আমরা এই প্রজন্মকে নিয়ে কতদূর যাব? কে শেখাবে তাদের শিষ্টাচার? কে শেখাবে বড়দের শ্রদ্ধা করতে হবে। শ্রদ্ধার প্রসঙ্গ উঠলে স্নেহের কথাও ওঠে। বড়রা ছোটদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা যেমন চান তেমনই ছোটরাও বড়দের কাছ থেকে স্নেহ চায়। আমরা কি সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি। দুর্নীতিগ্রস্ত বাবা-মা তার সন্তানকে যখন নীতি ও নৈতিকতার কথা শেখাতে চান তখন সন্তান তা শিখতে চায় না। এটাই সময়ের বাস্তবতা।...
আমাদের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের জন্য বিখ্যাত। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার সঙ্গে কাজ করার। আমি তখন দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করি। দেশসেরা একমাত্র দৈনিক পত্রিকা। বোধকরি সেজন্য মাননীয় মন্ত্রী নকল প্রতিরোধ কার্যক্রমে যেখানেই যেতেন আমাকে সঙ্গে নিতেন। মনে আছে একবার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে তা দেখার জন্য আমরা হাতিয়ার দিকে রওনা দিলাম। হেলিকপ্টারে যাত্রী আমরা তিনজন। চালক, মাননীয় মন্ত্রী এবং আমি। হাতিয়ায় যে স্কুলের মাঠে হেলিকপ্টার নামবে সেখানে হেলিপ্যাড বানিয়ে প্রশাসনের লোকজন মন্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মন্ত্রী হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন নির্ধারিত স্থানে হেলিকপ্টার নামাবেন না। চালকের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। চালক সুবিধাজনক একটি জায়গায় হেলিকপ্টার নামালেন। আশপাশের মানুষ যারপর নাই অবাক। এই প্রথম গ্রামের মানুষ কাছ থেকে হেলিকপ্টার দেখছে। তারা বুঝতেই পারেনি হেলিকপ্টারে কে এসেছে। সবার মাঝে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেল। মন্ত্রীর সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। হেলিকপ্টার থেকে নেমে রীতিমতো দৌড় দিলেন তিনি। কারও বাড়ির বাহির আঙিনা, কারও বাড়ির ভেতর আঙিনা, ফসলি জমির আইল দিয়ে ছুটছেন মন্ত্রী। আমিও তার পেছনে ছুটছি। প্রশাসনের দুজন লোক ছিল আমাদের সঙ্গে। মন্ত্রী বোধকরি তাদের আগেই ইনস্ট্রাকশন দিয়ে রেখেছিলেন। তাদের দেখানো পথ ধরে আমরা দৌড়াচ্ছি। প্রায় ১০ মিনিট পর একটি স্কুলের দেখা মিলল। মজার ব্যাপার হলো স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছেন। তারা জানেন মন্ত্রী গাড়িতে হুইসেল বাজিয়ে সামনের পথ দিয়েই স্কুলের দিকে আসবেন। ফুলের তোড়া নিয়ে অপেক্ষা করছে সবাই। কিন্তু মন্ত্রী ততক্ষণে স্কুলের পেছন দিয়ে স্কুলের একটি কক্ষে ঢুকে পড়েছেন। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে একটা হইচই পড়ে গেল।
বলা বাহুল্য, হাতিয়ার ওই স্কুল থেকে কয়েক বস্তা নকল উদ্ধার করেছিলেন মাননীয় মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। এনিয়ে প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক হইচই পড়ে গিয়েছিল। প্রচার মাধ্যম বলতে তখনকার দিনে দৈনিক সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি টেলিভিশনের এত ব্যপ্তি ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও এত প্রতাপ ছিল না। ফলে যা কিছু প্রচার, প্রকাশ হতো তা ওই দৈনিক পত্রিকাগুলোতেই হতো।
নিঃসন্দেহে বলা যায়, পাবলিক পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তখনকার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের ভূমিকা ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধের কথা উঠলেই এহছানুল হক মিলনের প্রসঙ্গ গুরুত্ব পায়। পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছেন তিনি।
আনন্দের সংবাদ, এহছানুল হক মিলনই এখন দেশের শিক্ষামন্ত্রী। অতীতকালে ছিলেন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। বর্তমানে ফুল মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সঙ্গতকারণেই তাকে ঘিরে একটা প্রত্যাশার জায়গা তৈরি হয়েছে। এহছানুল হক মিলনও এ ব্যাপারে সচেতন। তাই প্রায় প্রতিদিনই শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিরন্তর নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলছেন, শিক্ষার্থীদের সমাবেশে নানা ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। সবই ভালো পদক্ষেপ। অথচ ভালোর মধ্যেও কালো ছড়াচ্ছেন অনেকে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন পদক্ষেপ ও উপদেশ নিয়ে ট্রল করতে দ্বিধা করছে না। শিক্ষামন্ত্রীর কণ্ঠ নকল করে অনেকে অশোভন ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাহবা কুড়াচ্ছেন।
সবকিছু দেখে, শুনে আমি একটু দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। শিক্ষামন্ত্রী অন্যায় কী করছেন? শিক্ষার্থীদের কাছে পেলেই তিনি বলেন, লেখাপড়া কেমন হচ্ছে? এখন আর নকল করে পাস করা যাবে না। একজন শিক্ষামন্ত্রীর কাছ থেকে আমরা তো এমন কথাই শুনতে চাই। তাহলে শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়ে ট্রল হচ্ছে কেন? অতীতকালে তো এমন সাহস কেউ দেখায়নি। এখন কেন দেখাচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন স্বয়ং এ ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা-বিবর্জিত জায়গায় যাচ্ছে। তারা সহজেই ভাইরাল হতে চায়। আজকের তরুণ প্রজন্ম, এমনকি যারা ইউনিফর্ম পরে, তারাও তাদের শিক্ষক কিংবা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের অশালীন মন্তব্য করতে দ্বিধা করে না।
কথা সত্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা ফেসবুকে খাই, ফেসবুকে আড্ডা মারি। মন খারাপ হলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই। কাউকে পছন্দ না হলে তার চৌদ্দ গোষ্ঠী তুলে গালাগাল করি। এসব কর্মকাণ্ডে লাইক এবং কমেন্টস বেশি পাওয়া যায়। তাই যেকোনো ভালো বিষয়কেও নেগেটিভভাবে নিয়ে অনেকে লাইক ও কমেন্টস করে। এতে নাকি ভিউ বাড়ে। ফেসবুকের ভিউ সংস্কৃতিই মূলত: আমাদের সামাজিক জীবনে শ্রদ্ধা ও মায়ার জায়গাটাকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। ফেসবুকে ভালো খবর প্রকাশ করলে তেমন লাইক-কমেন্টস আসে না। অথচ নেগেটিভ কোনো কিছু লিখলেই লাইক-কমেন্টসের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। কে কার বিরুদ্ধে লিখছে, কেন লিখছে সে কথা না ভেবেই ভিউ বাড়ানোর প্রবণতায় একটা অস্থির প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। এরা সাধারণত সিনিয়রদের শ্রদ্ধা করতে নারাজ। বাবা-মা তো দূরের কথা শিক্ষক-শিক্ষিকাকেও সম্মান দিয়ে কথা বলতে চায় না। হাতে আছে স্মার্ট মোবাইল ফোন। হঠাৎ মনে হলো কাউকে গালি দিতে হবে, ব্যস শুরু হয়ে গেল ফেসবুক-চর্চা।
এখন প্রশ্ন হলো- এজন্য কি কিশোর, তরুণ প্রজন্মই দায়ী? বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও কি দায় এড়াতে পারবেন? কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম সাধারণত শেখে কার কাছ থেকে? তাদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকে। তার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা ঘটনা তাদের প্রভাবিত করে। খেয়াল করলেই দেখবেন- যে পরিবারে বাবা-মা বই পড়ে, দেশের গান শোনে, দেশের নাটক-সিনেমা দেখে সে পরিবারের সন্তানরাও তাই করে। যে পরিবারে বাবা-মা, বয়োজেষ্ঠ্যদের মধ্যে দেশাত্মবোধ বেশি দেখা যায়, সে পরিবারের সন্তানরাও দেশের প্রতি ভালোবাসার শক্তিতেই বেড়ে ওঠে।
অন্যদিকে, যে পরিবারের বাবা-মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সক্রিয়। সারাক্ষণ ফেসবুকে অ্যাকটিভ থাকে। ভিউ বাড়ানোর জন্য মন্দ ঘটনারও প্রশংসা করে সে পরিবারের সন্তানরাও বাবা-মাকে অনুসরণ করে। যেহেতু মন্দ কথায় ভিউ বেশি, তাই তারাও ফেসবুকে নানা কথা লেখে, অন্যের মন্দ কথায় লাইক দেয়। কমেন্টস করে। ফলে লাইক ও ভিউ বাণিজ্যের গ্যাড়াকলে পড়ে আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি দিনে দিনে অহেতুক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে।
একবার কল্পনা করুণ তো- অতীতকালে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সামনে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে কথার বলার সাহস পেত কোনো ছাত্রনেতা? এখন কিন্তু ব্যাপারটা খুবই সহজ। অতীতকালে স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে প্রকাশ অযোগ্য মন্তব্য করার সাহস পেত কেউ? এখন এ ব্যাপারটাও গণতান্ত্রিক অধিকারের পর্যায়ে দাঁড় করানো হয়েছে। এসব দেখে দেখে আমাদের কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম দিনে দিনে বেশ উৎসাহিত হচ্ছে। ফেসবুকে নেতিবাচক কথা লিখলে যেহেতু ভিউ বাড়ে তাই তারা আলোচনায় থাকার জন্য যা লেখা উচিত নয়, যা করা উচিত নয়, যা অশোভন, করুচিপূর্ণ সে দিকেই বেশি মাত্রায় ঝুঁকছে। দেশের শিক্ষামন্ত্রীকেও তারা ছেড়ে কথা বলছে না।
এখন প্রশ্ন হলো- আমরা এই প্রজন্মকে নিয়ে কতদূর যাব? কে শেখাবে তাদের শিষ্টাচার? কে শেখাবে বড়দের শ্রদ্ধা করতে হবে। শ্রদ্ধার প্রসঙ্গ উঠলে স্নেহের কথাও ওঠে। বড়রা ছোটদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা যেমন চান তেমনই ছোটরাও বড়দের কাছ থেকে স্নেহ চায়। আমরা কি সেই পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছি। দুর্নীতিগ্রস্ত বাবা-মা তার সন্তানকে যখন নীতি ও নৈতিকতার কথা শেখাতে চান তখন সন্তান তা শিখতে চায় না। এটাই সময়ের বাস্তবতা। শিক্ষক পরম পূজনীয় ব্যক্তি। কিন্তু শিক্ষক যখন নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত কাজ করেন তখন শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়। গত এক দেড় বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য শিক্ষক মবের কবলে পড়েছেন। শিক্ষার্থীরাই তাদের লাঞ্ছিত করেছে। একজন শিক্ষার্থী যখন তার শিক্ষককে লাঞ্ছিত করার পর হিরোর মর্যাদায় অভিষিক্ত হয় তখন সামাজিক সংস্কৃতি পাল্টে যাবে এটাই বাস্তবতা। কিশোর, তরুণ প্রজন্মের অনেকে এ শিক্ষাটাই গ্রহণ করছে। ফলে তারা শিক্ষামন্ত্রীকে নিয়েও ট্রল করতে দ্বিধা করছে না। এখন প্রশ্ন হলো এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? উত্তর খুবই সহজ। প্রথম দরকার রাজনৈতিক শিষ্টাচার। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন আমাদের দেশে রাজনৈতিক শিষ্টাচারই সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে। গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা বলে আপনি যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্পর্ক অশোভন শব্দ উচ্চারণ করবেন, দেশের জ্ঞানী গুণী, ব্যক্তিদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন অথচ এজন্য আপনার কিছুই হবে না, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার ভিউ বেড়ে যাবে তখন তো কিশোর তরুণ প্রজন্মকে নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হবে। তারাও ভিউ বাড়ানোর দৌড়ে শামিল হবে। কাজেই বদলটা আসতে হবে বড়দের কাছ থেকেই। বড়রা বদলালেই ছোটরাও বদলাবে। এটাই বাস্তবতা। শুভকামনা সবার জন্য।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার
সম্পাদক, আনন্দ আলো


