বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে গণতন্ত্রের চর্চা ধারাবাহিক ও কার্যকর রয়েছে স্বাধীনতার লগ্ন থেকেই। (যদিও ‘আয়রন লেডি’খ্যাত ইন্দিরা গান্ধী তার শাসনামলে একবার ‘জরুরি অবস্থা’ জারি করে এর ছন্দপতন ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে তাকে এর প্রায়শ্চিত্তও করতে হয়েছিল।)
ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত আছে, যখন রাজনৈতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের প্রতি অসামান্য সম্মান প্রদর্শন করেছে। সেই মুহূর্তগুলো শুধু সৌজন্য প্রকাশ ছিল না, বরং গণতন্ত্রের ভিতকে দৃঢ় করার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। অটল বিহারি বাজপেয়ি, মনমোহন সিং, এল কে আদবানি কিংবা নরেন্দ্র মোদি- প্রত্যেকেই কখনো না কখনো বিরোধী পক্ষকে সম্মান জানিয়ে ভারতের সংসদীয় সংস্কৃতিকে আরও উজ্জ্বল করেছেন। এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। কেননা, আমাদের গণতন্ত্রের বিকাশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পারস্পরিক আস্থা ও সহাবস্থান ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।
ভারতের সংসদে অটল বিহারি বাজপেয়ি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি সরকারে থাকুন বা বিরোধী দলে- সংসদের মর্যাদা রক্ষা করেছেন নির্ভীকভাবে। ১৯৯৬ সালে তিনি যখন স্বল্প সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন, বিরোধী দলগুলোর তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও সংসদে বলেছিলেন, ‘সংসদে বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণ হয় না।’ পরবর্তীকালে তিনি নিজে বিরোধী নেতা থাকাকালেও শাসক দলের সাফল্যকে স্বীকার করতে কার্পণ্য করেননি। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও তাকে ‘দেশপ্রেমিক নারী’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীও তার কূটনৈতিক দক্ষতার প্রশংসা করে পারস্পরিক শ্রদ্ধার নজির স্থাপন করেছিলেন।
মনমোহন সিং ও এল কে আদবানির সম্পর্কও এক ভিন্ন মাত্রার ছিল। রাজনৈতিক আদর্শে বিপরীত মেরুর হলেও, মনমোহন সিং সংসদে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘আমাদের মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু আদবানিজির প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে।’ এ বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত সৌজন্য নয়, বরং ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বিরোধী নেতার মর্যাদা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তারই স্বীকৃতি। একইভাবে, নরেন্দ্র মোদি ২০২৪ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘মনমোহন সিং হুইলচেয়ারে করেও সংসদে এসে ভোট দিয়েছিলেন- এটাই দায়িত্ববোধের উদাহরণ।’ এ বক্তব্যে যে মানবিক স্বীকৃতি প্রকাশ পায়, তা শুধু একজন রাজনীতিবিদের প্রতি নয়, বরং সংসদীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ।
এ উদাহরণগুলো দেখায়, গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতার খেলা নয়; এটি আচরণের, আস্থার ও সম্মানের এক জটিল সমীকরণ। যে দেশে সরকার ও বিরোধী দল একে অপরের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে সম্মান জানাতে পারে, সেখানে জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর স্থায়ী হয়। গণতন্ত্র তখন কেবল শাসনব্যবস্থার কাঠামো নয় বরং একটি সংস্কৃতি হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এ জায়গাতেই চ্যালেঞ্জের মুখে। আমাদের নির্বাচনি রাজনীতি প্রায়ই এমনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যেখানে জয় মানেই সব কিছু পাওয়া এবং পরাজয় মানেই রাজনৈতিকভাবে মুছে যাওয়া। সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থান অনেক সময় সহাবস্থানের বদলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও ঘনীভূত করে। সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অথচ সংসদই সেই জায়গা, যেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমতকে সংঘাত নয়, যুক্তি ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ তৈরি হয়।
এখানে ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য এক অনুপ্রেরণা হতে পারে। ভারতেও রাজনৈতিক বিভাজন কম নয়, কিন্তু সংসদের ভেতরে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সৌজন্য রক্ষা করা হয়। বিরোধী দলকে বক্তৃতার সুযোগ দেওয়া, তাদের প্রস্তাব শুনে বিবেচনা করা, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা- এসবই সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ। এমনকি সরকার পরিবর্তনের পরও অনেক সময় পূর্ববর্তী সরকারের গৃহীত নীতিগুলোকে ধারাবাহিকতার স্বার্থে অব্যাহত রাখা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংসদকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হলে, এই ‘পারস্পরিক সম্মান’-এর সংস্কৃতি গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি। বিরোধী দলকে শুধু সমালোচক বা শত্রু হিসেবে দেখা নয়, বরং বিকল্প মত ও পরামর্শদাতা হিসেবে গ্রহণ করা- এটিই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব হলো, সংসদ বর্জন বা হট্টগোলের বদলে সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে জনগণের মতামত তুলে ধরা। যদি উভয় পক্ষই সংসদকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ নয় বরং জাতীয় স্বার্থের মঞ্চ হিসেবে গ্রহণ করে, তবে রাজনৈতিক আস্থার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সমাজ ও নাগরিক সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তারা যদি সংসদীয় সৌজন্য ও যুক্তিপূর্ণ বিতর্ককে উৎসাহিত করে, তাহলে রাজনীতিবিদরাও ধীরে ধীরে আচরণগত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হবেন। ভারতের সংসদে বাজপেয়ি বা মনমোহন সিংয়ের বক্তৃতা আজও যেমন উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়, তেমনি বাংলাদেশের সংসদেও যদি যুক্তি, তথ্য ও পরস্পরের প্রতি সম্মানভিত্তিক বিতর্কের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক শিক্ষার উৎস হয়ে থাকবে।
আগামী সংসদ নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হোক না কেন, সেটি যদি বিরোধীপক্ষকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয় বরং অংশীদার হিসেবে দেখে, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেকাংশে কমে আসবে। কারণ জনগণ তখন বুঝবে, সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করছে- শুধু ক্ষমতা দখলের জন্য নয়। একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব থাকবে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, কিন্তু সেই সমালোচনা যেন প্রতিশোধ বা ধ্বংসাত্মক মনোভাবের জায়গা থেকে না আসে।
বাংলাদেশের রাজনীতি অনেক পথ পেরিয়েছে। এক সময় যে বিরোধিতা অস্তিত্ব সংকট তৈরি করত, আজ তা ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে- তবে এখনো অনেক পথ বাকি। এই পথের দিশা পেতে হলে ভারতের সংসদীয় সংস্কৃতি আমাদের জন্য এক দর্পণ হতে পারে। রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকবেই, কিন্তু সেটি যদি শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সম্মানের সীমার ভেতরে থাকে, তবেই গণতন্ত্র বিকশিত হবে।
শেষ পর্যন্ত, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই যে- এটি মতভেদকে ভয় পায় না বরং তাকে সংলাপের শক্তিতে পরিণত করে। নির্বাচনের পর সরকার ও বিরোধী দল যদি সেই সংলাপের সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের সংসদ কেবল নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র নয়, জাতির ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠবে। ভারতীয় সংসদের সেই সম্মান, শালীনতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকে আমরা যদি উদাহরণ হিসেবে নিতে পারি, তবে হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ রাজনীতি আর সংঘাতের নয়, সহযোগিতা ও আস্থার নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
এটাই আজকের সময়ের দাবি- রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদকে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র বেঁচে থাকে তখনই, যখন সরকার ও বিরোধী উভয়েই একে অপরের অস্তিত্বকে সম্মান করে।
লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক
.jpg)
