প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি তার ঔদার্য দিয়ে নতুন চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে বুকে ধারণ করুন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করুন। দয়া করে জাতিকে আর প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না।...

আমাদের সামনে অগণন প্রসঙ্গ আছে, যা সমাজ, দেশ এবং বিশ্বশান্তির জন্য জরুরি; তার পরও কেন কম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত!
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’র একটি পঙ্ক্তি- ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শত গুণ’। পঙ্ক্তিটি পড়ার পরই আমাদের লোকবাংলার একটি প্রচলিত প্রবাদের কথা মনে পড়ছে, ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দর।’ কত সহজে মনে করিয়ে দেয় কী গভীর জীবনাভিজ্ঞতার ফসল আমাদের গ্রামবাংলার লোক প্রবাদ; হয়তো সে প্রবাদের আলোকেই রবীন্দ্রনাথের এই অমর পঙ্ক্তি। কথাগুলো আজও কেমন প্রসঙ্গিক।
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, সম্ভবত ১৯৭৭ বা ৭৮-এ জেনারেল জিয়াউর রহমান-এর শাসনামলে একবার নাটক করতে গেলাম ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে মোতাহার হোসেন বাচ্চুর তত্ত্বাবধায়নে। যতদূর মনে পড়ছে মিজানুর রহমান তখন শিল্পকলার মহাপরিচালক। আমরা নাটক করব শেখ আকরাম আলী রচিত কাব্যগীতিনৃত্যনাট্য ‘কবিপ্রিয়া’। আমি সে নাটকে অভিনয় করছি ‘হিন্দু যুবক’ চরিত্রে, চরিত্রটি নজরুলের বন্ধু। আমরা মেকআপ নিয়ে প্রস্তুত। আমার পোশাক ধুতি-পাঞ্জাবি। সেদিন স্বয়ং জিয়াউর রহমান নাটক দেখবেন, সঙ্গত কারণেই কর্তৃপক্ষের উৎকণ্ঠার সীমা নেই। মহাপরিচালক মহোদয় গ্রিনরুমে এসে আমায় বললেন, ‘আপনি কোন চরিত্রে অভিনয় করছেন?’ আমি বললাম, ‘হিন্দু যুবক।‘ তিনি ক্ষণকাল ঠোঁট উল্টে চোখ পিটপিট করলেন, তার পর বললেন, ‘ধুতিটা খুলে ফেলা যায় না?’ আমি বুঝলাম কী বলতে চান তিনি, তবু রস করার জন্য বললাম, ‘শুধু কি আন্ডারপ্যান্ট পরে অভিনয় করব?’ উনি যেন একটু হোঁচট খেলেন, বললেন, ‘না না, পায়জামা পরা যায় না?’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘নজরুল নিজেই তো তখন ধুতি পরতেন, নজরুলের হিন্দু বন্ধু পায়জামা পরলে কি ঠিক হবে?’ উনি সামান্য ইতস্তত করলেন, বললেন, ‘আরে ভাই মহামান্য রাষ্ট্রপতি নাটক দেখবেন! আমার তো সব দিক দেখতে হয়!’ আমি বললাম, ‘আপনি আমার পরিচালকের সঙ্গে কথা বলুন স্যার।’ ‘স্যার’ শব্দটি আমি ইচ্ছা করেই বললাম। তিনি চলে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ছুটে এলেন স্বয়ং শেখ আকরাম আলী, তিনি নিজেও আমলা, তখন সম্ভবত যুগ্ম সচিব পদে আছেন; কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কি পায়জামা নেই?’ আমি বললাম, ‘না’। উনি বললেন, ‘ধুতিটা বদলে ফেলতে হবে, পায়জামা পরে অভিনয় করতে হবে! টেকনিক্যাল সমস্যা আছে।’ আমি বললাম, ‘আমার কাছে জিন্সের প্যান্ট আছে স্যার।’ শেখ আকরাম আলী আবার বললেন, ‘জিন্সের প্যান্টে হবে না। দেখ কারও কাছে পায়জামা আছে কি না?’ আমি এবার বললাম, ‘নজরুলের হিন্দু বন্ধুর পোশাক ধুতি হওয়াই তো সঙ্গত।’ শেখ আকরাম আলী এবার কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেন, বললেন, ‘সে তো আমিও জানি! আমি নাটক লিখেছি, আমি জানি না?’ এবার আমি আমার ‘ঘাড়ত্যাড়া’ চরিত্রটি প্রকাশ করে বললাম, ‘দুঃখিত স্যার, আপনি নাট্যকার হলেও আমি পরিচালকের অধীন। আপনার যা বলার পরিচালককে বলুন। উনি যা বলবেন আমি তাই করব!’ হয়তো শেখ আকরাম আলীর মনে পড়ে গেল, ‘দুলালের তো ঘাড়ত্যাড়া’, অগত্যা উনি চলে গেলেন। পরে অবশ্য আমি পরিচালকের কথা মতো পায়জামা পরেই অভিনয় করেছিলাম। আমাদের সে নাটকের পরিচালক ছিলেন এম এন আলম তোতা; তার সম্পর্কে যথাস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদন করব। আমি জানি না, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ইচ্ছাতেই মহাপরিচালক মহোদয় ধুতি পরায় আপত্তি করলেন কি না; আমার ধারণা, না! এটা ওই ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে...’ তবে সে সময়টাই ছিল বিরুদ্ধস্রোতের সময়, নাটক করতে গেলে কত যে কম্প্রোমাইজ করতে হতো বলে শেষ করা কঠিন।
বাংলাদেশে আজও ‘পারিষদ দলের’ ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দর’ অবস্থাটি বর্তমান। অপ্রিয় সেই সত্যটি বলার জন্যই আজকের কথা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাহিত্য ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি পুরস্কারই সবচেয়ে বড় পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃত; অবশ্য ‘একুশে পদক’ এবং ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ নামে দুটি পুরস্কার আছে, যাদের সম্মান অনেক বেশি; কিন্তু ও দুটি পুরস্কার সাহিত্য ছাড়াও শিল্প-সংস্কৃতি-শিক্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য দেওয়া হয়; আর বাংলা একাডেমি পুরস্কার সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় প্রদানের নিয়ম প্রচলিত বলে এ পুরস্কার সবাই পেতে আগ্রহী; এটি তাই সৃষ্টিশীল সাহিত্যিকের কাছে স্বপ্নের পুরস্কার। এ পুরস্কার নিয়ে সমাজের মানুষের আগ্রহেরও সীমা নেই।
এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব যেমন বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের, তেমনি শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতি কর্মী এবং সর্বোপরি সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে প্রশাসনের। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে নানা পুরস্কার ও পদক প্রদানের নিয়ম প্রচলিত আছে। সেসব পুরস্কার আর্থিক মূল্যমান এবং ব্যাপ্তি আমাদের এ পুরস্কারের তুলনায় উজ্জ্বল হলেও বাংলা একাডেমি পুরস্কার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিছুতেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলা একাডেমির পুরস্কার নিয়ে যা ঘটছে তা এই পুরস্কারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এমন নয়, যে এই প্রথম বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রশ্নবিদ্ধ হলো; এর আগেও বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন সরকারের আমলে এ পুরস্কার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে; কিন্তু কেন পর্যায়ক্রমে বারবার এটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হবে! কেন দেশ ও জাতিকে বিশ্বের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করা হবে! আমরা কি ক্রমান্বয়ে সভ্য-শিষ্ট-ভব্য-রুচিশীল হয়ে উঠব না? নাকি আমরা বারবার আমাদের কর্মকাণ্ড আর আচরণে দেশ ও জাতিকে পেছনের দিকেই ঠেলে নিয়ে যাব?
২০২৫-এর বাংলা একাডেমি পুরস্কার যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে বিতরণ করা হলো, তার দুই দিন আগেই সরকারপ্রধান এবারের একুশে পদক বিতরণ করতে গিয়ে বললেন, ‘শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রাখতে হবে’... ইত্যাদি। সেই তিনিই দুই দিন বাদে বাংলা একাডেমিতে পুরস্কার বিতরণ করতে এলেন, সেখানেই ঘটল ব্যত্যয়, রাজনৈতিক ভিন্নতার জন্য একজন কবিকে শেষ মুহূর্তে পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা হলো! কিন্তু কেন! বার্তা হলো, কবিতা শাখার পুরস্কার বাংলা একাডেমি স্থগিত করেছে। কবি তার ফেসবুকে এক বার্তায় জানিয়েছেন, ‘গতকাল পুরস্কারপ্রাপ্তদের ডেকে এসএসএফ পুরস্কার গ্রহণের রিহার্সেল প্রদান করে। আজ অনুষ্ঠানের সূচনায়ও আমার নাম ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পুরস্কার প্রদানের সময় আমাকে আর ডাকা হয়নি।’
যাকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য মনোনীত করা হয়েছে, তিনি সত্তর দশকের একজন কবি; আমি মনে করি না, তিনিই সত্তরের প্রধান কবি যাকে পুরস্কার দেওয়া যায়; তার আগে অন্তত সাত-আটজন কবি আছেন, যারা তার চেয়ে বেশি যোগ্য; এটা একান্তই আমার মত; যারা তাকে মনোনয়ন দিয়েছেন, হয়তো তাদের বিবেচনায় তিনিই প্রধান। যোগ্যতা নিয়ে আমি তর্ক করতে চাই না; কিন্তু কেন তার নাম ঘোষণা করে, তাকে ডেকে এনে পুরস্কার না দিয়ে স্থগিত করা হলো? একজন কবিকে সম্মান দিতে না পারলে না দেবেন, কিন্তু তাকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার অধিকার বাংলা একাডেমির নেই!
এর পরে কী কী ঘটেছে, সবাই জানেন। বাংলা একাডেমি তাকে ২ মার্চ পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে; কবিও রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে তিনি পুরস্কার নিতে আগ্রহী। বুঝলাম প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণে গ্লামার আছে, কিন্তু এর সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্বের কী সম্পর্ক! কিছু কথা জেনেও বলতে হয় না; আমিও বললাম না! শেষপর্যন্ত আমার প্রশ্ন পারিষদ দল নিয়ে; কেন তারা বেশি বলে, বেশি বুঝে একটি মহৎ প্রসঙ্গকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন!
এক বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ’২৪-এর আন্দোলনের পর জাতি যখন আশা করেছে, নতুন উদ্যমে দেশ এগিয়ে যাবে, সেখানে ’২৪-এর আন্দোলনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গত দেড় বছরের অসাংবিধানিক সরকার বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলণ্ঠিত করে দেশকে অর্ধশতাব্দী পিছিয়ে দিয়েছে; সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয়েছে; যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমান; যিনি দীর্ঘ সতেরো বছর দেশের বাইরে ছিলেন, তিনি যদি তার ঔদার্য দিয়ে নতুন চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন, দয়া করে তা নষ্ট করবেন না। পারিষদ দলে যারা আছেন, সরকারি আমলা অথবা রাজনীতির নিয়ামকবৃন্দ, রবীন্দ্রনাথের পঙ্ক্তি ‘বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ’ অথবা লোকপ্রবাদ ‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দর’ ইত্যাদি বাণীর মর্ম মনে রেখে সবাই সংযত হোন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে বুকে ধারণ করুন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করুন। দয়া করে জাতিকে আর প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না।
লেখক: সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য
বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব


