বাংলাদেশের ছোটগল্প সাহিত্যে জাদু বাস্তবতার পথিকৃৎ ছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (১৮ জানুয়ারি ১৯৫১ -১০ অক্টোবর ২০২৫)। শিক্ষকদের শিক্ষক ছিলেন তিনি। তার মতো ছাত্র-ছাত্রী নন্দিত শিক্ষক একালে বিরল। মুক্তচিন্তক হিসেবে ছিলেন দেশ ও দশের আদর্শ স্থানীয়। সাদা-কালো -নীল তথা কোন রঙের আবিরে নিজেকে কখনো রাঙাননি । দলীয় বুদ্ধিজীবীর তকমা তাকে কেউ কোনদিন দিতে পারিনি। প্রচার বিমুখ, নির্লোভ ও নিরহংকার ছিলেন তিনি। নিজের কাজেই সব সময় মগ্ন থাকতেন। শিক্ষকতা, গবেষণা, লেখালেখি শিক্ষার্থী ও অনুসারীদের গিয়েছিল তার বুদ্ধির চর্চার জগত। আজ তাকে হারিয়ে আমরা একজন সাহিত্য জগতের অভিভাবক, মুক্তচিন্তক, গবেষক, ছোট গল্পকার ঔপন্যাসিক ছাত্র ও শিক্ষকদের জন্য অনুসরণীয় একজন নিবেদিত প্রাণ আদর্শ শিক্ষককে হারালাম।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৯৬৬ সালে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং সিলেট এমসি কলেজ থেকে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তিনি ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতক এবং ১৯৭২ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৮১ সালে কানাডার কুইন্স ভার্সিটি থেকে কবি ইয়েটস এর কবিতায় ইমানুওয়েল সুইডেন বার্গের দর্শনের প্রভাব বিষয়ে পিএইচ-ডিগ্রি অর্জন করেন।
তার শিক্ষক পিতার আদর্শ অনুসরণ করে ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৪৩ বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপনা করে ২০১৭ সালের জুনে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এরপর যোগ দেন ইউনিভার্সিটি লেবার আর্টস এ।২০২৩ সালের ২৭ শে আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দান করে। মৃত্যু অবধি তিনি তার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন।
শিক্ষকতাকে সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম একটি নান্দনিক শিল্পে রূপদান করেন। বিদ্যাসাগরের মতো তিনি ছিলেন নিয়ম নিষ্ঠা।সরল এবং অনারম্বর শিক্ষক জীবন ছিল তার । বাদামী কডের প্যান্টের সঙ্গে কালো ফুলহাতা গোটানো শার্ট পরিহিত ছিপ ছিপে গড়নের এই শিক্ষক ছিলেন ছাত্র-ছাত্রীদের আদর্শ অনুকরণীয় আদর্শের শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষ বিমুখ বর্তমান শিক্ষায়তনের যে করুণ চিত্র তার বিপরীতে ছাত্র-ছাত্রীতে ভরপুর ক্লাসে তিনি ইংরেজি সাহিত্য পড়িয়েছেন প্রায় অর্ধ দশক। ইতিহাস, দর্শন ও ভূগোলের আলোয়ে ইংরেজি সাহিত্যকে তুলুনা এবং প্রতিতুনার মাধ্যমে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে দৃশ্যমান করেছেন প্রতিটি পাঠ। তার মনোগ্রাহী বলার ভঙ্গি, জানার পরিধি, ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আই কন্ট্রাক্ট ইত্যাদির মিশেলে পিন পতন নিস্তব্ধতা নেমে আসত শ্রেণিকক্ষে।তার ছাত্র ছাত্রী এবং তরুণ সমাজ আছে তাকে নিয়ে সবসময় ভাবনের প্রয়াস পেয়েছেন। ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন এবং সাহিত্যের সকল শাখার সর্বশেষ ট্রেন্ড বা প্রবনতা সম্পর্কে তিনি সব সময় নিজেকে আপডেট রাখতেন। ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কে এবং জীবন ও জগৎ সম্পর্কে কৌতুহল নিবারণের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য শিক্ষক। বিশেষ করে উচ্চতর গবেষণা কর্মে তার গবেষক ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি তিনি যে অনায়াস সাধ্য আন্তরিক সহযোগিতা করতেন তা তাকে শিখরস্পর্শী শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তার প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী এবং অনুসারীরা তাকে আজও বিস্ময়কর মুগ্ধতা সমীহ ও শ্রদ্ধা নিয়ে স্মরণ করছে। ১৯৭৩ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রা পত্রিকায় একটি গল্প প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যিক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর দীর্ঘ দেড় দশ তিন আর কিছু লেখেননি। এরপর শুরু হয় তার পূর্ণকালীন লেখক জীবন। তা রচিত গল্পসমূহ হলো সমূহ হল - স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প, থাকা না থাকার গল্প, কাঁচ ভাঙ্গা রাতের গল্প, অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প, প্রেম ও প্রার্থনার গল্প, সুখ দুঃখের গল্প, বেলা ও বেলার গল্প ইত্যাদি। তার রচিত উপন্যাস হলো- আধখানা মানুষ, দিন রাত্রিগুলি, আজগুবি রাত,তিন পর্বের জীবন, খানাগলির মানুষেরা ইত্যাদ। এছাড়া নন্দনতত্ত্ব, কতিপয় প্রবন্ধ, অলস দিনের হাওয়া, রবীন্দ্রনাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্প প্রসঙ্গ অন্যান্য শিল্প প্রসঙ্গ ইত্যাদি প্রবন্ধ ও গবেষণাগা গ্রন্থ রয়েছে তার।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলাদেশের ছোটগল্পে জাদু বাস্তবতার ছিলেন পথিকৃৎ ছিলেন। সরল, সহজ ও অনারম্বর ভঙ্গিতে তিনি গল্প বলতেন। কিন্তু সব সময় গল্পের চরিত্র থেকে এবং ঘটনাপ্রবাহ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে। ভারী বিষয়কে সহজবোধ্য করে উপস্থাপনা করতেন। তার গল্প বলার ঢং অনেকটা অনেকটা শরৎচন্ন্দ্রীয় রীতির সাথে তুলনীয়। কি করে পাঠককে মুগ্ধতায় বশে নিমগ্ন করা যায় তা তিনি জানতেন।তার লেখার অন্যতম প্রধান দিক ছিল রসবোধ।উত্তরাধিকার সূত্রে সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাগ্নে হিসেবে। এটা তিনি তার রক্তে বহন করতেন।গল্প, উপন্যাস এমনকি প্রবন্ধ ও পত্রিকার কলম লেখায় তার এ রসবোধের পরিচয় বিপুলভাবে সন্নিহিত রয়েছে।
প্রস্তুত সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন বাংলা সাহিত্যে পোস্ট মর্ডান যুগের গল্পকথক। তার শিক্ষক এবং সহকর্মী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাকে 'বিস্ময়কর মানুষ' ছিলেন উল্লেখ করেছেন। নিজের ছাত্র এবং সহকর্মীদের মধ্যে তিনি তাকে অন্যতম প্রধান ছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন। বন্ধু, সহকর্মী মঈনুল আহাসান সাবের তাকে 'ভিন্ন ধারার গল্পকার ' হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রকৃত অর্থেই তিনি বাংলাদেশের কথা সাহিত্যের ইতিহাসে এক ভিন্নধারার অনন্য সৃজনপ্রতিভা সম্পন্ন লেখক ছিলেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং শিক্ষাবিদ

