসহ একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হয়েছেন। দগ্ধরা হলেন- মনোয়ারা বেগম (৬০), জিল হক (৩৭), উম্মে হুমায়রা (৩০) ও হুররাম (৩)। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে ভর্তি করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চার মাস আগে ভবনটির অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সোমবার গভীর রাতে বাড়ির মালিক পুনরায় অবৈধভাবে সংযোগ দেন। ভোরে রান্নাঘরে চুলা জ্বালাতে গেলে জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটে।
দাউদকান্দি মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ফায়ার সার্ভিসের সাব-অফিসার মো. সালাউদ্দিন জানান, লিকেজ হয়ে ঘর গ্যাস ভরে যায় এবং আগুন ধরানোর চেষ্টা করলে বিস্ফোরণ ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
বাখরাবাদ গ্যাস স্টেশন গৌরীপুর অঞ্চলের ইনচার্জ প্রকৌশলী অম্লান কুমার দত্ত বলেন, অবৈধ সংযোগদাতাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে; তবে ভুক্তভোগী পরিবার কারও নাম জানাতে পারেনি।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে জানা গেছে, জিল হকের শরীরের ৫৪ শতাংশ এবং উম্মে হুমায়রার ৬৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে– তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মনোয়ারা বেগমের শরীরের ২ শতাংশ এবং শিশু হুররামের ৬ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
এদিকে গতকাল সকালে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় পৃথক গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ রোগীদের দেখতে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাসির উদ্দীন। তিনি আহতদের বর্তমান অবস্থা ও চলমান চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পর্কে মন্ত্রীদের অবহিত করেন।
এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো.সাখাওয়াত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম থেকে একই পরিবারের নয়জন অগ্নিদগ্ধের মধ্যে তিনজন মারা গেছেন। ছয়জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। একজন রোগী ভেন্টিলেশনে আছেন। আমি তাদের দেখে এসেছি। ভর্তিকৃত রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। অন্যদিকে কুমিল্লা থেকে সকালে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ রোগী এসেছেন। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। চিকিৎসকদের বলা হয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য।
অন্যদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের বলেন, গ্যাস লিকেজ থেকে সারা বছরই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামের হালিশহরে সোমবার একটি ঘটনা ঘটেছে এবং মঙ্গলবার সকালে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। আমরা শিল্প মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থা মন্ত্রণালয় এই তিনটি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে চাই। যাতে করে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারকে নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা যায়। আমরা অল্প সময়ের মধ্যে তিন মন্ত্রণালয় বসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব কীভাবে এই দুর্ঘটনাকে কমিয়ে আনা যায়।
সাংবাদিকদের তিনি আরও জানান, এই ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক শিশু বাচ্চাসহ নারীরা আহত হয়েছেন। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে যে ধরনের সাপোর্ট লাগে আমরা সেই ধরনের সাপোর্ট দেব।’