শেষ মুহূর্তের তীব্র নাটকীয়তা ও সংঘাত-সংঘর্ষ শেষে সনদ স্বাক্ষরিত হলো। শুরুতেই যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত এড়ানো গেল না। ফলে সনদ তৈরি নিয়ে বিতর্ক, স্বাক্ষর নিয়ে বিতর্ক শেষে এখন অপেক্ষা বাস্তবায়ন কে করবে, কীভাবে করবে এবং কখন করবে তা নিয়ে। রাজনীতি যেহেতু দেশ ও সমাজ নিয়ে ভাবনা এবং ভূমিকা পালন করার বিষয়। তাই কোনো একটা বিষয়কে ভিন্নভাবে দেখা আর সে অনুযায়ী মত দেওয়ার কারণে বিতর্ক রাজনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবেই, তাই ভিন্নমত সহ্য করার নাম গণতান্ত্রিক-সহিষ্ণুতা আর ভিন্নমতগুলোর মধ্যে ঐক্যের সূত্র বের করা রাজনৈতিক দক্ষতার বিষয়। জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য করার চেষ্টা করেছে, তারা তাদের কাজ শেষ করেছে, কিন্তু ভালোভাবে শেষ করতে পারেনি। অভ্যুত্থানে প্রধান আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যে রাষ্ট্র বৈষম্য করবে না আর দেশ পরিচালনার নামে ক্ষমতাসীন দল দমন-পীড়ন করবে না। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ভাবা হয়েছিল রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর সংস্কার হবে। সে কারণেই সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষের আশা আর শাসকদের পরিকল্পনা সব সময় একই লক্ষ্যে চলে না। এবারও তাই হলো। সংবিধানের ওপর সব দায় চাপানো আর তাকে পাল্টে ফেলার হুঙ্কার শুনে এই ভাবনা হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে প্রকাশ্য ঘোষণার বাইরে অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে।
সংবিধান কোনো চিরস্থায়ী বিধান নয়। মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনের স্বীকৃতি দিয়ে তা পাল্টানো হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই পরিবর্তনের ফলে সংবিধান যা আছে তার চাইতে উন্নত, নাকি নিম্নতর হবে? মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিসর যদি না বাড়ে এবং অতীতের অর্জনগুলো যদি রক্ষা না পায়, তাহলে পরিবর্তন বিপজ্জনক। কিন্তু প্রথম থেকেই অভ্যুত্থানের আবেগকে ভিন্ন খাতে পরিচালিত করে সংস্কারের পদক্ষেপগুলো জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে।
মানুষের মতো রাষ্ট্রেরও জন্মের পর বিকাশ এবং বিনাশ আছে। জন্মকালীন দুর্বলতাও থাকে, সেই দুর্বলতা দূর করা দরকার। কিন্তু জন্মটাকে অপমান ও অস্বীকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সে ধরনের ঘটনাই ঘটেছে এবার। নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টার কারণে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে সনদ প্রণয়ন ও স্বাক্ষর-প্রক্রিয়ায়।
এসব বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এর মধ্যে ছয়টি কমিশনের প্রতিবেদনের ছাপানো অনুলিপি সব রাজনৈতিক দলের কাছে পাঠানো হয়। এরপর ৫ মার্চ পুলিশ সংস্কার কমিশন ব্যতীত অপর পাঁচটি কমিশনের প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ স্প্রেডশিট আকারে ৩৭টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কারবিষয়ক ৭০টি, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারবিষয়ক ২৭টি, বিচার বিভাগ সংস্কারবিষয়ক ২৩টি, জনপ্রশাসন সংস্কারবিষয়ক ২৬টি ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারবিষয়ক ২০টি সুপারিশ ছিল। এসব সুপারিশের ওপর মোট ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের মতামত কমিশনের কাছে পাঠায়। এরপর শুরু হয় দফায় দফায় আলোচনা। ওই আলোচনার ভিত্তিতে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের ভিন্নমতসহ ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ প্রণীত হয়। প্রশ্ন উঠেছে জুলাই সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়ে। আলোচনার ভিত্তিতে একমত হওয়া বিষয়গুলো সনদে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নাকি ভিন্নমতগুলোও থাকবে, ভিন্নমতের বিষয়ে চূড়ান্ত ভিন্নমত এবং আপত্তি সত্ত্বেও সম্মতির বিষয়গুলো থাকবে কি না, তা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়। এর ফলাফলস্বরূপ ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ কিছু বিষয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও জোটের ভিন্নমতসহ প্রণীত হয়। এর পরের পদক্ষেপ ছিল সনদে স্বাক্ষর করা এবং বাস্তবায়ন করা। এটা নিয়েই বিতর্ক তীব্র রূপ নিয়েছে। বিতর্কের অন্যতম বিষয় হলো, জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়া বা সংবিধানের ওপর স্থান দেওয়া হবে কি? এই বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দল ও ব্যক্তির অভিমত ছিল, জুলাই সনদকে কোনোভাবেই সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া উচিত হবে না। জুলাই সনদ কোনো আইন নয়। এটি একটি পলিটিক্যাল চার্টার বা চুক্তি, যা রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার কথা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বড় ঘটনা। ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ নাগরিকসহ বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে এ গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে যাত্রা শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
ফলে জুলাই সনদ একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে পারে এবং সেই দাবিটি খুবই যৌক্তিক। তবে কোনোভাবেই এর সঙ্গে আইন বা সংবিধানকে একাকার করে ফেলা ঠিক নয়। এর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে- সনদকে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া। পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সংসদ সংবিধান সংশোধন করে সংবিধানের কোনো একটি তফসিলে এটিকে রেফারেন্স হিসেবে রাখবেন। কিন্তু কোনোভাবেই জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া বা সেটিকে আইন হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, আমাদের সংবিধানে কিছু দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা আছে; কিন্তু সংবিধান স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছে এ কথা ঠিক নয় এবং ইতিহাসসম্মতও নয়। গণতান্ত্রিক সংবিধান আছে, এমন কিছু দেশেও স্বৈরাচারী সরকার বা সরকারপ্রধানের জনগণের ভোটেই ক্ষমতাসীন হয়েছে। বাংলাদেশে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরের ১৫-১৬ বছরে যা হয়েছে তাকে ‘ডেমোক্রেটিক ব্যাকস্লাইডিং’ বলা যায়। এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের শাসন স্বৈরাচারী শাসনে পরিণত হয়। ফলে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করার নামে সংবিধান পাল্টে ফেলার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
এই পরিস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে সংশোধিত খসড়ায় মতামতের প্রতিফলন না থাকায় সনদে স্বাক্ষর করেনি বামধারার চারটি দল। দলগুলো হলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ। কেন তারা জুলাই সনদে সই করবে না, তার কারণগুলো সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছে তারা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, জুলাই সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি, তাদের পক্ষ থেকে সংশোধনীগুলো সন্নিবেশিত হয়নি। তাদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্টগুলোর কারণও যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।
জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এর পটভূমিতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা খসড়া সনদে উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত সনদে ১০৬ অনুচ্ছেদের কথা বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি ‘সংবিধানে বিদ্যমান চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এবং ১৫০(২) অনুচ্ছেদের ক্রান্তিকালীন বিধানের তফসিল পরিবর্তনে সম্মতি প্রদান ও আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না- এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করতে হয়, এমন কোনো সনদে ভিন্নমত দিয়ে আমরা স্বাক্ষর করতে পারি না।’ সনদের অঙ্গিকারনামার ২ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তাহলে ভিন্নমতগুলোর কী হবে? আর ৩ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে যে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করব না, উপরন্তু উক্ত সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করব। ফলে তারা প্রশ্ন তুলেছে, আমরা কি বর্তমান দিয়ে ভবিষ্যতের পথ রুদ্ধ করব। আমাদের কোনো ভুল আর দুর্বলতা কি সংশোধন করা যাবে না? এটি তো জুলাই চেতনারই বিরুদ্ধে চলে যায়। পরে দেখা গেল এনসিপিও স্বাক্ষর করল না।
স্বাক্ষর হলো, আনুষ্ঠানিকতা হলো এখন অপেক্ষা গণতন্ত্রের। যারা স্বাক্ষর করলেন না তাদের দায় কম, কিন্তু যারা স্বাক্ষর করলেন তাদের দায়িত্ব নিতে হবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার। স্বৈরশাসনের বিপরীতে দলিল কোনো কাজের জিনিস নয়, বহুবার তা প্রমাণিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন পারে স্বৈরশাসক হয়ে ওঠা প্রতিরোধ করতে। আগামী দিনে সেটিই করতে হবে দেশের জনগণকে।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]


