আমরা ভয় পেলে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে অথবা বিপদে পড়লে প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের কথা ভাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুলিশ প্রশাসন প্রকৃত অর্থে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মব কালচার পুলিশের ক্ষেত্রেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ যেখানে আকারে-ইঙ্গিতে অথবা প্রকাশ্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে; সেখানে সাধারণ মানুষ কার কাছে ভরসা পাবে, কার কাছে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজবে?- এটাই এখন কঠিন বাস্তবতা।…

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রায় প্রতিদিনই জোর দিয়ে বলছেন, এবারের জাতীয় নির্বাচন স্মরণকালের আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। ইতিহাসের সেরা জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করতে চান তিনি। যে নির্বাচনের পজিটিভ গল্প যুগের পর যুগ ধরে আলোচিত হবে। মানুষ বলবে, হ্যা, জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২০২৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে। এমন সুন্দর, আনন্দমুখর নির্বাচন আবার চাই। ২০২৬ সাল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা উঠলেই পজিটিভ দৃষ্টিকোণ থেকে ২০২৬ সাল আলোচিত হবে।
কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? অঙ্কের হিসেবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আর এক মাসও বাকি নেই। সময়ের তুলনায় সারা দেশে যেভাবে নির্বাচনি উৎসব শুরু হওয়ার কথা, কার্যত সে ধরনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। খোদ রাজধানীর পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নাই আর মাত্র এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে দেশে ইতিহাসের সেরা জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বরং জাতীয় নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখেই জাতীয় নির্বাচন হবে কি হবে না, এ নিয়ে এখনো চলছে জল্পনা-কল্পনা। চায়ের দোকান, অফিস-আদালত, পারিবারিক আড্ডা, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর দপ্তরেও চলছে ফিসফাস। ১২ ফেব্রুয়ারি আদৌ কি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আবারও জোর দিয়ে বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখেই উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে দেশজুড়ে ব্যাপক আয়োজন শুরু হয়েছে সরকারিভাবে। নির্বাচনের ক্ষণ গণনাও শুরু হয়ে গেছে। তবুও জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিশ্বাসের পারদ যেন স্থির থাকছে না। এই উঠছে, এই আবার নেমে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো বড় আয়োজনে ভয়-ভীতিমুক্ত পরিবেশ জরুরি। একটি সুন্দর, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো ভয়-ভীতিমুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ-পরিস্থিতি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জাতীয় নির্বাচনের এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকলেও, দেশে ভয়-ভীতিমুক্ত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। বরং ভয়-ভীতি যেন ক্রমশ বাড়ছে। ভয়-ভীতি প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলসমূহের কোনো কোনো নেতা-নেত্রীর বক্তৃতাতেও স্পষ্ট। যেকোনো নির্বাচনে ভোটারকে নিজের দলে টানার জন্য নেতা-নেত্রীদের গঠনমূলক বক্তৃতা, কমিটমেন্ট বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এমনও হয় নেতা-নেত্রীর সুন্দর বক্তৃতা শুনে অনেকে তাকে বা তার দলকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু নেতার বক্তৃতা শোনার জন্য হাজার হাজার মানুষ নিজের জরুরি কাজ ফেলে জনসভায় হাজির হয়। নেতা-নেত্রীদের কথার জাদু ও মায়ায় পড়ে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বোনে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিযোগী রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের কারও কারও বক্তৃতা-বিবৃতিতে মারমুখী ভাষার ব্যবহার ভোটারদের মনে প্রায় প্রতিদিনই ভয়-ভীতির সৃষ্টি করছে। এ কথা সত্য, জাতীয় নির্বাচনে কথার লড়াই হবে। কথার প্রেক্ষিতে কথা বাড়বে। কথার শক্তিতে প্রতিশ্রুতির কথাই গুরুত্ব পাবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কথার লড়াইয়ে যদি ‘শাউয়া-মাউয়া’জাতীয় শব্দ গুরুত্ব পায়, তা হলেই ভোটারদের মনে ভয়-ভীতি আর শঙ্কা বাড়ে। যে নেতা প্রতিপক্ষকে শ্রদ্ধা করতে জানেন, তার প্রতিই মূলত ভোটাররা আকৃষ্ট হয়। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিপক্ষকে শ্রদ্ধা ও সমীহ করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি মোটেই গুরুত্ব পাচ্ছে না। বরং যুদ্ধংদেহী মনোভাব স্পষ্ট। চোখ রাঙিয়ে, গলা ফাটিয়ে, ভয়ংকর চেহারায় তর্জনী উঁচিয়ে প্রতিপক্ষকে হুঁশিয়ার করে দেওয়ার জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুনে ভোটাররা যেন একটু বিভ্রান্ত। যে কথা সুন্দর করে, মায়া ছড়িয়ে বলা যায়, সে কথায় কেন এত উগ্রতা? ভয় দেখিয়ে জয় করার প্রবণতা কি সমর্থনযোগ্য? তবুও তো একপক্ষ অন্যপক্ষকে ভয় দেখিয়েই চলছে। যেন ভয় দেখানোই ক্রেডিট। ভয় দেখানোই প্রকৃত যোগ্যতা। তুমি আমাকে ভয় কর। তা না হলে তোমার খবর আছে।
ভয়ের বিকল্প শব্দ হয়ে উঠেছে মব। কারও কাজ পছন্দ হচ্ছে না, অথবা কাউকে হুমকি দিতে হবে, অথবা চাঁদা আদায় করতে হবে- ৫/৭ জন মিলে ভয় দেখালেই হবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের দিন ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কোনো বিষয়ে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলা যার যার গণতান্ত্রিক অধিকার। অথচ পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার করে অনেকেই হুমকি দিচ্ছেন- যারা জুলাই সনদ প্রশ্নে ‘না’ ভোট দেবে, তাদের ঠাঁই বাংলার মাটিতে হবে না। ফলে শুধু জাতীয় নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রেই নয়’ ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের ক্ষেত্রেও ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। অস্থিরতাও এক ধরনের ভয় বটে।
আমরা ভয় পেলে, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগলে অথবা বিপদে পড়লে প্রথমেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের কথা ভাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পুলিশ প্রশাসন প্রকৃত অর্থে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মব কালচার পুলিশের ক্ষেত্রেও বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ যেখানে আকারে-ইঙ্গিতে অথবা প্রকাশ্যে অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে; সেখানে সাধারণ মানুষ কার কাছে ভরসা পাবে, কার কাছে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজবে?- এটাই এখন কঠিন বাস্তবতা।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দৃঢ়প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারিই দেশে জাতীয় নির্বাচন হবে। এর একদিন আগেও নয়, একদিন পরেও নয়। প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ধরেই নেওয়া যায় ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আর কোনো সংশয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি কী বলে? ভোটারদের অনেকের মধ্যে যে অজানা আতঙ্ক ও ভয় কাজ করছে, তার অবসান না হলে আদৌ কি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুন্দর ও নিরপেক্ষ আয়োজন সম্পন্ন করা সম্ভব হবে? কার কাছে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজব?
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
সম্পাদক, আনন্দ আলো


