নির্বাচিত সরকারের গতিপথ ও ভাবমূর্তি তার ক্ষমতায় আসার প্রথম দিনগুলোতেই নির্ধারিত হবে। এর প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো জনসাধারণের আস্থা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় জনরায়ের সঙ্গে আসে বিশাল দায়িত্ব। এ মুহূর্তটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে দেশকে নিয়ে যাবে নাকি আরেকটি হাতছাড়া সুযোগ তৈরি হবে তা এখন নির্ভর করছে নির্বাচিতদের ওপরই।...

গত ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে ১৮ বছর পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নতুন নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করছে এক নতুন পর্বে।
বহু বছর পর এবারের নির্বাচনে রাষ্ট্র মানুষের অংশগ্রহণকে সীমাবদ্ধ করেনি। তবে এটি সর্বজনীন প্রতিযোগিতা হতে পারেনি। কারণ, আওয়ামী লীগ এতে অংশ নিতে পারেনি। অবশ্য আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতির কারণ তারা নিজেরাই তৈরি করেছে। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ জবরদস্তিমূলক, কৌশলগত এবং নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা করে কিছু রাজনৈতিক দলকে প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রেখেছিল। সে রাজনৈতিক গতিপথের প্রতিক্রিয়ায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ফলে আওয়ামী লীগ নিজেই বাদ পড়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অন্যান্য নির্বাচনের তুলনায় এ নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল। যদিও আগে কিছু ঘটনা ঘটেছিল, ভোটের দিন ব্যাপক সহিংসতা, বড় ধরনের সংঘর্ষ এবং সন্ত্রাসের কোনো পরিবেশের খবর পাওয়া যায়নি। যারা ভোট দিতে চেয়েছিলেন তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভোট দিতে পেরেছিলেন। ছোটখাটো অভিযোগ ছিল, কিন্তু কোনো বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি।
নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল। শেখ হাসিনার ১৫ বছরেরও বেশি ক্ষমতায় থাকাকালীন, কার্যকরভাবে কোনো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হয়নি। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আমরা ধর্মীয় এবং ডানপন্থি কট্টরপন্থিদের উত্থান প্রত্যক্ষ করেছি। গত দেড় বছরে ভাঙচুর, ভয় দেখানো এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা ক্রমবর্ধমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বোধ করছেন। সংগীত, থিয়েটার এবং লোক পরিবেশনার মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আক্রমণের শিকার হয়েছিল এবং সারা দেশে তা হ্রাস পেয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে, এ নির্বাচন দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে সে সম্পর্কে প্রশ্ন উঠেছিল, ভীতি ছিল। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে, দেশ আরও গভীর অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন একটি নির্বাচিত সরকার পাওয়ার কারণে একটি অদৃশ্য এবং জবাবদিহিহীন শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার আশা করতে পারছি।
গত দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তী প্রশাসন যথাযথ স্বচ্ছতা ছাড়াই বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করি। তারা আর্থিক বরাদ্দের এমন সিদ্ধান্তও নিয়েছে, যার জন্য কেউ দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক বলে মনে হয় না। এ ধরনের অস্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ আর চলতে পারে না। একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে সংসদীয় তদন্ত এবং জনসাধারণের জবাবদিহি থাকতে হবে। জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
পার্লামেন্টে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী অতীতের সরকারগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের আশ্বস্ত করে না। এ নির্বাচনে, বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। আমরা এর আগেও একই রকম ঘটনা দেখেছি। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটও একই ফল লাভ করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই সরকারের আচরণ উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার বেশ কয়েকটি অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ২০০৮ সালের পর আওয়ামী লীগ এমনভাবে সংবিধান সংশোধন করে যা দেশে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করেছে। একটি বিশাল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংস্কারের সুযোগ তৈরি করে, কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং ভিন্নমতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রলোভনও তৈরি করে।
আমরা আশা করি, এবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে না। বিএনপিকে তাদের অতীত নিয়ে ভাবতে হবে। চাঁদাবাজি, জমি দখল এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ যেন আবার না ওঠে। দলটিকে নিশ্চিত করতে হবে যে, নারী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলো নিরাপদ বোধ করে এবং তাদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের সমাধান করা হয়। এ বিশাল জনাদেশ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থাপন করে, যা নষ্ট করা উচিত নয়।
নতুন সরকারের জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া উচিত: প্রথমত, জুলাইয়ের বিদ্রোহের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। ন্যায়বিচারকে রাজনৈতিক কারসাজির আরেকটি আখড়ায় পরিণত করা উচিত নয়। সেই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগে আটক লেখক, সাংবাদিক, আইনজীবী এবং অন্যদের জামিন দেওয়া উচিত অথবা যেখানে উপযুক্ত সেখানে মুক্তি দেওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, সরকারের উচিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ, নারীর ওপর সহিংসতা, মন্দির, মসজিদ, মাজারে ভাঙচুর, মিডিয়া হাউসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আক্রমণ, মব সহিংসতা এবং অনলাইন নির্যাতনের তদন্ত করা। জনসাধারণের জানা উচিত কে দায়ী এবং কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তৃতীয়ত, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং জাপানের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা উচিত। এর মধ্যে কিছু দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদি এর মধ্যে কোনোটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা উচিত এবং দায়ীদের জবাবদিহি করা উচিত।
চতুর্থত, সাংস্কৃতিক তৎপরতা পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে চাপ ও ভীতির কারণে থিয়েটার প্রযোজনা, সংগীত অনুষ্ঠান এবং অন্যান্য শৈল্পিক কার্যকলাপ হ্রাস পেয়েছে। প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক প্রকাশ ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক সমাজ বিকশিত হতে পারে না। এ পদক্ষেপগুলোর বাইরে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। মিডিয়া এবং নারী কমিশনগুলোকে গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নদী এবং কৃষি সম্পর্কিত নতুন কমিশন গঠন করা উচিত এবং নীতি সংস্কার প্রমাণভিত্তিক হওয়া উচিত।
পঞ্চমত, সরকারকে এমন একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যা সমালোচনা সহ্য করে এবং বৈচিত্র্যকে সম্মান করে। ভিন্নমত এবং সাংস্কৃতিক বহুত্বকে হুমকি হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও অযোগ্য নিয়োগ পর্যালোচনা করতে হবে এবং প্রয়োজনে সংশোধন করতে হবে।
পরিশেষে, নির্বাচিত সরকারের গতিপথ ও ভাবমূর্তি তার ক্ষমতায় আসার প্রথম দিনগুলোতেই নির্ধারিত হবে। এর প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো জনসাধারণের আস্থা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি বড় জনরায়ের সঙ্গে আসে বিশাল দায়িত্ব। এ মুহূর্তটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে দেশকে নিয়ে যাবে নাকি আরেকটি হাতছাড়া সুযোগ তৈরি হবে তা এখন নির্ভর করছে নির্বাচিতদের ওপরই।
লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক


