বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার পর থেকে স্বপ্নের জাল বুনছে কিন্তু বুনন আর শেষ হয় না। সরকার পরিবর্তনে আশা বাঁধে এই বুঝি সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্র জনবান্ধব ব্যবস্থা কায়েম করবে কিন্তু চাহিদা ও জোগানে বিস্তর ফাঁক থেকে যায়। এবার একটা বিপ্লবোত্তর নির্বাচনের সরকার, ফলে প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতাও ব্যাপক। সবচেয়ে বড় কথা সরকার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সঠিকভাবে অগ্রগতি করতে না পারলে দেশ পিছিয়ে যাবে- এ ভাবনা নিশ্চয় সরকারের মাঝে জাগরূক থাকবে।...
জাতীয় নির্বাচনে জনগণ ভোটের মাধ্যমে সহজিয়া পথে উন্নয়নের অংশীজন হতে চায়। ২০২৬-এর বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ন্যারেটিভ অনেক গহিনে। দীর্ঘদিন অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন থেকে দূরে থেকে জনসমাজে বিশেষত প্রান্তিক মানুষের কাছে একটা উৎসবমুখর নির্বাচন ভীষণভাবে প্রার্থিত ছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের যে সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছিলে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ তা বাস্তবতায় প্রতিভাত হলো।
৫ আগস্ট-পরবর্তী ইন্টেরিম সরকার এবং জুলাই বিপ্লবীদের কাছে জনস্বপ্ন দিনকে দিন সংকুচিত হচ্ছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী দেয়াল লিখনে যে ভেদহীন সমাজের প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল, চলমান বাস্তবতায় তা যোজন যোজন দূরে অবস্থান করেছিল। নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাশা যেন ভোরের শুকতারার মতো দূরবর্তী সম্ভাবনার বাতিঘর ছিল। এখন নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশার ডালি প্রতিদিন বাড়ন্ত। গণতান্ত্রিক বিশ্বায়নের যে দাওয়াই উন্নয়নশীল বিশ্বের ওপর প্রযুক্ত, সেই পর্বে জনগণ রাষ্ট্রের মালিকানার অংশীদার হিসেবে ভোটকে নিজেদের জিম্মায় রাখে সযতনে। ভোট প্রয়োগে সবসময় ‘পছন্দ’, ‘যোগ্য’, ‘আদর্শ’, ‘উন্নয়নদর্শন’ ইত্যাদি উপকরণ যথার্থভাবে কাজে আসে না। ধর্ম, পেশিশক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ, প্রচার কৌশল অনেক সময় ভোটের বড় প্রভাবক হয়। হিমালয়ান আইডলে এ কাহিনি পুরাতন। ভোটের বড় প্রভাবক ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি। ১৯৪৭-এ দেশভাগ-পর্বে ১২০০ মাইলের ব্যবধানের পাকিস্তানের দুই অংশকে কেবল ইসলামি জজমার মেকি বন্ধনে এক করা গেলেও ভ্রাতৃত্বের দৃঢ় বন্ধন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তান ভাগ হয়ে যায়। তবে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী ভারতে গত অর্ধশতাব্দী ধরে রাজনীতির মসনদে গমনে ধর্ম বড় নির্ণায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। আতর ও ধূপের গন্ধ মেখে স্বর্গ-নরকের প্রাপ্তিযোগ ঘটানোর প্রচেষ্টা হয় ভোট প্রাপ্তির কৌশল হিসেবে। ধর্মভীরু এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আজও এ এক বড় স্পর্শকাতর ও ফলদায়ী বিষয়। নির্বাচনি ইশতহারেও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়গুলোর কৌশলী উপস্থাপন বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। তবে ২০২৬-এ বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে সুশাসন, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রগতির বিষয়টি ভোটারদের মনের গহিনের চাওয়া ছিল।
উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য রাজনীতিতে প্রযোজ্য ম্যাকিয়াভেলিবাদের সাফল্যই উপায়কে বৈধতা দেওয়া (Ends Justify the means) এ ধরনের প্রকরণ আর কাজে আসবে না। টিকে থাকার সাফল্য এক সময় ভেঙে পড়ে। এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপরীতে উন্নয়নের বয়ান যে দীর্ঘমেয়াদি নয় তাও ইতোমধ্যে প্রমাণিক। উন্নয়নকে সুষম, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি করতে জনরায় একটা বড় শক্তি। এ শক্তিতে বলিয়ান সম্প্রতি নির্বাচিত বিএনপি সরকার। উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতিতে নির্বাচনি ইশতেহার নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কাম্যমাত্রায় গুরুত্ব পায় না। এ ক্ষেত্রে সাধারণ প্রপঞ্চ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা। ইশতেহারের অনুচ্ছেদগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ও সময়ান্তে মূল্যায়ন অতি জরুরি। ইশতেহার তো জনগণকে দেওয়া ওয়াদা, একে এক ধরনের সামাজিক চুক্তি বললেও খুব একটা বাড়িয়ে বলা হবে না। সংবিধান যেমন জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের এক ধরনের চুক্তি, তেমনি নির্বাচনের ইশতেহার রাষ্ট্র পরিচালনার এক ধরনের নির্দেশিকা। আইনি শক্ত বাধ্যবাধকতা না থাকলেও সামাজিক ও নৈতিক দিক বড়ই মজবুত। কারণ, নির্বাচিত দলকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয় ইশতেহারকে সামনে রেখেই। বিএনপি সরকারের সামনে বড় একটি বিষয় বাংলাদেশের বৃহৎ একটা জেন-জি প্রজন্ম। যারা জুলাই অভ্যুত্থানের সৈনিক। এদের ক্ষুদ্র একটা অংশ সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হলেও বড় অংশ বসে আছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রত্যাশার ডালি নিয়ে। এদের অধিকাংশের ভোট যেহেতু বিএনপির পক্ষে গেছে, তাই বিএনপির দায় রয়েছে হিস্যা বুঝিয়ে দেওয়ার।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার প্রচার কৌশল তুলনামূলক বিচারে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে লাগসই ছিল বলেই ভোটাররা তাদের প্রতি বেশি ভরসা রেখেছে। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী বিএনপির দায়ভারও বেড়েছে বৈকি। মোটাদাগে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক সমাজ গঠন এ পরিধির মধ্যে আগামীর পথ চলা স্থির না হয়ে হাঁটতে হবে অনেকটা পথ। প্রাথমিক অনুমিতিতে সেই বড় পথের খানিক আঁচ নবনির্বাচিত দলের ভাষ্যে পরিস্ফুট হচ্ছে। বিএনপির ভাষ্য, নির্বাচনে শুধু জনপ্রতিনিধি নয়, এ নির্বাচন দেশ পুনর্গঠনের। এ বক্তব্যের বাস্তবায়ন আগামী দিনে বোঝা যাবে কার্যফল মূল্যায়নে।
বিগত প্রতাপশালী আওয়ামী সরকারের পরিণতি বিএনপির সামনে সমাসীন, ফলে চলার পথের সাবধানতা ও কর্মকৌশলে এ নজির যথেষ্ট। ক্ষমতাকে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বা জারি করা কোনো বিষয় নয়, বরং জনগণের পালস্ বুঝে শাসন পরিকাঠামো প্রয়োজন, এ বার্তাটি সরকারের মস্তিষ্কে মজুতকৃত।
নির্বাচনি ইশতেহার ও ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল আইনশৃঙ্খালা পরিস্থিতি ও সর্বোপরি দুর্নীতিতে ভরপুর শাসন ও সমাজ কাঠামো নিয়ে বিএনপি সরকারের যাত্রা। উত্তরণে ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব, সততা, দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম ও ত্যাগের মানসিকতার উঁচুতে উঠতে হবে সরকার পরিচালনায়।
বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার পর থেকে স্বপ্নের জাল বুনছে কিন্তু বুনন আর শেষ হয় না। সরকার পরিবর্তনে আশা বাঁধে এই বুঝি সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্র জনবান্ধব ব্যবস্থা কায়েম করবে কিন্তু চাহিদা ও জোগানে বিস্তর ফাঁক থেকে যায়। এবার একটা বিপ্লবোত্তর নির্বাচনের সরকার, ফলে প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতাও ব্যাপক। সবচেয়ে বড় কথা সরকার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সঠিকভাবে অগ্রগতি করতে না পারলে দেশ পিছিয়ে যাবে- এ ভাবনা নিশ্চয় সরকারের মাঝে জাগরূক থাকবে। ইতোমধ্যে তারেক রহমানের বক্তব্য- ‘বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে আনন্দ মহিমান্বিত হয়’- এতটুকু সহনশীলতা থাকলে উন্নয়নের সোপানে সবার অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়। এ সুগমতা আমাদের এসডিজিরও একটা অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনায় অনিয়ম, দুর্নীতি, দায়হীনতা ও সংঘাতের রাজনীতি অনেক হয়েছে। ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী অর্জনের স্বাধীনতার জিম্মাদারি শহীদের রক্তের দলিলে আমাদের মনোভুবনে উৎকীর্ণ আছে, এখন সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এটা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা বয়ান নয়, এটা একটা দিকনির্দেশক। ক্ষমা নিয়ে এবং ক্ষমা করেই হাত ধরে পরস্পর এগিয়ে যেতে হবে। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে, কৌশল থাকবে কিন্তু কূটকৌশল ও সংঘাতের পথকে পরিহার করতে হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বার্থে। যেকোনো উপায়ে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা পরিহার করতে হবে। অতীতের ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ করেই কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
নির্বাচন-পূর্ববর্তী বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার ও নির্বাচনি ইশতেহারে সামাজিক সুরক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণকামীর বেশ কিছু বিষয় আছে। দলীয় প্রধান তারেক রহমানের প্রত্যয়- বিএনপি একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, সেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ি, সমতলীদের পাশে সংশয়বাদী ও অবিশ্বাসীদের জন্যও নিরাপদ বাংলাদেশের কথা বলে দলের একটা বড় দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন। এবার বাস্তবায়নের পথ দেখবে জনতা। এসব দেখার জন্য সরকারকেও জায়গা করে দিতে হয়। সবসময় চাপে-তাপে রাখলে সরকারের উন্নয়নকর্ম বাধাগ্রস্ত হয়, এ বিষয়টিও দায়িত্বশীলতার বিষয়।
সরকার পরিচালনায় এমন মেটিকিউলাস দক্ষতার পরিচয় আবশ্যক। আমরা বলব, সেই চলনের পথটা উদার, সহনশীল ও গণকল্যাণকামিতায় যেন ভাস্বর হয়। যেন ভালোবাসা ও বন্ধনের রেশ থাকে, ঘৃণা অপসৃত হয়।
জনসমাজের মধ্যে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন, বিশেষত তাদের দল করার ও দল গড়ার অধিকার থাকলেও বিগত দিনে জনসমাজে যে দলবাজ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দলবাজ না হয়েও দলকে সমর্থন করা যায়। দলবাজ লোক দলকে দেখে প্রাপ্তির আয়নায় কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের সঠিক দিশার জন্য এখন দলকানা লোকের উপস্থিতির খেরোখাতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। দূর থেকে দলগুলোকে দেখে নির্মোহ দৃষ্টিতে ভালোমন্দ বিচার প্রয়োজন। আমাদের সামনের দিনে যদি একটি ভেদহীন মানবিক চেতনার বাংলাদেশ চাই তবে দায়িত্ব শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগ করেই ক্ষান্ত হলে চলবে না। সচেতন হতে হবে, পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দলীয় কর্মীতে দলগুলো ভরপুর। নতুন সংস্কৃতিতে দলবহির্ভূত কিছু মানুষের প্রয়োজন, যা আখেরে সব দলকে একই সঙ্গে সহযোগিতা ও গঠনমূলক সমালোচনায় মুখর হয়ে সঠিক পথের দিশা দিতে সহায়তা দিতে পারে। জুলাই অভ্যুত্থানে সাধারণ জনসমাজ থেকে কিছু মানুষ ঘটনার মধ্যে হয়তো সামনে এসেছে কিন্তু বৃহৎ যে জনগোষ্ঠী সবকিছুকে অবদমিত করে বিপ্লব সফল করেছিল তাদের নাম হয়তো মুখস্ত বলা যাবে না কিন্তু তাদের অন্তনির্হিত শক্ত স্ফুরণেই আজকের বাংলাদেশ, আজকের সরকার। সেই সরকারের কাছে দল-মতনির্বিশেষে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপক্ষের সব নাগরিক প্রার্থিত বাংলাদেশ খুঁজবে। নতুন পথের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে আছে প্রতিটি মানুষ। এই মানুষগুলোই বাংলাদেশ।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


