দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে তারেক রহমানের দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে- এমন প্রত্যাশা যেমন অনেকে করছেন, তেমনি শঙ্কাও কম নয়। তিনি শুধু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উত্তরাধিকার ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবেও দেশের এক প্রতীকী চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু প্রবাসের নিরাপদ পরিসর থেকে বাস্তব রাজনীতির কঠিন অঙ্গনে ফিরে আসা কখনোই সহজ নয়। দীর্ঘ সময়ের অনুপস্থিতি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের রূপান্তর ও প্রজন্মের মানসিকতার পরিবর্তন- সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সামনে এখন এক বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি সময়।
প্রথম চ্যালেঞ্জটি হবে রাজনৈতিক বৈধতা ও জন-আস্থার পুনর্গঠন। প্রায় দেড় যুগ ধরে দেশের বাইরে থাকার কারণে জনগণের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, তার সরাসরি নেতৃত্ব বা মাঠের রাজনীতি দেখেনি। এ প্রজন্মের কাছে তার পরিচিতি মূলত পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় সীমাবদ্ধ। অথচ রাজনীতিতে বিশ্বাস জন্মে মানুষের সরাসরি সংস্পর্শে- হাত মেলানো, কথা বলা, শোনা ও পাশে থাকা দিয়ে। তাই দেশে ফিরে তারেক রহমানকে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে, তিনি শুধু রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নন, বরং নিজস্ব দর্শন ও কর্মদক্ষতায় নেতৃত্ব দিতে সক্ষম একজন রাজনীতিক।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন। বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে দমন-পীড়ন, মামলা ও রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে থেকেছে। অনেক জেলায় সংগঠন ভেঙে পড়েছে, কর্মীদের মনোবল দুর্বল হয়েছে, আবার কেউ কেউ রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছেন। অনেক বছর হলো, বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় না।
এই পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন নেতৃত্বের শৃঙ্খলা, প্রেরণা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব। তারেক রহমানকে শুধু পুরোনো নেতৃত্বের ওপর নির্ভর না করে, তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণের জন্য জায়গা তৈরি করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে না নিতে পারলে বিএনপি হয়তো অতীতের স্মৃতিচারণে বেঁচে থাকবে, কিন্তু ভবিষ্যতের রাজনীতি গড়ে তুলতে পারবে না।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো আদর্শিক স্পষ্টতা ও নীতিনির্ধারণ। বিএনপি জন্মলগ্ন থেকেই গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে তার মূল দর্শন হিসেবে তুলে ধরেছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দর্শনের প্রয়োগে ঘাটতি দেখা গেছে। জনগণ এখন বিকল্প রাষ্ট্রদর্শন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা দেখতে চায়। তারা জানতে চায়- বিএনপি ক্ষমতায় এলে কেমন হবে তাদের শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিক্ষা, মানবাধিকার ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সুস্পষ্টভাবে হাজির করা যায়, তবে বিএনপির রাজনীতি নতুন প্রাসঙ্গিকতা পেতে পারে। অন্যথায় ‘অতীতের পুনরাবৃত্তি’ হিসেবে দলের ভাবমূর্তি থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।
চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক আস্থা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার রায় ও দীর্ঘ প্রবাসজীবন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার ভাবমূর্তিকে জটিল করেছে। অথচ বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক সমর্থন যেকোনো দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে- বিশেষ করে মানবাধিকার, নির্বাচন ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে। তারেক রহমানকে তাই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তিনি সংস্কারমুখী, সংলাপনির্ভর ও গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি পান।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখন কঠিন। রাজনীতির ক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধ, সংগঠনগুলো কার্যত নিষ্ক্রিয়, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের একাংশে এখনো ফ্যাসিবাদের অনুসারীরা সক্রিয়। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ভোটাধিকারের আন্দোলনের আহ্বান দিয়ে নয়, বরং সংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। তারেক রহমানকে আন্দোলনের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণ, চিন্তাশীল রাজনীতি ও বিকল্প প্রশাসনিক কাঠামোর ধারণা তুলে ধরতে হবে- যা মানুষকে আশা ও ভরসা দিতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবশ্য সময়ের পরিবর্তন। তার অনুপস্থিতির বছরগুলোতে বাংলাদেশে সমাজ, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও জনমানস ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। ডিজিটাল যোগাযোগ আজ রাজনীতির ধরন পাল্টে দিয়েছে, নাগরিকরা আগের চেয়ে অনেক বেশি তথ্য সচেতন ও বাস্তববাদী। তরুণ প্রজন্ম আবেগ নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা স্বচ্ছ নেতৃত্ব, দক্ষ প্রশাসন ও ন্যায্য অর্থনৈতিক কাঠামো প্রত্যাশা করে। তাই তারেক রহমান যদি এই প্রজন্মের মন জয় করতে চান, তবে তাকে হতে হবে আধুনিক, চিন্তাশীল ও বিতর্কে অংশগ্রহণে আগ্রহী এক নেতা- যিনি জনগণের কথা শুনতে পারেন, নতুন প্রজন্মকে অংশীদার করতে পারেন এবং রাজনীতিকে আস্থা ও যুক্তির জায়গায় ফিরিয়ে আনতে পারেন।
তারেক রহমানের ফিরে আসা নিঃসন্দেহে বিএনপির রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘ প্রবাসজীবনে পর দেশে তার উপস্থিতি দলকে নতুন উদ্দীপনা দিতে পারে। কিন্তু যদি এই ফেরা শুধু আবেগের রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অচিরেই ক্লান্ত হয়ে পড়বে। বরং তার প্রকৃত শক্তি হবে আত্মসমালোচনা, দলের পুনর্গঠন এবং জনগণের সঙ্গে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি গড়ে তোলার সক্ষমতা। রাজনীতিতে ফিরে আসা মানে শুধু শারীরিক প্রত্যাবর্তন নয়- এটি মানসিক ও দার্শনিক পুনর্জন্মও বটে।
বাংলাদেশ আজ এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে আছে। মানুষ পরিবর্তন চায়, কিন্তু ভয়ও পায়। তারা এমন এক নেতৃত্ব খুঁজছে, যিনি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেবেন, ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের রাজনীতি করবেন। তারেক রহমান যদি সেই দায়িত্ব নিতে পারেন, যদি নিজের রাজনীতিকে আধুনিকতা, সংলাপ ও জন-আস্থার ভিত্তিতে পুনর্গঠন করতে পারেন, তবে তার ফেরা শুধু একজন নেতার প্রত্যাবর্তন হবে না- বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রে এক নতুন সম্ভাবনার সূচনাও ঘটাতে পারে।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক


