একটি সমন্বিত জাতীয় নাগরিক ডেটাবেজ কেবল সংকট মোকাবিলার মাধ্যম নয়, বরং এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এটি রাষ্ট্রের সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে, দুর্নীতি কমাতে সহায়তা করতে পারে এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে।...

যেকোনো রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিভিন্ন ধরনের সংকট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক মন্দা, মহামারি কিংবা জ্বালানিঘাটতি বা অব্যবস্থাপনা যাই বলি না কেন- এসব কিছু এখন নিত্যনৈমিত্তিক সংকট হয়ে আমাদের সামনে আসছে। এ বাস্তবতায় একটি কার্যকর ও সমন্বিত জাতীয় নাগরিক ডেটাবেজ রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশে এ ধরনের ডেটাবেজ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে প্রতিটি নাগরিকের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং জন্মনিবন্ধন নম্বর বিদ্যমান। এ দুটি তথ্যভিত্তিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি করা সম্ভব। বর্তমানে এসব তথ্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে বিচ্ছিন্নভাবে সংরক্ষিত। ফলে সংকটকালে তা সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পর্যাপ্ত সম্পদ ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা সঠিকভাবে বণ্টন করতে সরকার ব্যর্থ হয়।
উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের সংকটের কথা বলা যেতে পারে। এ সংকটে দেখা গেছে, কিছু ব্যক্তি একাধিকবার তেল সংগ্রহ করছে। কখনো নিজের প্রয়োজনে, আবার কখনো অতিরিক্ত মজুত বা কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশে। এতে প্রকৃত চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা বঞ্চিত হচ্ছেন। যদি একটি সমন্বিত ডেটাবেজ থাকত, যেখানে প্রতিটি এনআইডি নম্বরের বিপরীতে জ্বালানি গ্রহণের সীমা নির্ধারণ করা যেত, তাহলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই নির্ধারণ করা যেত কে কতবার তেল নিয়েছে। কিংবা কার কতটুকু প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো কোভিড-১৯ মহামারির সময় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একই ব্যক্তি একাধিকবার ত্রাণ পেয়েছে, আবার প্রকৃত দরিদ্র কেউ কেউ তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বঞ্চিত হয়েছে। একটি সমন্বিত ডেটাবেজ থাকলে নাগরিকদের আয়, পেশা ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে ত্রাণ বিতরণ করা যেত। এতে করে অনিয়ম ও দুর্নীতি অনেকাংশে হ্রাস পেত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলাতেও একটি জাতীয় ডেটাবেজ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। ধরুন, কোনো এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। যদি একটি আপডেটেড ডেটাবেজে সেই এলাকার জনসংখ্যা, ঘরের ধরন, আয়ের উৎস এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তথ্য সংরক্ষিত থাকে, তাহলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে। কাকে আগে সরিয়ে নেওয়া দরকার, কোথায় ত্রাণ পাঠানো জরুরি এবং কোন পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে- সে সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও এ ডেটাবেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের ভাতা কর্মসূচি রয়েছে। যেমন: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদি। নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ক্রীড়া কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রায়ই অভিযোগ ওঠে যে প্রকৃত উপকারভোগীরা বাদ পড়ে যায় এবং অযোগ্য ব্যক্তিরা সুবিধা পেয়ে যায়। একটি সমন্বিত ডেটাবেজ থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করা সম্ভব হতো কারা এ সুবিধার জন্য যোগ্য আর কারা যোগ্য নয়।
উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি সমন্বিত জাতীয় নাগরিক ডেটাবেজ কেবল প্রশাসনিক সুবিধা নয়, বরং সংকট ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
সিঙ্গাপুর একটি কার্যকর মডেল তৈরি করেছে ‘Singpass’ নামের ডিজিটাল আইডি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। এই একক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নাগরিকরা হাজারের বেশি সরকারি ও বেসরকারি সেবা গ্রহণ করে থাকে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকট বা মহামারির সময় সরকার সরাসরি নাগরিকদের অ্যাকাউন্টে আর্থিক সহায়তা দিতে সক্ষম হয়েছে, যা দ্রুততা ও স্বচ্ছতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
ইউরোপের দেশগুলোতেও ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়। সুইডেন ও ডেনমার্কের মতো দেশে নাগরিকরা মোবাইলভিত্তিক ডিজিটাল আইডি ব্যবহার করে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি সেবা গ্রহণ করে থাকে। ফলে সংকটকালীন দ্রুত তথ্য যাচাই এবং সহায়তা দেওয়া সম্ভব। এসব দেশে নাগরিকদের মধ্যে এ ব্যবস্থার প্রতি উচ্চমাত্রার আস্থা গড়ে উঠেছে, যা এর সফলতার অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া কানাডা ও জার্মানির মতো দেশগুলো ডিজিটাল ডেটাবেজ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা প্রমাণ করেছে যে, একটি কার্যকর ডেটাবেজ ব্যবস্থার জন্য শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং শক্তিশালী আইনি কাঠামো ও নীতিমালাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও রুয়ান্ডার মতো দেশ ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থার মাধ্যমে সেবা প্রদানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে সীমিত সম্পদ নিয়েও একটি কার্যকর ডেটাবেজ গড়ে তোলা সম্ভব।
এ অভিজ্ঞতাগুলো থেকে স্পষ্ট যে, একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেজ রাষ্ট্রকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়। প্রথমত, সংকটকালীন দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ; দ্বিতীয়ত, সম্পদের ন্যায্য ও কার্যকর বণ্টন এবং তৃতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয় হ্রাস। কোনো দেশে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে সরকার সহজেই নির্ধারণ করতে পারে কোন শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং তাদের জন্য সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। বাংলাদেশ যদি এ অভিজ্ঞতাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সমন্বিত ডেটাবেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, তবে জ্বালানিসংকটসহ ভবিষ্যতের যেকোনো জাতীয় সংকট মোকাবিলা অনেক সহজ ও কার্যকর হয়ে উঠবে।
একটি জাতীয় ডেটাবেজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, তথ্যের সঠিকতা ও আপডেট নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি ডেটাবেজে ভুল বা পুরোনো তথ্য থাকে, তাহলে তা ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত না থাকলে তা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, একটি সমন্বিত জাতীয় নাগরিক ডেটাবেজ কেবল সংকট মোকাবিলার মাধ্যম নয়, বরং এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এটি রাষ্ট্রের সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে, দুর্নীতি কমাতে সহায়তা করতে পারে এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি করতে পারে। বাংলাদেশ যদি টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে চায়, তাহলে এ ধরনের একটি ডেটাবেজ গড়ে তোলা আর বিলম্ব করা উচিত নয়। এখনই সময় সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]


