যেসব আবাসিক এলাকায় সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে, সেসব জায়গায় অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কেননা অপরাধীরা যদি জেনে যায় সুনির্দিষ্ট কোনো এলাকা পুরোপুরি সিসিটিভি ফুটেজ দ্বারা আচ্ছাদিত, তাহলে ওই এলাকায় অপরাধীদের আনাগোনা একেবারে কমে যায়। কাজেই অপরাধ প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।…

![]()
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টজনেরা অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। পত্রিকার পাতা ওল্টালেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া অপরাধের খবরাখবর উঠে আসছে। তবে সব খবর যে পত্রিকার পাতায় উঠে আসছে, ব্যাপারটি কিন্তু আদতে তা নয়। সুতরাং অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা কিন্তু পত্রিকায় পাতায় উঠে আসছে না। কেউ ভয়ে কথা বলছে না, পুলিশের কাছে মামলা দিচ্ছে না, আবার অনেক সময় দেখা যায় সালিশ-মীমাংসার মাধ্যমে অপরাধের ঘটনাগুলো নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে; যদিও এর সংখ্যা একেবারে কম। অর্থাৎ অপরাধের প্রকৃত চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসছে না, অপরাধের একটি বিরাট অংশ আমাদের অজনাই থেকে যাচ্ছে। তথাপি দেশজুড়ে অপরাধের যে ভয়াবহতা পরিলক্ষিত হচ্ছে তার থেকে উত্তরণের জন্য অপরাধ প্রতিকারের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এ ছাড়া কোনোভাবেই জনমনে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
তরুণরা আমাদের আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তরুণদের ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তরুণদের, বিশেষ করে কিশোর অপরাধের ভয়াবহ চিত্র আমাদের প্রতিনিয়ত আতঙ্কিত করছে। কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা থেকে নিবৃত্ত করতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অত্যন্ত কার্যকর। অনেক পরিবারেই দেখা যায়, ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে পরিবার থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানে কোনোরূপ খোঁজখবর রাখা হয় না। পরিবার থেকে সন্তানদের ওপর সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা কিংবা তদারকি করা প্রতিরোধের মধ্যেই পড়ে। তরুণদের স্কুলিং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না কিংবা সন্তানরা নিয়মিত স্কুলে ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে কি না প্রভৃতি বিষয়ে পরিবার থেকে তদারিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেসব পরিবার থেকে এসব ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হয় না; ওই পরিবারের শিশুদের মধ্যে বিচ্যুতিসম্পন্ন আচরণের বহিঃপ্রকাশ প্রকট আকারে দেখা যায়। স্কুল থেকে পালিয়ে বাচ্চারা কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে, কাদের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে সামগ্রিক বিষয়ে খবরাখবর রাখা পরিবারের দায়িত্ব। যেসব পরিবারে এসব বিষয়ে গাফিলতি দেখা যায় ওই পরিবারের সন্তানরাই পথচ্যুত হয়ে অপরাধপ্রবণতায় জড়িয়ে পড়ছে। কাজেই অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধে পরিবার থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তরুণদের অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখার নিমিত্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তরুণদের সম্পর্কও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
সমাজে মাদকের ভয়াবহতা প্রতিরোধে সমাজ থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদকের ভয়াবহতায় উঠতি বয়সী তরুণদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা দেখা দিয়েছে। সমাজে যারা মাদক সরবরাহ করছে, তারা কিন্তু সমাজের বাইরের কেউ নয়। তাদের যথাযথভাবে চিহ্নিত করে মাদকের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে অবগত করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণই পারে সমাজ থেকে মাদককে চিরতরে দূর করতে। প্রয়োজনে যারা মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও মাদক বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত, তাদের প্রয়োজনীয় কাজে সম্পৃক্ত করে সমাজ থেকে মাদকের সরবরাহ দূর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণই পারে মাদকমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। এ লক্ষ্যে সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিভিন্ন ইস্যুতে অপরাধের যোগসূত্র লক্ষ করা যায়। যেমন, যে পরিবারের সদস্যরা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে জড়ালে পরবর্তী সময়ে ওই পরিবারের সদস্যরাও অপরাধপ্রবণতায় জড়িয়ে পড়ে। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে আমাদের চারপাশে। কাজেই কারও সঙ্গে কোনো ধরনের সামাজিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার আগে ওই পরিবারের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে সচেতন হয়েই সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা কিংবা প্রতিস্থাপন করা উচিত। অন্যথায় পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় কিংবা নিয়মিত মেলামেশার কারণে একজন স্বাভাবিক মানুষের মধ্যে অপরাধ করার নানা বিষয় জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে নারী অপরাধীদের প্রকৃতি ও কার্যকারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ নারী তার পার্টনারদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে অপরাধপ্রবণতায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। কাজেই কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা কিংবা বন্ধুত্ব করার আগে সব বিষয় জেনে নিয়েই সম্পর্কে যাওয়া উচিত। এ ছাড়া নানা ধরনের প্রতিকূলতার পাশাপাশি অপরাধপ্রবণতায় জড়িয়ে পড়ার অজস্র উদাহরণ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে। অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকারের বরাদ্দ তেমন একটা চোখে পড়ে না। অথচ উন্নত বিশ্বে কিংবা কল্যাণকর রাষ্ট্রে অপরাধ প্রতিকারের তুলনায় অপরাধ প্রতিরোধে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয় অপরাধ প্রতিরোধের জন্য। বাংলাদেশে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের পক্ষ থেকে সামান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও সেসব উল্লেখযোগ্য নয়। অবশ্য পুলিশের যে কাজের প্রেশার, সে সাপেক্ষে অপরাধ প্রতিরোধে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না বাহিনীর সদস্যদের পক্ষে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ছে, কেননা ঘটনা ঘটার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হয় না। সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে হলেও অপরাধ প্রতিরোধে উদ্যোগ গ্রহণ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে, বিশেষ বাহিনী গঠন করতে হবে, গবেষণার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট এলাকার অপরাধের ধরন, বৈচিত্র্য ও প্রকৃতি নিয়ে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। তাহলে খুব সহজেই অপরাধ প্রতিরোধের কৌশল রপ্ত করা সম্ভব হবে এবং কৌশলগুলো বাস্তবে রূপদান করাও সহজ হবে।
সামাজিকভাবে অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তদারকিতে কমিটি ও ইউনিট স্থাপন করতে হবে। সমাজের মানুষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ততার ভয়াবহতার স্বরূপ উন্মোচন করে তাদের মতামতের ভিত্তিতেই অপরাধ প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করার বিকল্প নেই। কেননা সমাজে যারা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন, তারা খুব সহজেই অপরাধ প্রতিরোধের সব পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকেন এবং অপরাধকে খুব সহজেই মোকাবিলা করার কৌশলও জানবেন। কাজেই তাদের মতামতের ভিত্তিতে সমাজে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় অপরাধকে প্রতিহত করা সম্ভব হবে না। উন্নত বিশ্বে পুলিশের এ ব্যবস্থাপনাকে ‘ওয়াচম্যান স্টাইল’ হিসেবে পরিগণিত করা হয়। অর্থাৎ কমিউনিটির জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পুলিশ কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থাপনাই ওয়াচম্যান স্টাইল। এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করা যায়। সিসিটিভি স্থাপন করে একটি এলাকাকে সুরক্ষা দেওয়া যায়। এ কারণেই দেখা যায়–যেসব আবাসিক এলাকায় সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে, সেসব জায়গায় অপরাধের হার তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কেননা অপরাধীরা যদি জেনে যায় সুনির্দিষ্ট কোনো এলাকা পুরোপুরি সিসিটিভি ফুটেজ দ্বারা আচ্ছাদিত, তাহলে ওই এলাকায় অপরাধীদের আনাগোনা একেবারে কমে যায়। আবার কেউ যদি অপরাধ করে ফেলে, তাহলে সিসিটিভি ফুটেজ দ্বারা সহজেই অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের কাছে সোপর্দ করা যায়। কাজেই অপরাধ প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্সের ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে। দেশে বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মানুষের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রদানে প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্স নিয়োগ দিচ্ছে এবং পালাক্রমে এ ধরনের উদ্যোগ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বেসরকারি ব্যাংক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে প্রাইভেট ফোর্সের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ লক্ষ করা যাচ্ছে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে, সরকারি ফোর্সের ওপর মানুষের আস্থাহীনতা এবং ফোর্সের অপ্রতুলতা। সংগত কারণেই মানুষ তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও সম্পদের সুরক্ষার জন্য প্রাইভেট সিকিউরিটি ফোর্সের ওপর নির্ভর করছে।
সর্বোপরি কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থাকে জোরদারকরণের মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা যায়। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল এজেন্ডা হচ্ছে–সমাজের প্রত্যেকেই পুলিশের ভূমিকা পালন করবে এবং সমাজে উদ্ভূত সমস্যাগুলো কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করবে। নিকটস্থ থানা-পুলিশকে অবগত করার মাধ্যমে কমিউনিটিতে সৃষ্ট অপরাধগুলোর নিষ্পত্তি কমিউনিটি পুলিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার বাসনাই অপরাধ প্রতিরোধকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলে। কাজেই অপরাধ প্রতিকারের তুলনায় অপরাধ প্রতিরোধে অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


