যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা কূটনৈতিক উত্তেজনার খবর নয়। যুদ্ধের অর্থ আরও বিস্তৃত- এটি বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় এবং অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতও সে বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। অনেকেই এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংকট হিসেবে দেখছেন। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। কারণ ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, উপসাগরীয় ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের একটি কৌশলগত কেন্দ্র। ফলে এ সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর অভিঘাত শুধু তেহরান, তেলআবিব বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার প্রতিধ্বনি পৌঁছাতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। জ্বালানির দাম বাড়ছে, বাতিল হচ্ছে বন্ধকি চুক্তি এবং খাবার থেকে শুরু করে স্মার্টফোন সবকিছুরই দাম বেড়ে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা এবং জবাবে তেহরানের পাল্টা আঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আঘাতের ফল এরই মধ্যে টের পেতে শুরু করেছেন ভোক্তারা। এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ঘোষণা করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধই থাকবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা তাদের মজুত থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জ্বালানি ছাড় করার পর তেলের দামে যে সাময়িক স্বস্তি এসেছিল, তা যে ক্ষণস্থায়ী সেটা প্রমাণিত হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের ওপর হামলা জোরদার করেছে, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে পরিবহন অবকাঠামোগুলোয় হামলা আরও তীব্র হয়েছে। যদিও এ যুদ্ধের প্রভাব সব জায়গায় সমানভাবে পড়ছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস এবং বিভিন্ন দেশের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ অন্যান্য সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে জরুরি ত্রাণ পাঠাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। মানবিক ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে দুবাই, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল সেখানে। আকাশে ধ্বংস করা একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার পর ওই টার্মিনালে আগুন ধরে যায়। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে যে, এ সংকটের কারণে ভারত থেকে সুদান পর্যন্ত তাদের পণ্য পরিবহনের পথে অতিরিক্ত ৯ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব বেড়েছে। সুদান বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু ত্রাণ পরিবহনের খরচ বেড়ে যায়, বরং অন্যান্য অনেক খরচও বেড়ে যায়। যেমন ক্লিনিকগুলোয় জেনারেটর চালানোরও খরচও এতে বেড়ে যায়। আকাশপথে চলাচলে বিধিনিষেধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে মানবিক ত্রাণসামগ্রী নিরাপদে পারাপারের সুযোগ তৈরি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ ও অন্যরা যৌক্তিকভাবেই চাপ দিচ্ছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এ ধ্বংসাত্মক ও বেআইনি যুদ্ধের অবসান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের স্যাম ভিগারস্কি একটি ঘনীভূত বহুমাত্রিক সংকটের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এ সংকট ‘ক্ষুধার্তদের আরও জরুরি পরিস্থিতির দিকে এবং যারা ইতোমধ্যেই জরুরি অবস্থার মধ্যে আছেন, তাদের দুর্ভিক্ষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’ লাখো মানুষের জন্য এই অর্থনৈতিক ধাক্কা শুধু দারিদ্র্য নয়, বরং এটি তাদের জন্য বাঁচা-মরার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
জ্বালানি খাতে ধাক্কার আশঙ্কা, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, প্রবাসী শ্রমবাজার, বেকারত্ব বৃদ্ধি, ডলারের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কাসহ নানা চ্যালেঞ্জে রয়েছে দেশের অর্থনীতি। ফলে বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এ যুদ্ধ থেকে তৈরি হওয়া সংকট দেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এর মধ্যে আছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, বাণিজ্য প্রবাহে বিঘ্ন, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাওয়া, প্রবাসী শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স প্রবাহে অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়া। উৎপাদন খরচ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অনেক ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপরও অনেকটা নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানির বাজার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেখানে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য প্রতি ব্যারেল মূল্য ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ অবস্থানে থাকলে তা বাংলাদেশের বহিঃখাতের ওপর বেশ চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে এবং বাণিজ্যঘাটতি সম্প্রসারিত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।
এ ছাড়া, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যবস্থাতেও প্রভাব ফেলছে। এ রুটে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো বিঘ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে ফ্রেইট চার্জ, বিমা প্রিমিয়াম এবং পণ্য সরবরাহের সময়সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, এ পরিস্থিতিতে উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন এবং সমুদ্রপথে পরিবহনে বাড়তি ঝুঁকির সম্মুখীন। বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি সংকটের প্রবল সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। যদি জ্বালানিসংকট তৈরি হয়, তবে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বেড়ে যাবে। উৎপাদন খরচ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পণ্যের দাম বাড়বে এবং মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। আইএমএফ ইতোমধ্যে পূর্বাভাস দিয়েছে যে সারা বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধির মাত্রা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানির অভাবে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে সমস্যার মুখে ফেলবে। সরবরাহ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হওয়ার ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি একটি বড় ধরনের চাপের সম্মুখীন হবে। সবশেষে একটি বাস্তবতা আবারও মনে করিয়ে দেয় বৈশ্বিক অর্থনীতির যুগে কোনো যুদ্ধই আর দূরের যুদ্ধ নয়। যুদ্ধক্ষেত্র হাজার মাইল দূরে হলেও তার অভিঘাত পৌঁছে যায় জ্বালানির দামে, খাদ্যপণ্যের বাজারে, ডলারের বিনিময় হারে, রপ্তানি অর্ডারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে। ইরানকে ঘিরে সংঘাত হয়তো দ্রুত শেষও হতে পারে। কিন্তু অনিশ্চয়তাই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। আর সেই অনিশ্চয়তার সময়ে যারা আগে প্রস্তুতি নেয়, তারাই তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ অপেক্ষা করা নয়- প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; তার ঢেউ এসে লাগে বাজারে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে
[email protected]


