দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করুন। আজকের সঠিক একটি পদক্ষেপ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে। আমরা চাই না আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা জ্বালানিসংকটের চোরাবালিতে হারিয়ে যাক।...

সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ ফিলিপাইন থেকে একটি সংবাদ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র দেশটিতে এক বছরের জন্য ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছেন। এর নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। প্রেসিডেন্ট মার্কোস সরাসরি বলেছেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বর্তমানে ‘আসন্ন বিপদের’ মুখে।
ফিলিপাইনের এ সিদ্ধান্ত কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং এটি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য একটি বড় ‘ও্যক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা। বিশ্বায়নের এ যুগে মধ্যপ্রাচ্যের একটি স্ফুলিঙ্গ কীভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্রের রান্নাঘর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে পারে, ফিলিপাইন তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই অশনিসংকেত পড়ার জন্য প্রস্তুত?
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও হরমুজ প্রণালির সমীকরণ
জ্বালানি নিরাপত্তার আলোচনায় ‘হরমুজ প্রণালি’ এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এ সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় ২১ শতাংশ পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এবং প্রচুর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এ পথ দিয়েই বিশ্ববাজারে যায়। যদি কোনো কারণে ইরান এ পথটি রুদ্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক রাতেই আকাশচুম্বী হবে। ফিলিপাইন দূরদর্শী দেশ হিসেবে বুঝতে পেরেছে যে, সংকটের পর হাহাকার করার চেয়ে সংকটের আগে প্রস্তুতি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তারা ৫ হাজার পেসো করে পরিবহন কর্মীদের সহায়তা দিচ্ছে এবং বাজারে কৃত্রিমসংকট রোধে কঠোর টাস্কফোর্স গঠন করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে অনেক মিল রয়েছে; বিশেষ করে রেমিট্যান্স এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের ওপর আমাদের উভয়েরই নির্ভরতা প্রচুর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি রূপান্তরের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ খাতের সিংহভাগ গ্যাস ও তেলের ওপর নির্ভরশীল। গত কয়েক বছরে আমরা দেখেছি কীভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ রয়েছে, তার একটি বড় অংশ ব্যয় হয় জ্বালানি আমদানিতে। এ অবস্থায় যদি ফিলিপাইনের আশঙ্কানুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে বড় কোনো বিপর্যয় ঘটে, তবে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতি তিনটি বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে:
১. মুদ্রাস্ফীতির ত্বরান্বিত হওয়া: জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে চাল, ডাল ও সবজির মতো নিত্যপণ্যের বাজারে।
২. উৎপাদন খাতের সংকট: আমাদের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি সংকটে উৎপাদন খরচ বাড়লে বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমে যাবে।
৩. কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা: সেচ মৌসুমে ডিজেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না হলে বোরোসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
কৌশলগত সমাধান: আমাদের যা করণীয়
একজন বিপণন বিশেষজ্ঞ এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, সম্ভাব্য এ সংকট মোকাবিলায় সরকারকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে:
১. কৌশলগত মজুত সক্ষমতা (Strategic Petroleum Reserve) নিশ্চিত করা: উন্নত দেশগুলোতে জরুরি সংকটের জন্য কয়েক মাসের জ্বালানি মজুত থাকে। আমাদের বর্তমান মজুত সক্ষমতা যথেষ্ট কি না, তা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি। কেবল বিপিসি (BPC) নয়, বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানিগুলোকেও নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি মজুত রাখতে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা যেতে পারে। জরুরি ভিত্তিতে ‘ফ্লোটিং স্টোরেজ’ বা ভাসমান মজুত ব্যবস্থার কথা ভাবা যেতে পারে।
২. আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ ও জ্বালানি কূটনীতি: আমরা দীর্ঘকাল ধরে নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক এ অস্থিরতায় আমাদের উচিত ‘এনার্জি ডিপ্লোম্যাসি’ বা জ্বালানি কূটনীতি জোরদার করা। মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প হিসেবে মধ্য এশিয়া (Central Asia) বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি (G2G) করা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
৩. অভ্যন্তরীণ খনিজ সম্পদ উত্তোলনে ‘যুদ্ধকালীন’ তৎপরতা: আমাদের নিজের ভূখণ্ডে থাকা প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে যে শ্লথগতি রয়েছে, তা আমাদের জন্য বিলাসিতা। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে আকর্ষণীয় পিএসসি (PSC) মডেল দ্রুত কার্যকর করতে হবে। নিজেদের সম্পদ মাটির নিচে রেখে আমদানিনির্ভর হওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না।
৪. জ্বালানি সাশ্রয়ে জাতীয় সচেতনতা ও স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট: ফিলিপাইনের মতো আমাদেরও কঠোরভাবে অপচয় রোধ করতে হবে। দিনের আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করা এবং ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। অফিসের কাজ বা মিটিংয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ানো গেলে পরিবহনের ওপর চাপ অনেকখানি কমে আসবে।
৫. প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী মানুষের সুরক্ষা: জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হন সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। সরকার যদি এখনই একটি ‘এনার্জি ক্রাইসিস ফান্ড’ গঠন করে, তবে সংকটের সময় কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ছোট পরিবহন কর্মীদের সরাসরি নগদ সহায়তা বা ‘ফুয়েল কার্ড’ প্রদান সহজ হবে। এটি কেবল মানবিক নয়, বরং অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য একটি দরকারি বিনিয়োগ।
৬. নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে বিপ্লব: আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি পথ হলো নবায়নযোগ্য শক্তি। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং উচ্চ কর কাঠামো তুলে দিয়ে ব্যাপক হারে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানোকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে হবে।
সংকট আসার আগে সতর্ক হওয়া ভীরুতা নয়, বরং বিচক্ষণতা। ফিলিপাইন যা আজ করছে, আমাদের হয়তো তা কাল করতে হবে। কিন্তু আমরা যদি কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি, তবে তা হবে অনেক দেরি। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের নাগালের বাইরে, কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি অবশ্যই আমাদের সামর্থ্যের ভেতরে।
সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের প্রতি সবিনয় অনুরোধ থাকবে- দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা টাস্কফোর্স’ গঠন করুন। আজকের সঠিক একটি পদক্ষেপ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সংকট থেকে রক্ষা করতে পারে। আমরা চাই না আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা জ্বালানি সংকটের চোরাবালিতে হারিয়ে যাক।
লেখক: গবেষক এবং চেয়ারম্যান, মার্কেটিং বিভাগ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


