ঢাকা ৫ আষাঢ় ১৪৩৩, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
লাল কার্ডের পর বসনিয়ার জালে সুইজারল্যান্ডের গোল উৎসব অসুস্থ মেসির বাবা, গুজব ছড়ানোয় ক্ষুব্ধ পরিবার গোলশূন্য সমতায় বিরতিতে সুইজারল্যান্ড-বসনিয়া অবশেষে কাটল ভিসা জটিলতা, কানাডায় খেলতে পারবেন ওয়াহি বিশ্বকাপে সহজ ম্যাচ বলে কিছু নেই: ডগলাস সান্তোস বিশ্বকাপে সৌদি আরবের জন্য ভিন্ন নিয়ম পেনাল্টি গোলে চেক প্রজাতন্ত্রকে রুখে দিল দক্ষিণ আফ্রিকা অপ্সরার আন্তর্জাতিক অভিষেক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে গিয়ে কারাগারে আওয়ামী লীগ নেতা বাদশা গণপিটুনির শিকার তিন ডিবি সদস্য, উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি মেনে নাও, মেসি সেরা: রোনালদো নাজারিও কেইনের প্রেরণা এমবাপ্পে-হালান্ড কুমিল্লায় ধর্ষণকাণ্ড: গ্রেপ্তার শিবির নেতার পক্ষে দাঁড়ানো দুই এপিপির নিয়োগ বাতিল টাঙ্গাইলে প্রতিমন্ত্রী টুকুর নামে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ১ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে প্রথমার্ধে এগিয়ে চেক প্রজাতন্ত্র টাকার অভাবে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত, সহায়তার আবেদন রাজবাড়ীতে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ নেইমার ভক্তদের জন্য দুঃসংবাদ সাবেক মন্ত্রী হারুণ অর রশীদ অর নেই কুমিল্লায় মাদক মামলায় কারাবন্দি যুবদলকর্মীর মৃত্যু চুয়াডাঙ্গায় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু হাইতির বিপক্ষে নামার আগে ব্রাজিলকে সুখবর দিল ফিফা ওয়ালটন পিসিবিএ'র রপ্তানি উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হলো গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ কনফারেন্স ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ, গণপিটুনির শিকার তিন পুলিশ বিশ্বকাপে ৩ ম্যাচ নিষিদ্ধ দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার সময় টিভির সাবেক এমডি জোবায়ের কারাগারে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় ইইউর ১.৪ কোটি ইউরো অনুদান বিশ্বকাপে বড় ধাক্কা খেল আইভরি কোস্ট, কানাডার ভিসা পেলেন না ওয়াহি মাগুরায় নবজাতককে বিক্রি করলেন বাবা

মমতার সঙ্গে বিজেপির তলে তলে বোঝাপড়া!

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
মমতার সঙ্গে বিজেপির তলে তলে বোঝাপড়া!
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

নির্ভয়াকাণ্ডের পর রাস্তার দখল চলে গিয়েছিল বামশক্তির হাতে। সিপিআই (এম), নকশালপন্থি, এসইউসিআই (সি)-এর মতো বামশক্তিই মূলত আন্দোলনের চালক হয়েছিল। মোহন ভাগবতের সামনে তখন একটাই পথ খোলা ছিল, তা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে বাম শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।...

পশ্চিমবঙ্গে কি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসনই হতে চলেছে? এই আশঙ্কায় শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নয়, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের একই চিন্তা।

অ্যাডজুডিকেশন পর্ব যদি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের তারিখের মধ্যে না মেটে, সে ক্ষেত্রে লাখ লাখ ভোটারকে বাদ রেখে ভোট করানো কি আদৌ সম্ভব। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্ট কিছুতেই ন্যায্য ভোটারকে বাদ রেখে ভোট করাতে দিতে রাজি হবে না। কারণ, কোনো ন্যায্য ভোটারকে বাদ রেখে ভোট করালে তা জনপ্রতিনিধি আইন ভঙ্গের শামিল। এ বেআইনি কাজ কিছুতেই করতে দেবে না সুপ্রিম কোর্ট।

গত সপ্তাহেও এসআইআর নিয়ে শুনানি পর্বে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রাজ্য সরকার ও সিপিআই (এম)-এর আইনজীবীদের আশ্বস্ত করে বলেন, প্রয়োজনে নাম নথিভুক্ত করার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু নাম তোলার সময়সীমা পেছালেও, বাড়তি সময়ের মধ্যে সব বিবেচনাধীনের নাম যে নিষ্পত্তি হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। শুধু তাই নয়, যারা অ্যাডজুডিকেশন পর্বে নাম বাদ যাওয়ার পর ট্রাইব্যুনালে আপিল করবেন, তারাও চাইবেন গোটা ব্যাপারটার নিষ্পত্তি না করে যেন ভোট না হয়। কারণ যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রমাণ হচ্ছে তারা ভুয়ো ভোটার, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ম্যাপড্‌ ভোটার হিসেবেই চিহ্নিত হবেন। অর্থাৎ ২০০২ সালে বা তার পরের ভোটার লিস্টে তাদের নাম ছিল ধরে নিয়েই ভোট করাতে হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কি এই শর্তে ভোট করাতে রাজি হবে। নিশ্চয় না।

এই ডামাডোল সহজে মেটার নয়। সে ক্ষেত্রে বিধানসভার মেয়াদ অর্থাৎ ৬ মে উত্তীর্ণ হয়ে যেতে পারে। মেয়াদ উত্তীর্ণ বিধানসভা ভেঙে দেওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকবে না কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। আইন বলছে, কোনো রাজ্যে নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যদি নির্বাচন না করা যায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা যেতে পারে। এর ভিত্তি হলো ভারতীয় সংবিধানের ৩৫৬ অনুচ্ছেদ। যদি রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় কিন্তু কোনো কারণে নির্বাচন করা না যায় (আইনশৃঙ্খলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংকট ইত্যাদি), তখন রাষ্ট্রপতি ৩৫৬ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনা করাতে পারেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা মোস্তারি বানু পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের বিরুদ্ধে প্রথম মামলা করেছিলেন। পরবর্তী অন্য একাধিক আবেদনের ভিত্তিতে চলছে শুনানি। মুর্শিদাবাদের পার্শ্ববর্তী রাজ্য মালদার কংগ্রেস নেতা ঈশা খান চৌধুরী সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মালদা জেলায় বড়জোর ৭০-৮০ লাখ লোকের বাস। অথচ সেখানেই নাকি ১ কোটি রোহিঙ্গা আছে বলে হইচই শুরু করেছিল বিজেপি। এসআইআর করে একজন রোহিঙ্গাও খুঁজে পায়নি মোদি সরকার। মাঝখান থেকে কয়েক প্রজন্ম ধরে ভোট নিয়ে আসা জেনুইন ভোটারদের নাম বাদ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রসঙ্গে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, দেশের অন্যান্য রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া মসৃণ হলেও পশ্চিমবঙ্গেই সমস্যা হচ্ছে। আপাতত আনুমানিক ২৮ লাখ নামের ফয়সালা হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর। যদিও ঠিক কত ভোটারের নাম বাদ গেছে তা নির্বাচন কমিশনও বলতে পারেনি। উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার লিস্ট বের হওয়ার পর দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লাখের বেশি নাম ‘বিবেচনাধীন’।

মনোনয়ন জমা শেষ হওয়ার মধ্যে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখনো ৩১ লাখের নাম বিবেচনার কাজ বাকি রয়েছে। নাম বাদ পড়লে ফের আবেদন করতে হবে কমিশনের মাধ্যমে, তার ফরসালা তবে ট্রাইব্যুনালে। এখনো ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে তথ্য নির্দিষ্ট হয়নি।

সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা ভোটের সাত দিন আগে পর্যন্ত পেছানোর প্রস্তাব দেন আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। এ প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে বলে জানান প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে বিবেচনা করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত পদ্ধতি ঠিকঠাকই চলছে। ট্রাইব্যুনালের কাজ এখনই চালু করার জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদনও জানান আইনজীবী দিওয়ান।

উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টই এই মামলায় বিবেচনাধীন নামের নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতিদের নিয়োগের নির্দেশ নিয়েছিল। গত ১১ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে অনুরোধ পাঠিয়েছিল শীর্ষ আদালতই। কমিশনের অভিযোগ ছিল রাজ্য সরকার পর্যাপ্ত আধিকারিক দেয়নি বলে বাইরের রাজ্য থেকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করতে হয়েছিল।

খসড়া তালিকা প্রকাশের পর ম্যাপিংয়ে সমস্যা না হলেও ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’ (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) খোঁজার পদ্ধতি চালু করে কমিশন। চূড়ান্ত তালিকায় বিপুল সংখ্যায় বিবেচনাধীন নামের তালিকা তৈরি হয় সে কারণেই। কমিশনের দাবি, অন্য রাজ্যেও ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’ খোঁজা হয়েছে। তবে স্বীকার করেছে যে পশ্চিমবঙ্গে এই পদ্ধতির ভিত্তিতে অনেক বেশি নাম চিহ্নিত হয়েছে।

রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু, মতুয়া, আদিবাসী এবং মহিলাদের নাম বাদ পড়েছে অনুপাতে বেশি। সংখ্যালঘুপ্রধান এলাকায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির নামে বাদ পড়ার ঘটনা রয়েছে।

এদিকে বাস্তব রাজনৈতিক ছবিটি হলো- পশ্চিমবঙ্গ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপসারণ একেবারেই বিজেপির কাছে কাম্য নয়। এর প্রধান কারণ হলো, ভারতের সংসদে যখনই প্রয়োজন হচ্ছে তখনই বিজেপির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িতে দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি কোনো বিতর্কেও অংশ নিচ্ছে না তারা। তলে তলে বোঝাপড়া এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যে, বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় সরকারের যে গড়িমসি বা অস্বস্তি থাকার কথা, তৃণমূল কংগ্রেসের দৌলতে তা আদৌ নেই। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহরা এমনভাবে মমতার সঙ্গে বোঝাপড়া করেছেন যে, কখনই এনডিএ সরকার ফেলে দেওয়ার প্রশ্নে মমতা বিরোধীদের সঙ্গ দেবেন না। এর পরিবর্তে বাংলায় তৃণমূল কংগ্রেসের শাসন যাতে বজায় থাকে তার ব্যবস্থা করবে কেন্দ্রীয় বিজেপি। রাজ্য বিজেপি নেতারা যতই হম্বিতম্বি করুক। শুভেন্দু অধিকারী যতই ২০০ পার হয়ে যাবেন বলে চিৎকার করুন, আদতে কেন্দ্রীয় সরকারের মদদ কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই। তার কারণ কেন্দ্রীয় সরকার বাঁচানোই এখন নরেন্দ্র মোদিদের প্রধান লক্ষ্য। যদিও এখানে বলে রাখা দরকার- তৃণমূল কংগ্রেস আদৌ জাতীয় পর্যায়ের কোনো দল নয়। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপিসহ জাতীয় পর্যায়ের যে দলগুলো আছে সেগুলো হলো- কংগ্রেস, সিপিএম এবং সিপিআই।

বাংলার রাজনীতিতে ‘তৃণমূল-বিজেপি সেটিং’ দীর্ঘদিনের বহুল চর্চিত বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই দল একে অপরের কট্টর বিরোধী। কিন্তু সংসদের অন্দরে গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস এবং বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভূমিকা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তৃণমূল ও বিজেপির এই ‘লড়াই লড়াই খেলা’র আড়ালে যে এক গভীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আদান-প্রদান রয়েছে, তা সংসদের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ থেকে স্পষ্ট। যেখানে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা হয় এবং পর্দার আড়ালে চলে ক্ষমতার আখের গোছানো।

মমতার সঙ্গে সেটিং প্রমাণ হয়ে গেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোর ভূমিকায়। বালু, কয়লা, নিয়োগ দুর্নীতিতে কালীঘাটের বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে একগাদা তথ্যপ্রমাণ কেন্দ্রীয় এজেন্সির হাতে এসেছিল। কিন্তু কোনো মামলাতেই তাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়নি। নিয়োগ মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্থা লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের নামে চার্জশিট দেওয়া হয়। চার্জশিটে ওই সংস্থার ‘জনৈক কর্ণধার’ বলে একজনের কথা উল্লেখ থাকলেও কখনোই তিনি কে, তা খোলসা করে বলা হয়নি। কিন্তু কেন? মমতার ভ্রাতুষ্পুত্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত সুজয়কৃষ্ণ ভদ্র রহস্য করে বলেছিলেন, তার বসকে কেউ ধরতে পারবে না। কার্যত সেই রাস্তাতেই হেঁটেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। এভাবে মমতা-অভিষেককে ক্লিনচিট দেওয়াটা যে বিজেপি কর্মীরাও ভালো চোখে নেননি, তার প্রমাণও মিলেছে। অমিত শাহ এ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের কর্মিসভা করতে এসে দলীয় মধ্যস্তরের নেতাদের কাছ থেকে এ প্রশ্নই পেয়েছেন। তারা স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মানুষের কাছে কেন্দ্রীয় এজেন্সির ব্যর্থতা নিয়ে জবাবদিহি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন। কবে পিসি-ভাইপোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বলা বাহুল্য, এ কথার কোনো উত্তর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে আসেনি।

সেটিং আবহে যে বিজেপি কোনোদিনই তৃণমূল কংগ্রেসকে ছোঁবে না তা আরও একটি ঘটনায় জলের মতো পরিষ্কার হয়েছে। আরএসএস-এর পক্ষ থেকে বারবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করা হয়। আরএসএস-এর সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত আরজি কর হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তার ধর্ষণ ও খুনকাণ্ডের পর বলেছিলেন, রাজ্য সরকার যেভাবে তদন্ত করবে সঙ্ঘ তাতেই সম্মতি দেবে। এ কথা বলেছিলেন একটাই কারণে। সে কারণটা হলো বাম অভ্যুত্থানের ভূত দেখতে পেয়ে আশঙ্কিত হয়ে পড়া। নির্ভয়াকাণ্ডের পর রাস্তার দখল চলে গিয়েছিল বামশক্তির হাতে। সিপিআই (এম), নকশালপন্থি, এসইউসিআই (সি)-এর মতো বামশক্তিই মূলত আন্দোলনের চালক হয়েছিল। মোহন ভাগবতের সামনে তখন একটাই পথ খোলা ছিল, তা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে বাম শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

এ পরিস্থিতিতে বিজেপি নেতৃত্ব একেবারেই তৃণমূল কংগ্রেসকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরাতে আগ্রহী নয়।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তিচুক্তি ও বৈশ্বিক বাস্তবতা
রায়হান আহমেদ তপাদার

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের ৩৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন যার মধ্যে ১৭০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩৭০০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশসমূহে ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন সেনা সরাসরি যুদ্ধে এবং দুজন অন্যান্য কারণে নিহত হয়েছেন। এ চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।...

দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও তীব্র কূটনীতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ১৪ জুন যৌথভাবে এ ঘোষণা দেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও একযোগে এ ঘোষণা সম্প্রচার করা হয়। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে, যা ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে সই হবে। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। অবশ্য এই সময় থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েকবার বিক্ষিপ্ত পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা উভয়ের পক্ষ থেকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পরিচালিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত দুই দফা হামলায় ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশকেই লক্ষ্যবস্তু করতে হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রঘাঁটি লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা হিসেবে বাহরাইন, জর্দান ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে উদ্দেশ করে হামলায় উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কিছু আনুষ্ঠানিকভাবে না জানানো হলেও বলা হয়েছে, ইরান আর হামলা না করলে তারাও হামলা চালাবে না। সে ক্ষেত্রে ইরানের এই মুহূর্তের অন্যতম দাবি হচ্ছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে হিজবুল্লাহকে টার্গেট করে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত যে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ইরানকে সংগত কারণেই এর জবাব হিসেবে ইসরায়েলে হামলা চালাতে হচ্ছে, যা একটি সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার শান্তিচুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে কিছুদিন ধরে এ বিষয়কে কেন্দ্র করেই সম্পর্ক খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। সর্বশেষ ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার পাল্টাপাল্টি হামলার পর এক টেলিফোন কথোপকথনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছেন যে, তাদের কারণে যদি ইরানের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াবে না, তাদের একাই চলতে হবে। প্রায় দুই মাস ধরে একটি চুক্তিস্বাক্ষরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনেক দেনদরবার চলছে। ইসলামাবাদ থেকে শুরু হওয়া আলোচনাটি এখন ইউরোপের জেনেভায় গিয়ে ঠেকেছে। এ সময়ের মধ্যে ট্রাম্প বেশ কয়েকবারই বলেছিলেন, একটি চুক্তির প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে দুই পক্ষই। তবে এ বিষয়ে ইসরায়েল রয়েছে অন্ধকারে। জানা গেছে, তারা নানাভাবে এ চুক্তির বিষয়বস্তুগুলো নিয়ে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে এবং একটি চুক্তিস্বাক্ষরের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার জন্য যত দূর কূটকৌশল অবলম্বন করা দরকার, এর সবটাই করে যাচ্ছে। লেবাননে এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ইসরায়েলের এ ধরনের অবস্থান এ যুদ্ধকে প্রলম্বিত করতে চাওয়াকে এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ভালোভাবে দেখা হচ্ছে না। এ যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ নানা চাপে জর্জরিত। সে দেশের জনমত এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে, ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানরা দ্বিধাবিভক্ত, রয়েছে আইনি জটিলতা এবং আর্থিক চাপও। এসব সামাল দিতে এখন তারা যুদ্ধবিরতি অবস্থাকে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে ইতি টেনে মান রক্ষার সর্বশেষ চেষ্টা করছে। ইরানকে তারা যতটা একা ভেবেছিল এবং তাদের সামর্থ্যকে যতটা খাটো করে দেখেছিল, এমনটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি, বরং চীন ও রাশিয়ার রহস্যজনক ভূমিকাটা এখানে অনেক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সুতরাং, এ যুদ্ধে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী হওয়া বেশ কঠিন। একটি চুক্তিস্বাক্ষরের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোয় ইরানের অবস্থান একে আরও জোরালোভাবে প্রমাণ করেছে। হরমুজ প্রণালিকে দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা তাদের সামর্থ্যের ভালোই প্রমাণ দিয়েছে। এখন দর-কষাকষিতে ইরান এমন কিছু দাবি সামনে নিয়ে এসেছে, যাতে যুদ্ধকালে, এমনকি যুদ্ধপূর্ব সময়ে তারা যেসব আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল, সেগুলো পুষিয়ে নেওয়া যায়। এত বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় ইরানের শত শত কোটি জব্দ ডলার ফেরত চাওয়া ছাড়াও ইরানের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিকে তারা চুক্তিস্বাক্ষরের ক্ষেত্রে অন্যতম শর্ত হিসেবে তুলে ধরছে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেসব দাবি সামনে আনা হয়েছে, তা হচ্ছে–ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে দিতে হবে এবং তারা ভবিষ্যতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, সেই নিশ্চয়তা। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যদি হস্তান্তর করতেই হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই কেন করতে হবে, এটি একটি বড় প্রশ্ন। এর কোনো সদুত্তর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও জানানো হয়নি। বিষয়টি এখন এমন একপর্যায়ে রয়েছে যে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানো যেতে পারে–এমন বিষয়ে উভয় পক্ষই সম্মত হয়েছে। আর সেটি করা গেলে ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন করবে না–এমন শর্ত আরোপ করার আর প্রয়োজন হবে না। ইরানের পক্ষ থেকে অবশ্য বারবারই বলা হচ্ছিল যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে ইচ্ছুক নয়, বরং তারা পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করতে চায়। এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দুর্বল দিকটি হচ্ছে, ইরাকযুদ্ধের মতো করে তারা ইরানযুদ্ধকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল।

ইতিহাসের এই পুনরুত্থান ঘটাতে গিয়ে তারা হোঁচট খেয়েছে, ইরানকে ইরাকের মতোই দুর্বল ভেবেছে এবং বড় ভুল করেছে। সবচেয়ে সহজ কাজটিকে তারা অনেক জটিল করেছে এবং সেটা ইসরায়েলের স্বার্থে দেখতে গিয়েই তারা করেছে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার সময়ে ইরানের সঙ্গে ছয় জাতি চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনাই যদি করে থাকতেন, তাহলে হয়তো তার স্বপক্ষে একটি গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের কিছুটা বৈধতা থাকত। কিন্তু বিষয়টিকে করা হয়েছে শুধু ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থকে অগ্রভাগে রেখে। কেননা, যুক্তরাষ্ট্র যখন এ চুক্তি থেকে সরে আসে, তখন ইরানের বিরুদ্ধে চুক্তির কোনো শর্ত লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধ ছিল না, ছিল শুধু নেতানিয়াহুর প্ররোচনা। ট্রাম্প সে ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন। চূড়ান্ত সর্বনাশ ঘটিয়েছেন এ দফায় নির্বাচিত হয়ে একই ফাঁদে পা দিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সর্বশেষ দাবি করা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। দুই পক্ষের মধ্যে এ ক্ষেত্রে মৌলিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের বিষয়বস্তু স্পষ্ট করা না হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি আগের মতোই উন্মুক্ত করে দেবে। সেই সঙ্গে এ সমঝোতা স্মারকের সমাপ্তি ঘটবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যদিয়ে। অবশ্য এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ইরান শর্তগুলো মেনে চললে তাদের জব্দকৃত কিছু সম্পদ অবমুক্ত করাসহ মার্কিন অবরোধ কিছু সময়ের জন্য তুলে নেওয়া হবে, যেন ইরান আন্তর্জাতিক পরিসরে বাণিজ্যের মাধ্যমে কিছু রাজস্ব সঞ্চয় করে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, এখানে ইসরায়েলের ভূমিকা এখনো স্পষ্ট নয় এবং তাদের দাবি হচ্ছে, বর্তমানে এনিয়ে কী হচ্ছে না হচ্ছে, এর কিছুই যুক্তরাষ্ট্র তাদের জানাচ্ছে না। এমন অবস্থায় এ ধরনের সমঝোতা স্মারক সই এবং পরবর্তী সময়ে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর সত্যিকার অর্থে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনয়নের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারে না। বিষয়টি এমন যে, এই মুহূর্তে নিজেদের স্বার্থে একটি চুক্তির দোহাই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আপাতত সরে যাচ্ছে। তবে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার শঙ্কা থেকেই যাবে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ইসরায়েলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্তভাবে নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ খুবই সংকুচিত। সম্ভবত বিষয়টি আঁচ করেই ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের সমঝোতা হওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি সবটাকেই গুজব বলে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে এখনো অনেক বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে। তবে চুক্তি হোক আর না-ই হোক, ইসরায়েলকে তাদের বর্তমান আগ্রাসী অবস্থায় রেখে শুধু ইরানকে নিবৃত্ত করতে যাওয়াটা ইরানকে আবারও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে শক্তি সঞ্চয়ের তাড়া দেবে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে এ পর্যন্ত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইরানের ৩৬০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন যার মধ্যে ১৭০০ জন ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩৭০০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া উপসাগরীয় দেশসমূহে ৩৬ জন, ইসরায়েলে ২০ জন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৩ জন সেনা সরাসরি যুদ্ধে এবং দুজন অন্যান্য কারণে নিহত হয়েছেন। এ চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটিয়ে তেলের বিশ্ববাজারে স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, যুক্তরাজ্য 
[email protected]

বাজেট ২০২৬-২৭ সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর
ড. মোস্তাফিজুর রহমান

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। যারা নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে এবং জনগণের জন্য দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে...।  

 

এবারের বাজেট নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় বাজেট ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আশা নিয়ে সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছেন, তার প্রতিফলন তারা বাজেটে দেখতে চাইবেন। তবে বাজেট কেবল অঙ্কের হিসাব নয়; এর সাফল্য নির্ভর করে বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। অতীতে দেখা গেছে, উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ সময়মতো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ প্রত্যাশিত নয়, মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও এক ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে ফিরিয়ে আনা। একই সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন খাতে করছাড় দেওয়া হলে রাজস্ব আয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন করদাতা যুক্ত করা, করের আওতা বিস্তৃত করা ও প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দিকে সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে কর ফাঁকি রোধ এবং বাড়াতে হবে আদায় ব্যবস্থার দক্ষতা। কারণ, ব্যয় বাড়লেও যদি আয় সমানতালে না বাড়ে, তাহলে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ পরিচালন ব্যয়ের অন্যতম বড় খাতে পরিণত হয়েছে। ফলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও ব্যয়ের কার্যকর বাস্তবায়ন–এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। এসব খাতে বরাদ্দ ও কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপরও জোর দিতে হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য কর-সুবিধা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, হয়রানি হ্রাস, সিঙ্গেল উইন্ডো সেবা ও আধুনিক লজিস্টিকস ব্যবস্থার মতো উদ্যোগ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে। যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, সরকার নানা খাতে ছাড় দিয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। উচ্চমূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, দুর্বল বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাতের চাপের মধ্যে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বেসরকারি খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। বিশেষ করে ব্যাক্ত খাতে এক ধরনের আস্থার অভাব রয়েছে। কাজেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে তা ফিরিয়ে আনতে হবে।

নতুন বাজেটে ব্যক্তি খাতে ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত এ হার ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই ব্যবধানই বিনিয়োগ পরিস্থিতির দুর্বলতা তুলে ধরে। গত প্রায় চার বছর ধরে উচ্চমূল্যস্ফীতি অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সেটা অর্জন করতে হলে অনেক ভালো ভালো পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি অবলম্বন করতে হবে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরও কিছুদিন চালিয়ে নিতে হবে। খাদ্য সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। চালে সরবরাহজনিত সমস্যা আছে। সেখানে নজর দিতে হবে। জ্বালানিসংকটের সমাধান প্রয়োজন। সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই এখন চাপে রয়েছে। যদিও রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে, তবুও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো দুর্বল। সেদিক বিবেচনায় সামষ্টিক অর্থনীতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা দেখলে বোঝা যায় আগামী বাজেট বাস্তবায়নের বড় আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এত বড় বাজেটের বড় আকাঙ্ক্ষাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ার প্রবণতাও তুলে ধরা হয়। অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হচ্ছে না, ফলে ব্যয় বাড়ছে এবং কার্যকারিতা কমছে। একই সঙ্গে অনেক প্রকল্পে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা দুর্বল থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ার ঝুঁকির সম্ভাবনাও আছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে বিনিয়োগ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে উন্নয়ন ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কৌশল স্পষ্ট করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ আরও বাড়বে। প্রস্তাবিত বাজেট মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার কথা বললেও, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা অর্জন খুব দরকার।

নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপরেখা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা বিকাশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাজেটে। বাজেটের এ দৃষ্টিভঙ্গি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বাচনি অঙ্গীকারে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়, বাজেটেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চমূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে অর্থনীতি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে মানব উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নতুন সরকারের জন্য এ বাজেট একটি বড় সুযোগ। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই সরকারের প্রথম বড় অর্থনৈতিক নীতিপত্র, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করা সম্ভব হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা শক্তিশালী করার যে লক্ষ্য বাজেটে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বাস্তব অগ্রগতি আগামীর প্রধান বিবেচ্য বিষয় হবে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এর আকার দিয়ে নয়, বরং বাস্তবায়নের গুণগত মান এবং জনগণের জীবনে এর প্রভাব দিয়ে।

বাজেট বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। যারা নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে এবং জনগণের জন্য দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত করবে। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না এবং কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে কি না, সেদিকেও নজর দিতে হবে। বাজেটের আকার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় হলেও সেটিই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। বাস্তবায়ন সক্ষমতা দুর্বল হলে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে। এজন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি, নীতির কার্যকর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

লেখক: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)Save

বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
বাজেট: উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সম্ভাবনা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
মহিদুল ইসলাম হাওলাদার

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বাজেট। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, উচ্চাভিলাষী বাজেট রাজনৈতিক সরকারগুলোর জন্য নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, উচ্চমূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের উচ্চাভিলাষী বাজেট খুব কমই দেখা গেছে।

 

এবারের বাজেটের মূল দর্শন হলো সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা এবং প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করা। অর্থনীতিকে গতিশীল করার এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। মূল প্রশ্ন হলো–এই বিপুল ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

সরকার আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে ৬ লাখ কোটিরও বেশি। বাস্তবতা হলো, গত এক দশকের অভিজ্ঞতায় প্রায় প্রতি অর্থবছরেই রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে থেকেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে মন্থরতা এবং কর প্রশাসনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় এ লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়।

রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে বাজেট ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পাবে। তখন সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ, বৈদেশিক ঋণ অথবা অন্যান্য অর্থায়নের উৎসের ওপর অধিক নির্ভর করতে হবে। বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়।

বাজেটে বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কঠোর শর্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ছাড়ের জটিলতার কারণে এ অর্থ প্রত্যাশিত মাত্রায় ও নির্ধারিত সময়ে পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতাও সে আশঙ্কাকে উড়িয়ে দেয় না। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নে ঘাটতি দেখা দিলে তার চাপ সরাসরি দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের ওপর এসে পড়বে।

এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা। দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্যসংকট এবং কিছু ব্যাংকের প্রতি আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সরকার যদি অতিমাত্রায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়ন আরও সংকুচিত হবে। এর ফলে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ হলো মূল্যস্ফীতি। রাজস্ব ও ঋণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ইতোমধ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।

এবারের বাজেটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনতে পারে। এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

আমার বিবেচনায় বাজেট বাস্তবায়নের পথে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো–উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা সংগ্রহে সম্ভাব্য ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও তারল্যসংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব, উচ্চমূল্যস্ফীতি ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি।

আমাদের প্রতিবেশী ভারতও নিয়মিতভাবে বড় আকারের ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থা, পুঁজিবাজার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক গভীর ও শক্তিশালী। ফলে তারা সহজেই অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখনো সে পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই একই ধরনের ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি কঠিন।

বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী, প্রবৃদ্ধিমুখী এবং রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্বব্যবস্থা, দক্ষ প্রশাসন, সুস্থ ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং বাস্তবভিত্তিক অর্থায়ন পরিকল্পনা।

আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়, এই বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। প্রয়োজনীয় সংস্কার, সুশাসন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। তাই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: সভাপতি, জাতীয় পার্টি, মাদারীপুর জেলা শাখা এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা

আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীন ও তারেক রহমানের সফর

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীন ও তারেক রহমানের সফর
গাজীউল হাসান খান

চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারার মধ্যে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ চীনের পরিকল্পিত নিরাপত্তা কিংবা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হবে অনেক ব্যাপক। সেগুলো নিশ্চিত করবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে (বিআরআই) এক সূত্রে গাঁথবে; আমরা যার অংশীদার হতে চাই। আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে চাই, আর শোষণ-শাসনের নিগৃহীত বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে চাই না।...

মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমেই এখন এক বহুমুখী ক্ষমতার বলয় গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে। শুধু পশ্চিমা রাজনৈতিক আধিপত্য নয়, সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী এ পরিবর্তনের ধারা শুরু হতে দেখা গেছে নব্বইয়ের সূচনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই। দ্বিকেন্দ্রিক ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ভেঙে বিভিন্ন অঞ্চলনির্বিশেষে বিভিন্ন শক্তির অভ্যুদয় ক্রমে ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তাতে বিশ্বব্যাপী কারও একচ্ছত্র আধিপত্যের পরিবর্তে বরং গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের বিকাশ কিছুটা সহজসাধ্য হচ্ছে এবং পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সামরিক দিক থেকে নিরাপত্তার বিষয়গুলো জোরদার হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। সে কারণে ভারতের কাছে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য রক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে অবস্থিত মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডর বা সীমান্ত পথ রক্ষা করার তাগিদ দেখা দিয়েছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে তাদের সোশ্যাল মিডিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত অতি উৎসাহী কিছু ব্যক্তি কখনো বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগ এবং পাশাপাশি ভারতের স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোকে রক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকল্পে এ বিভাগের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অখণ্ডতা কিংবা সার্বভৌমত্ব রক্ষাকল্পে তার লালমনিরহাটসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য বিমান ঘাঁটিসহ অন্যান্য স্থাপনার কাজ অতি দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি বিভিন্ন সামরিক অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের কাজে হাত দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সীমান্ত সমস্যা ভারতের অরুণাচল রাজ্যের সঙ্গেও তার প্রতিবেশী চীনের রয়েছে। কাশ্মীরে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সংঘর্ষের কোনো স্থায়ী সমাধান বা অবসান আজও হয়নি। এ অবস্থায় রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশেষ করে গাজাসহ ফিলিস্তিন-ভিত্তিক ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও তার সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের সংঘর্ষের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সার্বিক উন্নয়ন চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের দুই অন্যতম প্রধান পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে, অবিলম্বে এ অবস্থার পরিবর্তন হতে হবে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় তাকে বলেছেন যে, চীনের উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ কর্মসূচির কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারিত করার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। এমন একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি মাসের শেষের দিকে চীন সফরে যাচ্ছেন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। চীনের সঙ্গে বহু কারণে এ দেশের পরলোকগত নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং বিশেষ করে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ সম্পর্ক ছিল। উন্নয়ন, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বিনির্মাণের ক্ষেত্রে চীন আমাদের দীর্ঘদিনের কৌশলগত মিত্র। সে কারণে বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতিতে চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিপ্লব-উত্তর বিগত প্রায় ৭৭ বছরে চীন তার পঞ্চশীলা নীতি অনুযায়ী ভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির বরখেলাপ। কিন্তু গত বছর চীনের প্রণীত ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সূচিত হয়েছে বিরাট পরিবর্তন। গণচীনের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, তাতে জাতীয় নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যায়ে তুলে আনা হয়েছে। সে হিসেবে চীনের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি এখন অনেক গুরুত্ব লাভ করেছে। সে কারণে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সামরিক ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে। তাতে অভ্যন্তরীণ এবং এমনকি পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও বিরাট পরিবর্তন আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ চীনের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এবং উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে প্রথমে প্রয়োজন যোগাযোগব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন। এ ক্ষেত্রে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে উন্নয়নকে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি। তাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নকে অগ্রসর কিংবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশ ও অঞ্চলের সঙ্গে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চীন তিনটি বিষয় নির্ধারণ করেছে। সেগুলো হচ্ছে: কৌশলগত গঠনশীল স্থিতিশীলতা (Constructive Strategic Stability), বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (Gobal Development Initiative) এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা উদ্যোগ (Global Security Initiative)। এর মাধ্যমে তারা আগামী ১০ বছর অর্থাৎ ২০৩৫ সালের মধ্যে আধুনিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনার পক্ষপাতি। তাই তারা এখন থেকেই প্রচার করছে যে, নিরাপত্তা হচ্ছে উন্নয়নের পূর্ব শর্ত। সে শর্ত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নিরাপত্তাবেষ্টনী বা বলয় গড়ে উঠতে পারে। সে প্রস্তাবিত নিরাপত্তাবলয় শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা জগতের নিরাপত্তাব্যবস্থা ন্যাটোর মতো হবে কি না তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটি ধরে নেওয়া হচ্ছে যে, বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে যৌথভাবে গড়ে তোলা কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে বিভিন্ন অঞ্চলিক উদ্যোগ, ব্যবস্থা কিংবা চুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।

ওপরে উল্লিখিত প্রাতিষ্ঠানিক ধ্যান-ধারণা থেকেই একদিন সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন গঠন করা হয়েছিল। এ সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাটি গঠিত হয়েছিল ২০০১ সালের ১৫ জুন। চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, তাজিকস্তান, কিরঘিজস্তান ও উজবেকিস্তানকে নিয়ে এ সহযোগিতা সংস্থা গঠন করা হয়েছিল। পরে ভারত পাকিস্তান ও বেলারুশ তাতে যোগ দেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা এবং সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ ঠেকানোও এর একটি বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। এ প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে ক্রমে চীনের উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোদার করার পরিকল্পনা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এর সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য হতে পারে সাম্রাজ্যবাদ ও পশ্চিমা সামরিক আগ্রাসন ঠেকানো। চীন ক্রমে ক্রমে তার প্রতিবেশীদের নিয়ে সে দিকেই অগ্রসর হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাজার, বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্থা এবং ডলারের আধিপত্যরোধ করার জন্য চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে ২০০৯ সালে অর্থনৈতিক সংস্থা ব্রিকস গঠিত হয়েছিল। তাতে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয় ২০১১ সালে। যুক্তরাষ্ট্র এ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি ভেঙে দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে অত্যন্ত তৎপর হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে রাশিয়া এখনো এ প্রতিষ্ঠানে ততটা অবদান না রাখতে পারলেও বিশেষ করে চীন, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার কারণে ব্রিকস এখনো শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তবে ভারত ব্রিকস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতে পারে। তখন তার স্থলাভিষিক্ত হতে পারে ইরান। তা ছাড়া বাংলাদেশও বিশেষ একটি ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে তা বিশেষভাবে নির্ভর করবে, বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর।

চীন বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক বিএপি সরকার চীনের সঙ্গে অতীতে একযোগে কাজ করেছে অত্যন্ত নির্ভরতার সঙ্গে। শহিদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী। এটি চীনের সরকার এবং জনগণের কাছে নিঃসন্দেহে একটি গভীর আস্থা ও সম্মানের বিষয় হতে পারে। কিন্তু ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে গেছেন, যা আইনসঙ্গতভাবে তিনি করতে পারেন না। সেসব চুক্তি পরে অকার্যকর হয়ে গেলেও তার কিছু কিছু বিষয় চীনকে অখুশি করেছে বলে জানা যায়। অনেকে বলেন, সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র কারও বন্ধু হতে পারে না। এ কথা ঠিক যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের অনেক বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। সে কারণে তার সঙ্গে সাবধানে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন করেতে হবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়ন, নতুন উন্নয়ন ও নিরাপত্তানীতি বাস্তবায়ন এবং বিশেষ করে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন এখন অত্যন্ত ভেবেচিন্তে কাজ করে থাকে। বাংলাদেশের তিস্তা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনার পর্যায়ে কাজ করেছে। তা ছাড়া, লালমনিরহাটে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের ব্যাপারেও অনেক গবেষণা ও চিন্তাভাবনা রয়েছে চীনের। একমাত্র তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নেই প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রয়োজন বাংলাদেশের। প্রতিরক্ষা ও অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রয়েছে বিশাল কর্মপরিধি, যাতে অর্থ ও কারিগরি জ্ঞান কিংবা দক্ষতা সবকিছুই প্রয়োজন হবে ধাপে ধাপে। বর্তমান অবস্থায় চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কাজ করতে পারার মধ্যে অনেক কৃতিত্ব রয়েছে। কারণ চীনের পরিকল্পিত নিরাপত্তা কিংবা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হবে অনেক ব্যাপক। সেগুলো নিশ্চিত করবে বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আফ্রো-এশিয়া ও লাতিন আমেরিকাকে (বিআরআই) এক সূত্রে গাঁথবে; আমরা যার অংশীদার হতে চাই। আমরা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ভাগীদার হতে চাই, আর শোষণ-শাসনের নিগৃহীত বিষয়বস্তুতে পরিণত হতে চাই না। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে চীনের সংগ্রাম সফল হোক। এক নতুন যুগের সূচনা করুক তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর।

লেখক: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
[email protected]

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কি সহ্য করা যাবে
ড. সুলতান মাহমুদ রানা

একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না।...

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কখনো বাড়ছে, কখনো কমছে। বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য দুই দফা বাড়ানোর পর বিদ্যুতের দামও এক দফায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে বেড়েছে। এখন মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এতে মূল্যস্ফীতি আরও এক দফা উসকে যাবে। এমনকি বাজারে জিনিসপত্রের দামও বাড়বে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টানা মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো অনেকটা হিমশিম পর্যায়ে উঠতে হয়েছে। গণমাধ্যম সূত্র থেকে জানা গেছে, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তবে এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সংস্কারমূলক পরামর্শের কারণে সরকার ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর পথে হাঁটছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, উৎপাদনকারী দেশগুলোর সিদ্ধান্ত, ডলারের বিনিময় হার– সবকিছুই জ্বালানি তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–বিশ্ববাজারে ওঠানামা থাকলেও দেশে কেন বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে? কেন সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না? এবং এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জনজীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে গণবিরোধী আখ্যা দিয়ে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই বিবৃতি দিয়েছে এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। এমনকি অনেকেই ২০ শতাংশ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করে তুলবে বিধায় জনস্বার্থে এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে। অবশ্য প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা বিবৃতি দেওয়া হয়েছে কি না সেটি আমার জানা নেই। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে এনসিপির বিভিন্ন ইউনিট। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে প্রতিবাদ করেছেন। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দেশের সংকটকালীন সময়ে বিএনপি কখনোই ভালোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। বিদ্যুতের দাম বাড়বে না বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।’ 

অনেকেই আছেন যারা একসময় বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে টেলিভিশনসহ রাজপথে প্রতিবাদের ঝড় তুলত, তাদের কেউ কেউ এখন সরকারের কেবিনেটে আছেন। তারা সরকারে থাকার অজুহাতে হয়তো মুখ বন্ধ করে আছেন এই মুহূর্তে। আমরা মনে করি তারা যদি সরকারে না থাকত নিশ্চয়ই প্রতিবাদের ঝড় তুলতেন টকশোয় কিংবা প্রেসক্লাবের সামনে।

বাজেট ঘোষণার আগেই বিদ্যুৎ ও জ্বালিানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চরম প্রভাব ফেলছে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে অন্যান্য দেশ কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়? অনেক দেশ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সরাসরি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয় না। তারা বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। কিছু দেশ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কর কমিয়ে দেয়, যাতে ভোক্তাদের ওপর চাপ কম পড়ে। কিছু দেশ পরিবহন খাতে বিশেষ প্রণোদনা দেয়। অনেক উন্নত দেশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা বা ভর্তুকি প্রদান করে।

আবার অনেক দেশ দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গণপরিবহন এবং জ্বালানি দক্ষ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা তাদের অর্থনীতিকে তুলনামূলক কম প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, আমাদের অর্থনীতি এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার বিস্তার এখনো সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব দ্রুত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ওপর। সরকারি চাকরিজীবী, বেসরকারি কর্মচারী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের আয় একই থাকে, কিন্তু ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। যদি জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে কয়েকটি বড় ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে।

প্রথমত, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নির্মাণসামগ্রী–সবকিছুর দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চাপে পড়বেন। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা হারাতে পারে, এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হতে পারে। তৃতীয়ত, কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগ কমে যায়, যা চাকরির সুযোগও সীমিত করে। চতুর্থত, দারিদ্র্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মধ্যবিত্তের একটি অংশও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। যারা কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন, তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এখন আমাদের মাথায় একটি বিষয় খুব ঘুরপাক খাচ্ছে। সেটি হলো বাজেটের পর পরিস্থিতি কী হতে পারে? সরকার কি যথাযথভাবে সবকিছু সামাল দিতে পারবে? সাধারণত বাজেটের সময় সরকার রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের কর ও শুল্ক সমন্বয় করে। যদি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা আমদানিনির্ভর খাতে নতুন কর আরোপ বা শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সরকার যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে কিছুটা চাপ লাঘব হতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, অর্থনীতির মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে জ্বালানি খাতের মূল্যবৃদ্ধি এক ধরনের বিশেষ ইফেক্ট সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, একটি খাতে মূল্য বৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে অন্য সব খাতে ছড়িয়ে পড়ে।

সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–একদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা করা, অন্যদিকে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়কে সহনীয় পর্যায়ে রাখা। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সফলতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে। কিন্তু যদি প্রতিটি মূল্য সমন্বয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই গিয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যাবে না। বাজেট-পরবর্তী বাংলাদেশে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে–অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বার্থের মধ্যে সরকার কতটা কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]