এখনকার সময়ে কেউ যদি সততার কথা বলেন, মানুষ কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সৎ থাকার আহ্বানকে কেউ কেউ বিদ্রূপের চোখে দেখেন। অথচ বিপরীত চিত্রটিই বেশি আলোচিত হয়। যেমন কেউ যদি প্রতারণা অথবা দুর্নীতি করে কিছু অর্জন করেন, তা নিয়েই চায়ের দোকানে দারুণ গল্প জমে, এমনকি প্রশংসার ঢেউও ওঠে তার চারপাশে।...

‘আমরা আধুনিক যুগের ছেলে-মেয়ে’ বা ‘আমরা ডিজিটাল যুগের সন্তান’— এই কথাটা আমাদের প্রায়ই শুনতে হয়। শুনলে মনে হয় তরুণরা বিশেষ কোনো যোগ্যতা অর্জন করেছেন। প্রশ্ন জাগে, হাতে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট আর মাথায় নানা তথ্য—এসবের কারণেই কি তরুণরা নিজেদের খুব স্মার্ট মনে করছেন?
অবশ্য নিজেকে স্মার্ট মনে করা দোষের কিছু নয়। দোষনীয় হচ্ছে, আমরা আসলেই কতটা ভালো মানুষ হতে পেরেছি, তা খতিয়ে না দেখা। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, যদি আমরা সেটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করি, তাহলে সেই উন্নতির কোনো মূল্যই থাকে না। এই বিষয়টাকে অনেক তরুণ গুরুত্ব দিতে চান না। বরং তাদের মাঝে এমন কিছু আচরণ দেখা যায়, যেগুলো দেখে মনে হয় প্রযুক্তি এগিয়েছে, কিন্তু তাদের মন-মানসিকতা ততটা উন্নত হয়নি। ফলে বলতে হচ্ছে, শুধু আধুনিক হওয়াই যথেষ্ট নয়, ভালো মানুষ হওয়াটাই জরুরি।
বর্তমান সময়ে অনেকেই বাস্তব জীবনের চেয়ে ভার্চ্যুয়াল জীবন নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। দিনের শুরুতেই ঘুম থেকে উঠে হাতে তুলে নিচ্ছেন মোবাইল ফোন। মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করছেন, তারপর সেগুলোর সঙ্গে কিছু সাজানো-গোছানো কথামালা যুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন, যেন তাদের জীবনে কোনো দুঃখ-কষ্ট বা অপূর্ণতা নেই। মূলত নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলা কিংবা অন্যের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই এ ধরনের উপস্থাপনা, আর সেই সঙ্গে থাকে বাহবা পাওয়ার প্রত্যাশা।
দেড় যুগ আগেও চিত্রটা ছিল ভিন্ন। তখন মানুষ নিজের মনের কথা প্রকাশ করতেন ডায়েরির পাতায়। যদিও সেই লেখাগুলো ছিল একান্তই ব্যক্তিগত, নিজের সঙ্গে নিজের আলাপচারিতার মতো। ডায়েরিগুলোও যত্ন করে লুকিয়ে রাখা হতো, যাতে অন্য কেউ সেই অনুভূতিগুলো জানতে না পারেন। অথচ আজ আমরা দেখছি সম্পূর্ণ বিপরীত প্রবণতা। সামান্য মন খারাপ হলে বা হতাশায় পড়লে এখন অনায়াসে জায়গা করে নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কেউ যখন এমন কিছু শেয়ার করেন, তখন পরিচিত কিছু মন্তব্য প্রায়ই চোখে পড়ে—‘ধৈর্য ধরুন’, ‘শক্ত থাকুন’, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। নিঃসন্দেহে এসব কথা নেতিবাচক নয়; বরং সহমর্মিতার প্রকাশ।
বাস্তবতা হলো, মানুষের অনুভূতি, দুঃখ-কষ্ট বা মানসিক যন্ত্রণা কয়েকটি বাণীতে মুছে যায় না। তবু আমরা এই পরিচিত শব্দগুলোর মধ্যেই ক্ষণিকের স্বস্তি খুঁজে পাই—হয়তো এই ভেবে যে, অন্তত কেউ আমাদের অনুভূতির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
স্মার্ট হওয়ার এই যুগে এসে সম্মানের ধরনটাও বদলে গেছে। আগে মানুষকে সম্মান করা হতো তার বয়স, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও চরিত্র দেখে। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ফলোয়ার সংখ্যা, ভাইরাল হওয়া ভিডিও আর লাইক-কমেন্টের হিসাব। যার অনুসারী বেশি, তার কথাই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। সে যদি ভুলও কিছু বলে, তবু অনেকেই তা মেনে নেয়। মনে হয়, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সময় বা আগ্রহ দুটিই কমে গেছে। কে বলছে, সেটাই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে মতামত ও তথ্যের ভিড়ে সত্য অনেক সময় হারিয়ে যায়।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। শিক্ষার্থীরা সারা বছর সময় নষ্ট করে ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থাকে। তারপর পরীক্ষার আগে হঠাৎ করেই বুঝতে পারে সময় আর নেই। তখন বই খুলতেই সব নতুন লাগে, পরিচিত বিষয়ও অপরিচিত হয়ে ওঠে। পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্ন দেখে মাথা ঘুরে যায়, আর হল থেকে বের হয়ে সবাই একসঙ্গে বলে, ‘এমন আজব প্রশ্ন জীবনেও দেখিনি।’ নিজের প্রস্তুতির ঘাটতির কথা তখন খুব কমই মনে পড়ে; দোষটা চলে যায় প্রশ্নপত্রের ওপর, অথবা প্রশ্নকর্তা শিক্ষকের ওপর।
শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে। আগের সেই আন্তরিকতা শিক্ষকদের মাঝে নেই। অনেক শিক্ষক দায়িত্ববোধ থেকে পড়ান ঠিকই, কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার আগ্রহ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা লক্ষ করা যায় না। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা এখন জ্ঞানার্জনের চেয়ে জিপিএর পেছনে ছুটতেই বেশি আগ্রহী। ফলে শিক্ষা এখন একধরনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে, যেখানে সার্টিফিকেট অর্জিত হয়, অথচ জ্ঞানের গভীরতা গড়ে ওঠে না।
আমাদের পারিবারিক সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। আগে পরিবার মানে ছিল একসঙ্গে বসে গল্প করা, হাসি-ঠাট্টা করা, ছোট ছোট মুহূর্তগুলোকে ভাগ করে নেওয়া। এখন ছোট পরিবার নিয়ে থাকলেও প্রত্যেকেই নিজের দুনিয়ায় ডুবে থাকেন। মা ডাকেন ‘খেতে আয়’। সন্তান জবাব দেয় ‘একটু পরেই আসছি’। এই ‘একটু পরে’ কখন যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়, তা কেউই খেয়াল করেন না।
শুধু সন্তান নয়, বাবা-মায়ের দিক থেকেও অনেক চাপ থাকে। তারা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকেন যে, অনেক সময় সামাজিক দায়দায়িত্বও ভুলে যান। অথচ সন্তানের পেছনে এত সময় দিয়েও সন্তানকে আদর্শবান হিসেবে গড়তে পারেন না। ফলে একসময় সম্পর্কেরও অবনতি ঘটে। বাইরে থেকে বাবা-সন্তানের সম্পর্ক স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়; যা সহজে চোখে পড়ে না।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা চোখে পড়ে। নেতার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতিগুলো এমনভাবে দেওয়া হয়, যেন খুব দ্রুত সবকিছু বদলে যাবে। মানুষ সেই প্রলোভন বিশ্বাস করে, নতুন করে স্বপ্ন দেখে। অথচ সময়মতো দেখা যায়, কথার সঙ্গে কাজের মিল খুবই কম। তবু মানুষ বারবার সেই প্রতিশ্রুতিগুলোই বিশ্বাস করেন। এভাবেই এই চক্র যুগের পর যুগ চলতে থাকে, আর ধীরে ধীরে বিষয়টি সবার কাছেই গা-সওয়া হয়ে যায়।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এখনকার সময়ে কেউ যদি সততার কথা বলেন, মানুষ কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সৎ থাকার আহ্বানকে কেউ কেউ বিদ্রূপের চোখে দেখেন। অথচ বিপরীত চিত্রটিই বেশি আলোচিত হয়। যেমন কেউ যদি প্রতারণা অথবা দুর্নীতি করে কিছু অর্জন করেন, তা নিয়েই চায়ের দোকানে দারুণ গল্প জমে, এমনকি প্রশংসার ঢেউও ওঠে তার চারপাশে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন কিছু ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে, যেখানে কেউ নিজের গুরুতর ভুল—যেমন চুরি, ডাকাতি কিংবা আরও ভয়াবহ অপরাধ স্বীকার করেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তখন মানুষের কৌতূহল, আগ্রহ এবং আকর্ষণ তাকে ঘিরেই তৈরি হয়। এই কৌতূহলই অনেক ক্ষেত্রে তাকে রাতারাতি ‘সেলিব্রিটি’তে পরিণত করে। ফলে আমরা অজান্তেই বিষয়টির নৈতিক দিকটি উপেক্ষা করে তার চমকপ্রদ দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করি।
এই বাস্তবতাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়; আমরা কি সত্যিই সভ্য হচ্ছি, নাকি কেবল সভ্যতার মুখোশ পরে আছি? যদি আমাদের আচরণ, মূল্যবোধ ও মানবিকতা উন্নত না হয়, তাহলে এমন বাহ্যিক আধুনিকতার কোনো অর্থ থাকে না। তাই প্রয়োজন আগে নিজের ভেতরে তাকানো এবং সত্য-মিথ্যা বিচার করে মানবিক গুণাবলিকে গুরুত্ব দেওয়া। তবেই আমরা প্রকৃত অর্থে একটি উন্নত ও সভ্য সমাজ গড়ে তুলতে পারব।
লেখক: কথাসাহিত্যিক; পরিবেশ ও
জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট


