বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্কোন্নয়নে প্রস্তুত রয়েছে ভারত সরকার, যে সম্পর্কে থাকবে পারস্পরিক সম্মান ও সমতা, যাতে উভয় দেশের জনগণ উপকৃত হয়। নয়াদিল্লি সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে গত সোমবার ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি এ কথা বলেন।
তিনি তিস্তার পানিবণ্টন, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন, বাংলাদেশ নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন, ভিসাসহ নানা বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার অগ্রাধিকার ঠিক করলে দিল্লি ঢাকার সঙ্গে আলোচনায় বসতে আগ্রহী। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের যে টানাপোড়েন ছিল, তা থেকে বেরিয়ে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নিতে চায় দিল্লি। বিক্রম মিশ্রি বলেন, পারস্পরি মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তি বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ভীত্তি হবে। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে এনগেজমেন্ট বাড়াতে আগ্রহী। ভারত সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশ তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করলে আমরা আলোচনায় বসব। আমরা বিশ্বাস করি, দুই দেশের জনগণের কল্যাণে উভয় পক্ষ কাজ করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় যোগাযোগের গতি কিছুটা ধীর ছিল। তবে ভারত যোগাযোগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল। আমি ২০২৪ সালে ঢাকা সফর করেছি এবং ২০২৫ সালে ব্যাংককে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈঠক করেন। বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্য বৃদ্ধি, ভিসা সহজীকরণ এবং সেপা চুক্তির মতো বিষয়গুলো নিয়ে দুই দেশই আলোচনা করতে আগ্রহী।
আওয়ামী সরকারের সময়ে বাংলাদেশে বিতর্কিত নির্বাচনে ভারতের সহযোগিতা নাকচ করে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, “অতীতে আমরা বাংলাদেশের সব সরকারের সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এ ভারতের সহযোগিতা ছিল না। আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশের জনগণ তাদের নেতা নির্বাচন করবে। বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায়, তার সঙ্গে আমরা কাজ করব। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ের কথা বলা হতো।” কিন্তু সে সময় তিস্তার জট খোলেনি। আর এর পেছনে বারবারই পশ্চিবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাধার কথা এসেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের ফলে চুক্তিতে কোনো গতি আসবে কি না, জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্রি বলেন, দুই দেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে পানিব্যবস্থার সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। যৌথ নদী কমিশন ও কারিগরি কমিটির মাধ্যমে এই আলোচনাগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন প্রসঙ্গে বিক্রম মিশ্রি বলেন, প্রায় তিন দশক আগের এই চুক্তিটি কার্যকরভাবে কাজ করেছে এবং প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে এটি নবায়ন করা হবে। এ ছাড়া তিস্তা প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে করলে বেশি ফলপ্রসূ হবে।
ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে সরাসরি কোনো জবাব দেননি দেশটির পররাষ্ট্রসচিব। তিনি বলেন, সব বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবসম্মত উপায়ে যোগাযোগ বাড়াতে চায় ভারত। সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত শর্মা বাংলাদেশ সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ওই মন্তব্যগুলো একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল, যা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্যকে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির সঙ্গে মিলিয়ে বড় করে না দেখাই শ্রেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের সংটকের প্রেক্ষাপটে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের জ্বালানি আনার ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকি। বাংলাদেশ পরিশোধিত তেল আনে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যে আমরা বাংলাদেশে ডিজেল সরাবরাহ করেছি। আমরা এই সহযোগিতা অব্যাহত রাখব।’ ভিসা স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে বিক্রম মিশ্রি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা মেডিকেল ভিসা বাড়িয়েছি। ভিসা সহজীকরণ করা হয়েছে। শিগগিরই অন্যান্য ভিসা স্বাভাবিক করা হবে।’ ত্রিপক্ষীয় জোট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার সিদ্ধান্ত নিতেই পারে। তবে আমরা চাইব, তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ এমন কোনো সম্পর্কে জড়াবে না, যাতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিষাক্ত সাপ ও কুমির ছাড়ার খবরের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব বিস্মিত হয়ে হেসে বলেন, খবরটি ঠিক নয়।