বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে গঠনমূলক এবং ফলপ্রসূ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আমাদের বৈদেশিক বিকল্পগুলো যত বেশি বৃদ্ধি করব, তত বেশি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে জাতীয় স্বার্থগুলোর প্রতি যত্নশীল হতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত চীন ও ভারতের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা, পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগকে প্রসারিত করা, মায়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক, সামরিক এবং বেসামরিক উভয় আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা, মধ্যপ্রাচ্য পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব দেশগুলোতে দক্ষ মানবশক্তি বিনিয়োগকে অক্ষত রাখা।…

ইংরেজি নতুন বর্ষের আগমনকে সমগ্র পৃথিবী ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলে সাদরে বরণ করে থাকে। পৃথিবীজুড়ে বড় শহরগুলোতে উৎসব আয়োজনের, বিশেষ করে আলো প্রদর্শনীর মধ্যদিয়ে নববর্ষের সূচনা ঘোষণা করা হয়। বিশ্বব্যাপী মোটামুটি একই ধরনের নববর্ষের উৎসব পালনের এক প্রতীকী অর্থ রয়েছে। এই প্রতীকী মূল্যের নিগূঢ় উৎস আমরা খুঁজে পাই মানবজাতির সুখ, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনায় উদ্ভাসিত প্রার্থনার ঈপ্সার ভেতরে। কিন্তু মানুষের এ মঙ্গল কামনা বাস্তবে কতটুকু প্রতিফলিত হবে সেটা শুধু বছর সমাপনান্তেই আমরা নিশ্চিত হতে পারি।
আমাদের জীবনে প্রতিটি নববর্ষ পূর্ববর্তী বছরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নতুন বছর মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তার জীবন থেকে একটি বছরের অবসান তার আয়ুষ্কালকে সংকুচিত করে ফেলেছে। ফলে ভবিষ্যতের সুখ কামনা তার জন্য স্বপ্নের মতো হয়ে ওঠে। তাই নতুন বর্ষের আলোকবর্তিকায় মানুষ তার আকাঙ্ক্ষাকে উজ্জীবিত করতে চায়।
কিন্তু একটি বছর তো শুধু বিমূর্ত ধারণা নয়। বছর হলো সময়ের বাস্তবতার প্রতিফলন। এ বাস্তবতার প্রকৃত প্রতিভূ হলো মানবজাতির ঘটনাবহুল জীবন। মানুষের এ জীবন রচিত হয় তার ব্যক্তিগত সামাজিক, জাতিগত এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের মিথস্ক্রিয়ায় পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যদিয়ে।
২০২৬ সালের সূচনা হলো জাতীয় শোকের মধ্যদিয়ে। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। সমগ্র জাতি তাকে শেষ বিদায় জানায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মধ্যদিয়ে অনুষ্ঠিত জানাজায় অংশগ্রহণ করে। তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে তিনি আমাদের জন্য রেখে গেলেন জাতীয় আদর্শের এক অভূতপূর্ব নৈতিক দায়িত্ব। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন নেত্রী। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার অবদানকে ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বিগত ১৬ বছর তিনি স্বৈরাচারী সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরোধিতা করতে গিয়ে অন্যায়ভাবে কারাবরণ করেছেন। তার পরও আপস করেননি। গণতন্ত্র কায়েমের এ অনবদ্য সংগ্রাম জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি আমাদের সংরক্ষণের জন্য দায়িত্ব হিসেবে রেখে গেলেন। নতুন বছর জাতি আসন্ন নির্বাচনের মধ্যদিয়ে এ দায়িত্ব কতটুকু সুষ্ঠুভাবে পালন করতে সক্ষম হবে সেটি হলো আমাদের জন্য একটি লিটমাস টেস্ট।
মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ভোটাধিকার। গণতন্ত্রে নাগরিকের জন্য সুরক্ষিত ভোটের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত করা হলো রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। বিগত সরকারের সময়ে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে মানুষ স্বাধীনভাবে তার ভোট প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়। এ ব্যর্থতার জন্য যে শুধু ক্ষমতাসীন দলই দায়ী ছিল তা নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ও ফ্যাসিজমকে সহযোগিতা করেছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্জনের লোভের বশবর্তী হয়ে। তাতে গণতন্ত্র ধ্বংস হয়েছিল। নাগরিকের মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত হানা হয়েছিল এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের যে আদর্শিক অবয়ব থাকে, তার বিলুপ্তি প্রায় নিশ্চিত হতে যাচ্ছিল। আর কিছুদিন ফ্যাসিস্ট শাসনের দৌরাত্ম্য বলবৎ থাকলে বাংলাদেশে যে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো তাতে সন্দেহ করার অবকাশ নেই। এ ব্যর্থতা সাধারণ নাগরিকের জীবনে শুধু দুর্ভোগ এবং বঞ্চনা ছাড়া কিছুই দিতে পারত না। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দেশকে সে বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
নববর্ষের এই লগ্নে আগামী নির্বাচনের কথাটা মাথায় রেখে এবং অতীত নির্বাচনের প্রহসনকে স্মরণ করে জাতি যাতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোট প্রয়োগকারী নাগরিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে, এটাই হলো আজ আমাদের নববর্ষের প্রতিজ্ঞা। এ প্রতিজ্ঞাকে বলবৎ করতে প্রয়োজন জাতির উপাদানগুলো, যেমন- রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবিচ্ছেদ্য সদিচ্ছা। আমাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা কাজ করছে যে, আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচন পরিচালনা শুধু নির্বাচন কমিশনের একার ব্যাপার নয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে সুস্থ রাষ্ট্র হিসেবে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের অস্তিত্ব, সম্মান এবং মর্যাদার ব্যাপার।
জাতির এ কঠিন মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রয়োজন সহিংসতা পরিহার করে জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে সচেষ্ট এবং সাবধান হওয়া। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, গত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসররা তত বেশি তৎপর হয়ে উঠবে রাজনৈতিক অপপ্রচেষ্টা এবং নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির প্রয়াসে। নির্বাচনি সাংগনিঠক পরিচালনা যাতে বিঘ্নিত না হয় সেজন্য জনসাধারণের একটি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করা। এ ক্ষেত্রে সশস্ত্রবাহিনী এবং পুলিশ ফোর্সকে সজাগ এবং যত্নশীল হতে হবে। তা না হলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে অভিষ্ট আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নটাই বিফলে পতিত হবে।
আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্য ফিরে আসাটা জাতির নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে একটি রাষ্ট্র একাকী শান্তিপূর্ণভাবে টিকে থাকাটা প্রায় অসম্ভব হতে চলেছে। ভূরাজনৈতিক নেতিবাচক প্রতিযোগিতার কারণে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং অধুনা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব বৃহৎ শক্তিগুলো আগ্রাসনের মুখে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর বাস্তবিক প্রভাব ক্ষুদ্র এবং মধ্যম শক্তির দেশগুলোর স্নায়বিক চিন্তাভাবনায় চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য, বিশেষ করে যে রাষ্ট্রগুলোর ভূসীমানা বৃহৎ শক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত। বৃহৎ শক্তিগুলোর এ ধরনের অযাচিত আগ্রাসী আচরণের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির লেনদেনের খরচ ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর মারাত্মকভাবে আঘাত আনছে। যার ফলে সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যস্ফীতির প্রভাবে উন্নয়নকামী দেশগুলোতে জীবন অসহনীয় হয়ে পড়েছে।
আগামী নির্বাচনে যে রাজনৈতিক দলই জয়ী হোক না কেন, তার দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন, কৌশল প্রবর্তন এবং শাসন পরিচালনা করতে হবে। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং বিগত সরকারের অপশাসনের উদাহরণগুলো স্মরণে রেখে স্বৈরশাসকমূলক আচরণ থেকে নিজেদের বিরত রাখা। কারণ, স্বৈরশাসন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং স্বজনপ্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এর জন্য প্রয়োজন বিচার বিভাগ, বেসামরিক প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনী- রাষ্ট্রের এ তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মেধা এবং পেশাদারত্বনির্ভর সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক লেজুড়ভিত্তি থেকে মুক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রকে বহির্বিশ্বের সঙ্গে গঠনমূলক এবং ফলপ্রসূ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা আমাদের বৈদেশিক বিকল্পগুলো যত বেশি বৃদ্ধি করব, তত বেশি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে জাতীয় স্বার্থগুলোর প্রতি যত্নশীল হতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত চীন ও ভারতের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রাখা, পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগকে প্রসারিত করা, মায়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক, সামরিক এবং বেসামরিক উভয় আলোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা, মধ্যপ্রাচ্য পূর্ব ও দক্ষিণপূর্ব দেশগুলোতে দক্ষ মানবশক্তি বিনিয়োগকে অক্ষত রাখা। এ লক্ষ্যগুলো সামনে ধারণ করেই ২০২৬ সালের পররাষ্ট্রনীতির কৌশল প্রণয়নে আগামী দিনের সরকারকে মনস্থির করতে হবে।
সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবে, তা হলো অন্তর্বর্তী সরকারকে আসন্ন ফেব্রুয়ারি মাসে একটি দুর্নীতিমুক্ত জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করা। সেটা না হলে ২০২৬ সালের বাকি দিনগুলো যে জনসাধারণের হতাশায় পরিণত হবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে আকাঙ্ক্ষাই নববর্ষের সূচনা প্রত্যেক নাগরিককে আশার আলো দেখায়। স্বাধীনতার পরে প্রায় অর্ধশতাধিক বছরের বেশি আমাদের জাতীয় জীবনে কেটে গেছে। প্রতি বছরের শুরুতে নববর্ষের সূর্যোদয়ে বাংলাদেশের জনসাধারণ আশার আলো দেখে, কিন্তু বছর সমাপনান্তে এক অবাক হতাশা যেন আমাদের আচ্ছন্ন করে বসে। ২০২৬ সালে যাতে এরূপ না ঘটে, সেদিকে দলমতনির্বিশেষে সবার সত্যিকার অর্থে কাজ করাটা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়। তা না হলে, জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের ফ্যাসিস্ট পতনের বিপ্লব আগের বহু বিপ্লবের মতো বেহাত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
লেখক: ডিস্টিংগুইশড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশেন
অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত


