বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুসারে নববর্ষ পালিত হয়ে আসছে ভিন্ন ভিন্ন দেশে। বিশেষভাবে ইউরোপ-আমেরিকা তথা পাশ্চাত্যের দেশগুলো খ্রিষ্টীয় সাল অনুসরণ করে ১ জানুয়ারি তারিখের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার মেনে আনন্দ-পার্টি, আতশবাজি, নতুন বছরের সংকল্প ও ধর্মীয় প্রার্থনার মাধ্যমে পালন করে থাকে।
অপরদিকে, এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধানত বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড সৌর ও চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দিনে নববর্ষ পালন করে থাকে। যেমন- ১৪ এপ্রিল, বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখে নববর্ষ পালন করা হয় আমাদের দেশে।
এ উপলক্ষে শোভাযাত্রা, মেলা, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হালখাতা এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো বর্ণিল আয়োজনের মাধ্যমে। যা অতীতকে বিদায় জানিয়ে নতুন সমৃদ্ধি ও সুখ কামনা করে। তবে পয়লা জানুয়ারির নববর্ষ উদ্যাপনে বিশ্ব আজ যেন এককাতারে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তাছাড়া উৎসব মানেই এক ধরনের অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করায় ক্ষতি নেই তো কোনো।
একথা সর্বজনস্বীকৃত যে, সব নববর্ষ উদ্যাপনের মূলমন্ত্র হলো পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে অর্থাৎ অতীতের ভুলত্রুটি ও দুঃখ ভুলে নতুনকে বরণ করা। এজন্য নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুনভাবে বাঁচার আশা ও আকুতি নতুন সমৃদ্ধির রূপরেখা এঁকে যায় মনের অজান্তেই।
রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন,
‘তোমায় নতুন করেই পাবো
বলেই হারাই ক্ষণে ক্ষণ
ও মোর ভালোবাসার ধন-
ক্ষণকালের লীলার স্রোতে হও যে নিমগন…’
সময় এমনই এক নিমগ্ন পথের রেখা যে, সে ছুটে চলে নবজাতক শিশুর পায়ে ভর করে, কখনো বা হরিণের পায়ের ক্ষিপ্রতায়। বছর পার হয়ে আসে নতুন সময়। আমরাও এক বছরের জন্য আবার নতুন হয়ে উঠি। যেমন- পুরাতন হলুদ পাতা ঝরে গিয়ে বৃক্ষে আসে সবুজ পত্রালি- ঘাসে ঘাসে নবকিশলয়!
স্বদেশ, স্বভূমি, স্বজাতি- এক অদ্ভুত অনুভূতির মায়ার নাম। সময়ের ব্যবধানে স্বাধীন স্বদেশের মানচিত্রও পাল্টে যায়, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয় কখনো কখনো। ব্যক্তি-মানুষ, সংঘবদ্ধ সমাজ, রাষ্ট্রীয়বলয় ঘিরে আনন্দময়তায় বেঁচে থাকতে চায়। কাজেই নতুন বছর এলেই জীবনের উৎসবে তাকে বরণ করে নেয় নানা রঙে। এর নামই হয়তো জীবনের উদ্যাপন। যতক্ষণ বেঁচে আছি, ততক্ষণই জীবন!
স্বদেশ যেমন কম্পাস- দিক ঠিক করে দেয় কোন দিকে যেতে হবে, কোথায় নয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশের সূর্যসন্তানরা রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে ছিনিয়ে এনেছিল মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলবার অধিকার। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে আসাদের শার্ট পুনরায় রক্তাক্ত হয়েছিল।
পরিশেষে, মহান ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৫৪ বছর আগে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে, বাংলাদেশ যার নাম। ৩০ লাখ মানুষের রক্তস্রোত পেরিয়ে, ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহারানো যুদ্ধের তাণ্ডবলীলাময় হাহাকার ও উৎপীড়ন শেষে স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল একদিন এ আপামর বাঙালির। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দগ্ধ ভিটেবাড়ির পোড়ামাটিতে পুনরায় তুলেছি ঘর, উড়িয়ে দিয়েছিলাম একদা লাল-সবুজের পতাকায় মায়ের শাড়ির আঁচল।
অর্ধশতাব্দী পরে দেশটি যখন উন্নয়নের ধারায় মধ্যম আয়ের দেশের বৈশিষ্ট্য আত্মীকৃত করে উন্নত দেশের দিকে ধাবমান। ঠিক সেই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির শিকার হলো সেন্ট মার্টিনের গাঙ্গেয় এ সপ্রাণ সজল বদ্বীপ।
সব নববর্ষ উদ্যাপনের মূলমন্ত্র হলো পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে অর্থাৎ অতীতের ভুলত্রুটি ও দুঃখ ভুলে নতুনকে বরণ করা। এজন্য নতুন বছর মানেই নতুন স্বপ্ন, নতুনভাবে বাঁচার আশা ও আকুতি নতুন সমৃদ্ধির রূপরেখা এঁকে যায় মনের অজান্তেই।..
বাংলাদেশকে ফ্যাসিস্ট সরকারের তকমা দিয়ে সরকারকে হঠিয়ে ভূরাজনীতির শক্তিধর নায়করা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অছিলায় উন্নয়নের সব পথ রুদ্ধ করে রেখেছে ৫ আগস্টের পর থেকেই।
উপরন্তু দেশের জনগণের মধ্যে নতুনতর এক বিভাজন তৈরি করে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে সুজলা-সুফলা এ সোনার বাংলাকে। সাধারণ মানুষের নিরাপদ জীবনের স্বপ্ন ও আশা ধূলিসাৎ করে দিতেই যেন শত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। যার কোনোটির সুফল জনগণ এখনো অনুভব করতে পারল না।
দেশের অর্থনীতির চূড়ান্ত অব্যবস্থা, ব্যাংকগুলোর দেউলিয়াপনা- শেয়ারবাজার বায়ারলেস। মানলাম ফ্যাসিস্ট সরকার সব শূন্য করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই তো বৈষম্যবিরোধী এ পরিবর্তন। তবে আজও কেন মানুষ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে পথেঘাটে, চলনে-বলনে-কথনে?
কে দেবে এর জবাব?
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সহমর্মিতা নেই।
ব্যবসা-বাণিজ্য মুখথুবড়ে পড়েছে। অস্থিতিশীলতার অভিযোগে বিদেশি বিনিয়োগ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
একের পর এক গার্মেন্টস বন্ধ করে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন পার করছে।
মবতন্ত্র ও ভাঙচুর-সংস্কৃতির ভীতি ছড়িয়ে, বাংলা ভাষার শালীনতা বিবর্জিত খিস্তিখেউড় ও কদর্য গালিকে রাজনীতিকরণ এবং ন্যায়নীতিবহির্ভূত ভাষা ব্যবহারে দেশটির শিষ্টাচারের বার্তা সভ্য জাতিকে যেন উপহাস করে।
প্রকারান্তরে সাধারণ জনগণের মনে ভীতির সঞ্চার করে প্রতিবাদহীন করে রাখা এবং নিজেদের খেয়ালখুশি মতো দেশ পরিচালনা করা বর্তমান সময়ের অন্যতম সংস্কৃতি। যা ক্রমশ পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে আমাদের।
একাত্তরের মহান মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পরিয়ে অবমাননা করা, সম্মানিত শিক্ষকদের ছাত্রদের দ্বারা প্রহার করা, দেশের সুফি ও বাউলশিল্পীদের অপমান, চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া, মাজার সংস্কৃতিকে ঘিরে নিরন্ন মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করা নিত্যনৈমিত্তিক কাজে পরিণত হয়েছে। সর্বোপরি, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়ে কখনো কোনো জাতি সমুখ পানে এগোতে পেরেছে বলে জানা নেই আমার। এজন্য বোধ করি, টি এস এলিয়ট বলেছেন, যে জাতি তার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে স্মরণ করে না, সে জাতি পৃথিবীর বুকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতেও পারে না।
আমরাও আশা করব, অতীতের ভুলত্রুটি বিদায় দিয়ে নতুন বছর নিশ্চয় আমাদের কাছে নতুন হয়ে দেখা দেবে। তখন অনায়াস কণ্ঠে নিশ্চয় আমরা গেয়ে উঠব সেই অমৃত সংগীত…
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি
... … …
মা তোর বদন খানি মলিন হলে আমি নয়ন-
ও মা, আমি নয়ন জলে ভাসি॥
লেখক: কবি ও গবেষক, সাবেক চেয়ারম্যান, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, ঢাকা


