বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মো. মোস্তাকুর রহমানের জন্ম ১৯৬৬ সালের ১২ মে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে ব্যাচেলর (সম্মান) এবং মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৯২ সালে আইসিএমএ,বি থেকে সিএমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসায়িক সংস্থার সক্রিয় সদস্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিজিএমইএ, রিহ্যাব, আটাব ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
বর্তমানে তিনি হেরা সুইটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানিমুখী উৎপাদন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করছে।
মোস্তাকুর রহমানের দক্ষতা শুধু কর্পোরেট ফাইন্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বোর্ড গভর্ন্যান্স, আর্থিক তদারকি, মূলধন কাঠামো, রপ্তানি অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বিশেষজ্ঞ। এছাড়া তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক বোর্ড সদস্য এবং বিজিএমইএ-এর বাংলাদেশ ব্যাংক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও নিবেদিতপ্রাণ। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, অসহায় রোগীদের চিকিৎসা এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ারসহ বিভিন্ন দাতব্য কার্যক্রমে তিনি সক্রিয়।
মোস্তাকুর রহমানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও উল্লেখযোগ্য। তিনি যুক্তরাজ্য, শ্রীলঙ্কা, ভারত ও নেপাল ভ্রমণ করেছেন এবং বৈদেশিক বাজার ও শিল্প খাত সম্পর্কিত নীতিনির্ধারণী সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ড. আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
নিয়োগের পর থেকেই গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আসতে থাকে। সবশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে যে কারন দর্শানোর নোটিশ এবং একদিন পর তাদের বদলির আদেশের পর বুধবার বেলা ১১টা থেকে বিক্ষোভ শুরু করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
তারা আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানান। আজকের মধ্যে প্রত্যাহার না করলে আগামীকাল থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। এই আন্দোলেনের মধ্যেই গর্ভনরকে সরিয়ে দেওয়ার খবর এলো।
আন্দোলনে বক্তরা বলেন, আমাদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়মতান্ত্রিক আচরণ করা হয়েছে। তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। এ প্রতিকার পেতে আন্দোলন করছি। আমরা নিয়মতান্ত্রিকভাবে দাবি আদায়ের আন্দোলন করব। কোনো ধরনের মব বায়োলেন্স করব না। পরে আন্দোলনকারীরা ব্যাংক চত্বরেই প্রতিবাদ র্যালি করে। এতে ব্যাংকের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশগ্রহণ করেন।
এর আগে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈচারার’ আখ্যা দেওয়ায় গত মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তিন কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক বদলির (স্ট্যান্ড রিলিজ) আদেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সরকার গঠনের আগে ডিজিটাল ব্যাংক অনুমোদন পাচ্ছে- এমন অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন ডাকার ঘটনায় এ তিনজনকে একদিন আগে কারণ দর্শাতে বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
বদলির মুখে পড়া তিন কর্মকর্তা হলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল, ঢাকার সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠন করা নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা। এরমধ্যে এ কে এম মাসুম বিল্লাহকে রংপুর কার্যালয়, গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া ও নওশাদ মোস্তফাকে বরিশাল কার্যালয়ে বদলি করা হয়। গভর্নরের এহেন সিদ্ধান্তে প্রতিবাদে কর্মসূচির ডাক দেয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনটি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের আগের দিন ১৬ ফেব্রুয়ারি জরুরি পর্ষদ সভা ডাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্ষদ সভা শুরুর আগে বেলা ১২টায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। সেখানে সংগঠনটির সভাপতি একে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
সেখানে মাসুম বিল্লাহ বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যখন নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, ঠিক সেই সময় মাত্র এক দিনের নোটিসে ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি জরুরি পর্ষদ সভা ডাকা হয়। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সভার মূল উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া, যা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে।
সরকার গঠনের আগের দিন পর্ষদ সভা ডাকা; পর্ষদ সভার আগে সংবাদ সম্মেলন এবং ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের অনুমোদন নিয়ে সেদিন বেশ উত্তাপ ছড়ায়। সে উত্তাপের মধ্যে অবশ্য শেষমেশ পর্ষদ সভায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের আর অনুমোদন পায়নি।
কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের পরই এক অভ্যন্তরীণ আদেশ জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া কোনো কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে বা ঘরোয়া বৈঠকে, জনসভায়, সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকসংক্রান্ত বা নীতিমালার বিষয়ে বক্তব্য রাখতে পারবেন না। সে সংবাদ সম্মেলনের জের ধরে রবিবার তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। আর মঙ্গলবার দেন বদলির আদেশ।
মৃত্তিকা/অমিয়/