আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসির সফরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যা ঘটেছে, তা একটি ব্যর্থ ইভেন্টের সীমা ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল প্রশাসনের জন্য এক গভীর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিওনেল মেসির মতো বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ আইকনকে ঘিরে যে উত্তেজনা ও আবেগ তৈরি হয়েছিল, তার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনে দর্শকরা মেসির ছায়ামাত্র দেখতে পাননি।…

গত ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসির সফরে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যা ঘটেছে, তা একটি ব্যর্থ ইভেন্টের সীমা ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল প্রশাসনের জন্য এক গভীর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লিওনেল মেসির মতো বিশ্বফুটবলের সর্বোচ্চ আইকনকে ঘিরে যে উত্তেজনা ও আবেগ তৈরি হয়েছিল, তার যথাযথ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন। ফলত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উৎসবের আবহ রূপ নেয় বিশৃঙ্খলা, ভাঙচুর ও নিরাপত্তাহীনতায়। ঘটনার পর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার ও পুলিশের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছিল। সেই চাপের মুখেই ঘটনার ৭২ ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার প্রশাসনিক স্তরে কার্যত ঝড় বইয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এখানে উল্লেখ করা দরকার, মেসির সফর কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের হাত থেকে কার্যত ছিনিয়ে নিয়েছিল মমতা সরকারের কেষ্টবিষ্টুরা। গোলমালের সূত্রপাত সেখান থেকেই। হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কিনে দর্শকরা মেসির ছায়ামাত্র দেখতে পাননি। তাকে সর্বক্ষণ ঘিরে ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে নেতা-মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরাই।
মঙ্গলবার প্রশাসনের অন্দরমহলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং রাজ্য রাজনীতিতেও তৎপরতা দেখা দেয়। যুবভারতী ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে হাইকোর্টে দুটি জনস্বার্থ মামলা হয়েছে। সরকারের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল, যাতে আদালতে বলা যায়, কমিটি নিরপেক্ষ এবং তার সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ঘটনার অব্যবহিত পরেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রাক্তন বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। রবিবার থেকেই কাজ শুরু করে কমিটি। সোমবার রাতেই জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে সাংবাদিক বৈঠক করবেন কমিটির প্রধান। সেই বৈঠকেই জানানো হয়, কমিটি তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট রাজ্য সরকারকে দিয়েছে এবং বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠনের সুপারিশ করেছে। এ তথ্য প্রকাশ্যে আসার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই দ্রুত পদক্ষেপ নেয় রাজ্য সরকার। রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি রাজীব কুমার এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনার মুকেশ কুমারকে শো-কজ নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশ জারি করেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ। যিনি ওই তদন্ত কমিটির সদস্যও। একই সঙ্গে বিধাননগর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার অনীশ সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তদন্ত চলাকালীন তাকে সাসপেন্ড করা হয়। যুবকল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তরের প্রধান সচিব রাজেশ কুমার সিংহকেও শো-কজ করা হয়।
এ ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনে আসে আরেকটি নাটকীয় মোড়। পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস মুখ্যমন্ত্রীকে একটি চিঠি লিখে জানান, যুবভারতী কাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তিনি ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান। চিঠিটির তারিখ ছিল সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর। নবান্ন থেকে জারি করা বিবৃতিতে জানানো হয়, মুখ্যমন্ত্রী সে প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্রীড়া দপ্তর সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে থাকবে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, একটি রাজ্যের মন্ত্রীর পদত্যাগই সবচেয়ে বড় ঘটনা। কিন্তু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রকৃতপক্ষে আরও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো রাজ্য পুলিশের ডিজিকে শো-কজ করা। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ইতিহাসে কর্মরত ডিজিকে এভাবে শো-কজ করা কার্যত নজিরবিহীন। ডিজি পদে থেকেই শো-কজ নোটিশ পাওয়া মানে তা তার সার্ভিস রেকর্ডে স্থায়ী ছাপ রেখে যাবে। সেদিক থেকে এটি রাজীব কুমারের মতো অভিজ্ঞ আইপিএস অফিসারের জন্য
এ ঘটনার গুরুত্ব আরও বাড়ে রাজীব কুমারের প্রশাসনিক অবস্থান বিচার করলে। গত প্রায় ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এক নাম। আমলা থেকে মন্ত্রী- সবাই তাকে সমীহ করে চলতেন। মুখ্যমন্ত্রীর আস্থাভাজন হিসেবে তার অবস্থান কতটা দৃঢ় ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০১৯ সালের আগে চিটফান্ড কাণ্ডে। সিবিআই তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে গেলে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী পথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন। ধর্মতলায় রাতভর ধরনায় বসেন এবং পরদিন সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে রাজ্য সরকার। তাই প্রশ্ন উঠছেই- এমন কী ঘটল যে সেই রাজীব কুমারের বিরুদ্ধেই এবার এত কড়া পদক্ষেপ নিলেন মুখ্যমন্ত্রী?
উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় যুবভারতীর ঘটনাতেই। শনিবার যে বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, তার দায় পুলিশ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না; এমনটাই মত বহু প্রাক্তন আমলা ও পুলিশকর্তার। সরকার প্রাথমিকভাবে আয়োজকদের দায়ী করলেও, সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হয়নি। তাদের যুক্তি, মেসির মতো বিশ্বতারকার উপস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুরোপুরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কে আয়োজক, তা গৌণ। প্রাসঙ্গিক একটাই বিষয়, পাবলিক অর্ডার বজায় রাখা। প্রশাসনের অন্দরমহলেই অভিযোগ, সেই জায়গাতেই বড় ব্যর্থতা হয়েছে। শুধু বিধাননগর কমিশনারেট নয়, সামগ্রিকভাবে রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ স্তরও দায় এড়াতে পারে না। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, সেদিন রাজীব কুমার পুলিশের উর্দিতে ছিলেন না, ছিলেন সিভিল ড্রেসে। এক অবসরপ্রাপ্ত আমলার কথায়, ‘এত বড় জনসমাগমে রাজ্য পুলিশের সর্বোচ্চ কর্তার উর্দিতে থাকা উচিত ছিল। উর্দির উপস্থিতিই তো শৃঙ্খলার বার্তা দেয়।’
নবান্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, কয়েক মাস ধরেই রাজীব কুমারকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মনোভাব কিছুটা বদলাচ্ছিল। আগে যাকে নবান্নে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দেখা যেত, সাম্প্রতিক সময়ে সে দৃশ্য কমে এসেছে। এমনিতেই তার ডিজি পদে মেয়াদ প্রায় শেষের দিকে। পাশাপাশি, অনুব্রত মণ্ডল কাণ্ডসহ একাধিক বিষয়ে মতান্তরের কথাও প্রশাসনিক মহলে শোনা যাচ্ছিল। অনেকের ধারণা, এ পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী তাকে তার অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়ার একটি সুযোগ খুঁজছিলেন। একসময় যার জন্য ধরনায় বসেছিলেন, শো-কজ করে সেই অতীত থেকে অনেকটাই সরে এলেন তিনি।
তবে ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তুলনায় নরম অবস্থান কেন? ক্রীড়া দপ্তর মুখ্যমন্ত্রীর হাতে নেওয়া হলেও, তাকে সম্মানজনকভাবে পদ ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক মহলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, অরূপ বিশ্বাস ‘ঘরের লোক’। তাকে কড়া বার্তা দিলেই রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে যাবে। দ্বিতীয়ত, মেসির ইভেন্টের সরাসরি আয়োজক ক্রীড়া দপ্তর ছিল না। সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলেও, তার দায় এককভাবে মন্ত্রীর ওপর চাপানো কঠিন। সে কারণের শান্তির ধরনেও পার্থক্য।
যুবভারতীতে লিওনেল মেসির সফরকে কেন্দ্র করে শতদ্রু দত্তের সংস্থার তরফে ‘লিয়াঁজো অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পান লাল্টু দাস। পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ভার ছিল মূলত তার হাতেই। যদিও লাল্টুর দাবি, তিনি আদৌ শতদ্রু দত্তের সংস্থার কর্মী নন। তার বক্তব্য, তিনি কেবল ‘বন্ধু’ হিসেবে নানা কাজকর্মে সহায়তা করেছেন।
কিন্তু গত শনিবার মেসির সফরের যাবতীয় ব্যবস্থাপনার নাট-বল্টু কার্যত লাল্টুর হাতেই ছিল। অতিরিক্ত জনসংখ্যা প্রবেশের দায়ও তার ওপরেই পড়ে। তিনি প্রশাসনের সঙ্গে সব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং কলকাতায় পরিচিত মুখ হিসেবে রাজ্য মন্ত্রীরাও তাকে চিনতেন।
সোমবার লাল্টু স্বীকার করেছেন, মেসির অনুষ্ঠান সংক্রান্ত বৈঠক ও প্রস্তুতিতে তার অপেশাদারত্ব ছিল। যদিও তিনি শতদ্রু দত্তের সংস্থার কর্মচারী নন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় ও চিঠিপত্র পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে নিয়মিত ছিলেন। নিজেকে ‘শতদ্রুর বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য, ২০২২ সালে কাতারে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে গিয়েছিলেন প্রাক্তন ফুটবলার লাল্টু। কলকাতা ময়দানের সঙ্গে যুক্ত মহলের দাবি, সেখানে তার সময় কেটেছিল খানিক বিলাসেই। নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ যে যথেষ্ট মসৃণ, তা সর্বজনবিদিত। পুলিশ সূত্রের খবর, বিধাননগর কমিশনারেট লাল্টুকেও ডেকে পাঠাতে পারে। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, মেসিকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলার মধ্যে অতিরিক্ত লোক ঢোকানোর ক্ষেত্রে তিনি অন্যতম মূল ভূমিকা নিয়েছিলেন। শতদ্রু দত্তকে যারা কাছ থেকে চেনেন, তারা জানেন তিনি প্রকৃত অর্থেই ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। একই সঙ্গে তিনি স্যাঙাত-নির্ভর ব্যবস্থাপনাতেও বিশ্বাসী। এ স্যাঙাতেরা সময়ে, অসময়ে তাকে নানা পরামর্শ বা আশ্বাস দিয়ে থাকেন। সেই তালিকায় যেমন লাল্টু আছেন, তেমনই আছেন আরও কয়েকজন। যুবভারতীর এ কেলেঙ্কারিতেও সেই স্যাঙাতদের ছায়া স্পষ্ট। সূত্রের খবর, মেসির অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রাথমিকভাবে মুম্বাইয়ের একটি বড়, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছিলেন শতদ্রু। তাদের দক্ষতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারিশ্রমিকও ছিল আকাশছোঁয়া। অর্থের অঙ্ক দেখে শতদ্রু যখন দোনামনায়, তখন তার কিছু স্যাঙাত পরামর্শ দেন- রাজ্য সরকার তো প্রয়োজনীয় কাজ করবেই, বাকিটা ‘স্থানীয় প্রতিভা’ দিয়েই সামলে নেওয়া যাবে। তাতে খরচ কম হবে, লাভের অঙ্ক বাড়বে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক


