অতীতে আমরা লক্ষ করেছি যে, অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কেই সংসদে আলোচনা হয় না। এছাড়া বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা যদি পরস্পরের প্রতি গালিগালাজ কিংবা নেতা-নেত্রীদের বন্দনায় নিজেদের লিপ্ত রাখেন, সেক্ষেত্রেও সংসদ কার্যকারিতা অর্জন করে না। কাজেই সংসদ সদস্যদের সংসদের ভেতরে এবং বাইরে সুস্পষ্ট আচরণবিধি বা ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ প্রণয়ন এবং তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা জরুরি।...

জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে তাদের আচরণ, বক্তব্য ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি একটি দেশের গণতন্ত্রের মান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় সংসদ সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি বা ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ প্রণয়ন করা হয়েছে, যাতে সংসদের মর্যাদা যথাযথভাবে রক্ষা পায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংসদ সদস্যদের জন্য একটি সুস্পষ্ট আচরণবিধি খুবই প্রয়োজন। বিশ্বের বহু গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি প্রণীত রয়েছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের অন্তত ৮৫টি দেশে সংসদ সদস্যদের জন্য নৈতিক আচরণবিধি চালু আছে। এসব বিধির মূল উদ্দেশ্য হলো–স্বার্থের সংঘাত রোধ, দুর্নীতি প্রতিরোধ, সংসদের মর্যাদা রক্ষা এবং জনগণের আস্থা অটুট রাখা।
ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্স, ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভা, কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের জন্য আইন রয়েছে। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে সংসদ সদস্যদের জন্য একটি বিস্তারিত ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ রয়েছে, যেখানে স্বচ্ছতা, সততা, স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে চলা এবং সংসদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত স্বার্থে তার ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন না এবং তার আর্থিক স্বার্থ বা ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতা সংসদের কাছে ঘোষণা করতে হয়। একইভাবে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা নিউজিল্যান্ডের মতো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতেও সংসদ সদস্যদের জন্য নৈতিক আচরণের নির্দিষ্ট কাঠামো বিদ্যমান।
এসব দেশে সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে কয়েকটি মৌলিক আচরণ প্রত্যাশা করা হয়। সংসদ সদস্যদের আচরণবিধিতে সাধারণত কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমত, জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার। একজন এমপির সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত লাভ, দলীয় সুবিধা বা ব্যবসায়িক স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হওয়া চলবে না। যুক্তরাজ্যে এমপিদের জন্য বহুল আলোচিত ‘Seven Principles of Public Life’-এ Selflessness, Integrity, Objectivity, Accountability–এসব নীতিকে বাধ্যতামূলক হিসেবে ধরা হয়। দ্বিতীয়ত, সম্পদ ও স্বার্থের ঘোষণা। এমপিদের আয়, উপহার, বিদেশ সফর, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, কোম্পানির শেয়ার–এসব তথ্য প্রকাশ করা উচিত। এতে জনগণ বুঝতে পারে কোনো নীতিগত অবস্থান ব্যক্তিগত লাভ দ্বারা প্রভাবিত কি না। তৃতীয়ত, সংসদে শালীন আচরণ। অশালীন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যা তথ্য প্রদান, শারীরিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা অধিবেশন অচল করে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিপন্থী। চতুর্থত, উপস্থিতি ও কার্যকর অংশগ্রহণ। নিয়মিত অনুপস্থিতি, শুধু ভাতা নেওয়া কিন্তু আইন প্রণয়নে অংশ না নেওয়া–এটিও অনৈতিক আচরণের মধ্যে পড়ে।
আচরণবিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। ২০০৫ সালে ভারতে ১০ জন লোকসভা সদস্য অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বহিষ্কার করা হয়। এটি দেখিয়েছে যে সংসদীয় নৈতিকতা ভঙ্গ করলে গণতন্ত্র কতটা কঠোর হতে পারে।
ব্রিটেনে একাধিক এমপি ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের জন্য করপোরেট লবিংয়ে জড়িত থাকায় সাময়িক বরখাস্ত, প্রকাশ্য ক্ষমা এবং কিছু ক্ষেত্রে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে আচরণবিধিতে লবিং সংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কংগ্রেসেও অনৈতিক আর্থিক আচরণ, মিথ্যা তথ্য ও জনবিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগে সদস্য বহিষ্কারের নজির তৈরি হয়েছে। এটি দেখায় যে পরিপক্ব গণতন্ত্রে ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বড়।
বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে আচরণবিধির প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেক সময় দেখা যায়, সংসদে অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য, বিরোধী মতকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অনুপস্থিতি কিংবা নির্বাচনি এলাকার উন্নয়ন প্রকল্পে স্বার্থসংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যদিও সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি ও সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে কিছু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে, তবুও একটি সমসাময়িক, লিখিত ও প্রয়োগযোগ্য আচরণবিধি আরও শক্তিশালীভাবে প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় যদিও সংবিধান, কার্যপ্রণালি বিধি এবং সংসদীয় ঐতিহ্যের মাধ্যমে কিছু আচরণগত নির্দেশনা রয়েছে, তবুও একটি সুস্পষ্ট ও আধুনিক আচরণবিধির অভাব অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়। প্রায়ই সংসদে অনুপস্থিতি, অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সংসদের বাইরে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি করে। এতে শুধু সংসদের মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হয় না, গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংসদের একটি বড় দায়িত্ব সংসদ সদস্যদের নিজেদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। সংবিধানের ৮৭ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জাতীয় সংসদের ‘কার্যপ্রণালি-বিধি’র ২২তম অধ্যায় (ধারা ১৬৩-১৭৬) ‘বিশেষ অধিকার’ সম্পর্কিত। কারও কার্যক্রমের মাধ্যমে সংসদ কিংবা সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তা তাদের বিশেষ অধিকারের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। সাধারণ নাগরিকরা যেমন তাদের বক্তব্য ও কার্যক্রমের মাধ্যমে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে (যেমন–সংসদ কর্তৃক তলব হওয়ার পর তাতে সাড়া না দেওয়া কিংবা দলিল-দস্তাবেজ না দেওয়া)। তেমনিভাবে সংসদ সদস্যদের নিজেদের আচরণের মাধ্যমেও এ অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। যেমন–তারা যদি দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন তথা অসদাচরণে (Misconduct) লিপ্ত হন, যা জনসম্মুখে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা হানি ঘটাবে, তাহলেও সংসদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। অনেক দেশেই অসদাচরণের অভিযোগে সংসদ সদস্যদের সংসদ থেকে বহিষ্কারও করা হয়। এমনকি স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ছাড়াও, অসদাচরণের অভিযোগে তিরস্কার এবং সাময়িকভাবে বহিষ্কারের মাধ্যমেও সংসদ সদস্যদের শাস্তি দেওয়া হয়। তাই নিজেদের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সংসদের কার্যক্রমের অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংসদের কার্যকারিতার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের যথাযথ দায়িত্বগুলো ন্যায্য ও প্রাসঙ্গিকভাবে পালন করতে হলে সংসদে সব সদস্যের উপস্থিতি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সংসদকে কার্যকর বলা যায় না। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশে বিগত সময়ে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের একটি অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এটি আমাদের পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সংসদ বর্জন বা ওয়াকআউট সংসদ কার্যকর করার অন্যতম টুল হলেও এটি যাচ্ছেতাইভাবে ব্যবহৃত হয়েছে বাংলাদেশে। বলা চলে এ বিষয়ে যখন যারা বিরোধী দলে থেকেছে তারাই আগের বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পরিমাণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেছে। অবশ্য সর্বশেষ দুয়েকটি সংসদে কার্যকর অর্থে কোনো বিরোধী দলই ছিল না।
অতীতে আমরা লক্ষ করেছি যে, অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কেই সংসদে আলোচনা হয় না। এছাড়া বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা যদি পরস্পরের প্রতি গালিগালাজ কিংবা নেতা-নেত্রীদের বন্দনায় নিজেদের লিপ্ত রাখেন, সেক্ষেত্রেও সংসদ কার্যকারিতা অর্জন করে না। কাজেই সংসদ সদস্যদের সংসদের ভেতরে এবং বাইরে সুস্পষ্ট আচরণবিধি বা ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ প্রণয়ন এবং তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা জরুরি।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


